প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ক্রসফায়ারেও থামেনি মাদকের কারবার, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

নিউজ ডেস্ক: দেশে মাদকের ভয়াবহ চিত্র সত্যিই উদ্বেগজনক। সার্বিকভাবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এই মাদক। ধ্বংস হচ্ছে তরুণসমাজ। মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিরো টলারেন্স নীতি এবং চার শতাধিক ক্রসফায়ার দিয়েও থামানো যায়নি মাদক কারবারিদের। দিন দিন মাদকের চাহিদা বাড়ছেই।

করোনার সময় অনেকে অন্য ব্যবসা বাদ দিয়ে প্রচুর লাভজনক হওয়ায় মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে মাদকের ডিলারের সংখ্যা প্রচুর বেড়েছে। জীবনবাজি রেখে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে মাদক বহন করা হচ্ছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, মাদক নির্মূলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। নইলে তরুণসমাজের ধ্বংস অনিবার্য। চাহিদা ও সরবরাহ এক সঙ্গে বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সারা দেশে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ‘আমার সন্তান আমি রক্ষা করব, চলেন যাই মাদকবিরোধী আন্দোলনে’ এই স্লোগান দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে মাদক আসা যে কোনোভাবেই হোক বন্ধ করতে হবে।

ইয়াবা, আইস, এলএসডি, ডিএমটি, খাত, কোকেন, এনপিএস নামের এসব ভয়ংকর মাদক দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। রাজধানী থেকে শুরু করে সারা দেশের ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত এখন মাদকের ছড়াছড়ি। এই মাদক ব্যবসার সঙ্গে স্থানীয় একশ্রেণীর রাজনৈতিক নেতাকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্য জড়িত। এই টাকার ভাগ থানা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায় পর্যন্ত যায়। মাদকের ব্যবসায় লাভ বেশি। অল্পতে বড়লোক হওয়া যায়। আর টাকার ভাগাভাগির কারণে যারা নিয়ন্ত্রণ করবেন তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। জিরো টলারেন্স নীতিও তারা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করছেন না। আসক্ত পরিবারের দাবি, এ অবস্থায় কে মাদকাসক্ত নিয়ন্ত্রণ করবে? স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ছাড়াও সরকারি প্রশাসন থেকে শুরু করে এমন কোনো পেশার মানুষ নেই যারা মাদক সেবন করে না। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দৈনিক ৭০ লাখ মানুষ ইয়াবা সেবন করে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ১৫ লাখ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইয়াবা সেবনকারীর প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে দেড়গুণ বেশি হবে। এতে যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মনোরোগ চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের কাছে মাদকাসক্তরা আসেন চিকিৎসার জন্য, এই তালিকায় সরকারি একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্য, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা আছেন। মেডিক্যাল কলেজ, বুয়েটসহ সব বিশ্ববিদ্যালয়েপড়ুয়া মেধাবীরাও রয়েছেন। চিকিৎসকরা তাদের নাম-পরিচয় গোপন রাখেন। তবে এই বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। এভাবে সরকারি একশ্রেণীর কর্মকর্তা ও মেধাবী তরুণসমাজ মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে ভবিষ্যতে সমাজের পরিণতি কী হবে?

প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, দেশে মাদকের যে ভয়াবহতা চলছে তাতে যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যেভাবেই হোক, এটা রোধ করতে হবে। দেশে যে পরিমাণ মাদক আসে তার ১০ ভাগের এক ভাগও উদ্ধার হয় না। এটা যুব সমাজের জন্য অশনিসংকেত। অনেক দামিদামি ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির সন্তান মাদকে আসক্ত হচ্ছে। এক্ষেত্রে পিতা-মাতা অসহায়ত্ববোধ করছেন। অনেকে হার্ট অ্যাটাকে মারাও যাচ্ছেন। তিনি বলেন, মাদকের চাহিদা কমাতে হবে। সীমান্ত দিয়ে যেন মাদক দেশে না প্রবেশ করতে পারে। মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন তা শতভাগ পালন করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, জিরো টলারেন্স নীতি সঠিকভাবে কার্যকর হচ্ছে না। যারা মাদক বহন করছে তাদেরই ধরছে। ধরে আর ছাড়ে এই তো চলছে। তাহলে নিয়ন্ত্রণে আসবে কীভাবে? মাদকের গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। এর আগে গডফাদারদের ধরল, কিছু গডফাদার আত্মসমর্পণ করল, কারা গডফাদার তার তালিকা তো সরকারের কাছে আছে। তারপরও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না? তিনি বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অবস্থা হলো কাজির গরু কেতাবের মতো। তাদের সক্ষমতা নেই। এটাকে ঢেলে সাজাতে হবে। আর সীমান্ত দিয়ে মাদক আসা বন্ধ করতে হবে। নাইন ইলেভেনের পর আমেরিকা সব সীমান্তে সম্পূর্ণ আলাদা ব্যবস্থা করছিল। কেউ অবৈধভাবে আসা-যাওয়া করতে পারে না। আর আমাদের দেশে সীমান্ত দিয়ে অনায়াসে মানুষ আসা-যাওয়া করছে। বস্তা বস্তা মাদক আসছে। এগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। জিরো টলারেন্স নীতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত এবং সীমান্ত দিয়ে মাদক আসা বন্ধ হলে দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

সাবেক আইজিপি শহীদুল হক বলেন, চার শতাধিক ক্রসফায়ার দিয়েও মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। যেখানে চাহিদা সেখানেই সাপ্লাই হয়। তাই মাদকের চাহিদা বন্ধ করতে হবে। শুধু মাদক উদ্ধার ও পুড়িয়ে দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। একই সঙ্গে জেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত মাদক নির্মূলে সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটিতে সব পেশার মানুষ থাকবে। আর এই কমিটি মনিটরিং করবে থানাপুলিশ। এই কমিটির কাজ হচ্ছে, এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী ও গ্রহণকারীদের তালিকা প্রণয়ন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে প্রদান করবে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও ঐ কমিটি করবে। শহীদুল হক বলেন, তিনি যখন আইজিপি ছিলেন তখন পুলিশ সদস্যদের এক দিনের বেতন দিয়ে ফান্ড করা হয়েছিল। ইউনিয়ন পর্যায়ে মাদকবিরোধী কমিটি পরিচালনা ও আসক্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা ঐ ফান্ড থেকে অর্থ নিয়ে করা হতো। দেশের স্বার্থে এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে এ উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়।

র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন তা র‌্যাবের পক্ষ থেকে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। যেখানে মাদক সেখানেই অভিযান অব্যাহত রেখেছে র‌্যাব। মাদক ব্যবসায়ীরা কীভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, মানিলন্ডারিং করেছেন কি না, সব কিছু খুঁজে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, যেহেতু মাদকের ব্যাপক চাহিদা তাই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। চাহিদা কমাতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু দু-একটি সংস্থা নয়, সবার সদিচ্ছা প্রয়োজন। রাজনৈতিক নেতাদেরও এগিয়ে আসতে হবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শহিদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে মাদক নির্মূলের জন্য মালয়েশিয়ান পদ্ধতি প্রয়োগ করা প্রয়োজন। এক প্রশিক্ষণে মালয়েশিয়া গিয়ে তিনি জানতে পারেন, মালয়েশিয়ায় সরকার কীভাবে সেদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ করছে। মালয়েশিয়াও এক সময় বর্তমান বাংলাদেশের মতো মাদকের ভয়াবহ অবস্থা ছিল। পরে মালয়েশিয়া সরকার সব মাদকাসক্তদের এক জায়গায় রেখে ঘোষণা দিল, সরকার মাদক সাপ্লাই দেবে; মাদকাসক্তরা এক জায়গা থেকে খেতে হবে। এই অবস্থার পাশাপাশি তাদের কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এক বছর পর তাদের মাদকের সরবরাহের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়। দুই বছরের মাথায় গিয়ে মাদকের পরিবর্তে ভিটামিন ট্যাবলেট খাওয়ানো শুরু করল। এক বছর ভিটামিন খাওয়ার পর তারা আর কেউ মাদকাসক্ত রইল না, তারা সম্পূর্ণ সুস্থ। এভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণ করে মালয়েশিয়া। পরে মালয়েশিয়া সরকার আইন করে যে মাদক খাবে ও যে বিক্রি করবে উভয়ই সমান অপরাধী। তাদের শাস্তি ২০ বছরের কারাদণ্ড। মোহা. শহিদুল ইসলামের উদ্যোগে প্রথমে ঢাকা মহানগর পুলিশ সদস্যদের ডোপ টেস্ট শুরু হয়। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাদকাসক্ত হওয়া বিপজ্জনক। এক জন মাদকাসক্ত চার-পাঁচ জনকে মাদকে আসক্ত করে। এভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। তাই পুলিশ সদস্যদের ডোপ টেস্ট করে মাদকাসক্ত প্রমাণিত হলে চাকরি থেকে বিদায় করে দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ১০০ জনকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। চাকরির গোপনীয়তা ফাইল এসিআরেও কী কারণে চাকরি যাচ্ছে, সেটি উল্লেখ করা হচ্ছে। সূত্র: ইত্তেফাক