প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নিপু সৈয়দ নুরুলহুদা: আজ বীর কন্যা প্রীতিলতা’র ৯০তম আত্মহুতি দিবস

নিপু সৈয়দ নুরুলহুদা: ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের আজকের দিনে মাস্টারদা সূর্যসেনের পরিকল্পনায় প্রীতিলতার নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি দল রাত ১০টা ৪৫ মিনিটের সময় দখলদার রক্তপিপাসু খুনি লুটেরা ইংরেজদের আড্ডাখানা চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র আক্রমন করা হয়। অকস্মাৎ আক্রমনে বিটিশরা কিছু বুঝার আগেই ধরাশায়ি হয়ে যায়। শত্রু পক্ষের প্রায় ৫০ জন ইংরেজ কর্মকতা বোমার আঘাতে ও গুলিতে তাৎক্ষণিক নিহত হয় এবং ১৩ জনের মতো গুরতর আহত হয়। সফল যুদ্ধ শেষে পূর্ব পরিবল্পনাসারে রেলওয়ে স্কুলের সামনে কালভার্টের উপর তিনি সায়ানায়ইড ক্যাপসুল খেয়ে আত্মহুতি দেন।

তিনি চাইলে নিরাপদে পালাতে পারতেন। কিন্তু তাঁদের পরিকল্পনায় ছিলো দখলদার ইংরেজদের মনে ’আত্মঘাতি’ আত্মাহুতির আতঙ্ক ধরিয়ে দেয়া এবং কারা এই হামলা করেছে তার সম্পর্কে জানান দেয়ার উদ্দেশ্যেই তিনি সায়ানাইড ক্যাপসুল খেয়ে আত্মাহুতি দেন। যাতে এই হামলাটা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের তা প্রমাণ হয়। পর দিন ভোর বেলা তাঁর প্রাণহীন নিথর দেহ রেলওয়ে স্কুলের সামনে কালভার্টের উপর পাওয়া যায়।
বীর কন্যা প্রীতিলতা ভারত বর্ষের প্রথম নারী শহীদ ছিলেন।

প্রীতিলতা যে একজন ভাল সমর নায়ক ছিলেন তা নয়, তিনি একজন ভাল ছাত্র ছিলেন। ১৯২৬ সালে তিনি সংস্কৃত পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন। ১৯২৮ সালে তিনি কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়ে খাস্তগির স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৩০ সালে তিনি ঢাকা ইডেন কলেজ থেকে আই.এ. পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সবার মধ্যে পঞ্চম স্থান লাভ করেন এবং মাসিক ২০ টাকার বৃত্তি লাভ করেন। তিনি ১৯৩২ সালে ডিসটিংশান নিয়ে কলকাতার বেথুন কলেজ় থেকে বি.এ. পাশ করেন। শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে তিনি অপর্ণা চরণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের হেডমিসটেস হিসাবে যোগদান করেন।

কিন্তু, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় কৃতিত্বের সাথে স্নাতক পাস করলেও তিনি এবং তার সঙ্গী বীণা দাসগুপ্তর পরীক্ষার ফল স্থগিত রাখা হয়। অবশেষে তাদেরকে ২২ মার্চ, ২০১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মরণোত্তর স্নাতক ডিগ্রী প্রদান করা হয়।
ঢাকায় যখন প্রীতিলতা পড়তে যান তখন “শ্রীসংঘ” নামে একটি বিপ্লবী সংগঠন ছিল। এই দলটি প্রকাশ্যে লাঠিখেলা, কুস্তি, ডনবৈঠক, মুষ্টিযুদ্ধশিক্ষা ইত্যাদির জন্য ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ক্লাব তৈরী করেছিল। ঢাকায় শ্রীসংঘের “দীপালী সঙ্ঘ” নামে একটি মহিলা শাখা ছিল। লীলা নাগ এর নেতৃত্বে এই সংগঠনটি নারীশিক্ষা প্রসারের জন্য কাজ করত। গোপনে তারা মেয়েদের বিপ্লবী সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ ও করত। ইডেন কলেজের শিক্ষক নীলিমাদির মাধ্যমে লীলা রায়ের সাথে প্রীতিলতার পরিচয় হয়েছিল। তাদের অনুপ্রেরণায় দীপালী সঙ্ঘে যোগ দিয়ে প্রীতিলতা লাঠিখেলা, ছোরাখেলা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি লিখেছিলেন “আই.এ পড়ার জন্য ঢাকায় দু’বছর থাকার সময় আমি নিজেকে মহান মাস্টারদার একজন উপযুক্ত কমরেড হিসাবে নিজেকে গডে তোলার চেষ্টা চালিয়েছি।’

বীর যোদ্ধা বিপ্লবী শিক্ষক প্রীতিলতার জীবন থেকে শিক্ষা:
শুধু একজন ভাল ছাত্র নয়, একই সঙ্গে পথ প্রদর্শক একজন সাহসী সৎ দেশ প্রেমিক দায়িত্ববান মানুষ হিসাবে নিজের ভূমিকা রাখার মধ্যে দিয়ে জন্মের ঋণ শোধ করে গেছেন বীর কন্যা প্রীতিলতা। তিনি তাঁর সময়কার দেশের সমস্যা পরাধীনতা অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন, যুদ্ধ করে গেছেন। তাঁদের সেই লড়াই সংগ্রামের ফসল হিসাবে দেশ একটা সময় বিটিশ মুক্ত হয়েছে, তারপর ১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকি হানাদার থেকে দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু স্বাধীন দেশে এখন অন্যায় অবিচার ঘুষ দুর্নীতি দুঃশাসন, হত্যা, গুম, ধর্ষণ নিপীড়ন শোষণ বঞ্চনা বিচারহীনতা অগের চেয়ে অনেকগুন বেড়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সমাজ বিরোধী অপশক্তি প্রতিহত করা, সত্য ন্যায় অধিকার অর্জন করার সংগ্রামে নিজেকে যুক্ত করা আজকে জীবিতদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। লড়াই ছাড়া কখনো কোনো জাতির অধিকার অর্জন হয়নি। সমাজ সময় বিশ্ব সভ্যতা মানব জাতির সমস্ত অর্জনই হলো লুটেরা হানাদার দখলদার ডাকাতদের প্রতিহত করে বিজয় অর্জন করার ইতিহাস, মেহনতি শ্রমিক কৃষকের সাথে লুটেরা খুনি শাসক মাকিলদের সঙ্গে লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস।

লড়াই ছাড়া মুক্তি নাই। হয় ধুকে ধুকে মরো নয় বীরের মতো লড়াই করে মরো…
এই মহান বিপ্লবীর জন্ম মে ৫, ১৯১১ সালে ধলঘাট, পটিয়া, মাতুলালয়ে।

সর্বশেষ