প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অভিজ্ঞতা বিনিময়: অসমতা হ্রাসে ফ্রান্সের অভিজ্ঞতা অন্যদের জন্য শিক্ষণীয়

ড্যানি রডরিক, স্টেফানি স্ট্যান্টশিভা: নিম্ন আয়ের দেশের চেয়ে উন্নত দেশগুলো কভিড-১৯ মহামারীর অভিঘাত থেকে অধিকতর দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। তবে আরো কিছু বছর একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে তাদের। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, অসমতা, নতুন প্রযুক্তি, জনমিতিকভাবে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর আধিক্য, অভিবাসন প্রভৃতি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা গতানুগতিক কায়দায় (বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়োল) হবে না। প্রত্যেকটির জন্য নিতে হবে নতুন ধরনের কর্মকৌশল।

গত বছরের প্রথম দিকে বিশ্বে সবে মহামারী জেঁকে বসেছে। দেরি না করে এর দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যতের নীতি প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য অর্থনীতিবিদদের নিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ একটি আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন করেছিলেন। ওই কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ অলিভিয়ার ব্ল্যানচার্ড এবং নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জ্যঁ তিরল। ওই কমিশন কয়েক মাস ধরে প্রতিটি ইস্যুর ওপর ব্যাপকতর আলোচনা করেছিল। ওইসব আলোচনার ভিত্তিতে লেখকদের একটি উপগোষ্ঠী তিনটি আলাদা প্রতিবেদন তৈরি করেছিল এবং জুনের শেষের দিকে সেগুলো প্রকাশ হয়েছিল। তাতে চমত্কার কিছু প্রস্তাব ও সুপারিশ উঠে এসেছিল।

আমরা তৈরি করেছিলাম অসমতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার ওপর ন্যস্ত আমাদের প্রতিবেদনটি। আমাদের প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে ফ্রান্স একটি মজার ঘটনা সমীক্ষা। কারণ দেশটি প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে জিনি সহগের মতো পরিমাপকৃত গতানুগতিক সূচকে সার্বিক অসমতা বৃদ্ধি খুব একটা ঘটেনি। যদিও দেশটিতে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে আর্থসামাজিক ব্যবধান ঘুচেনি, অনেক অঞ্চল শোভন-টেকসই চাকরি ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টিতে পিছিয়ে রয়েছে, তরুণদের বেকারত্ব হার তুলনামূলক বেশি এবং সামাজিক গতিশীলতা (সোস্যাল মবিলিটি) নিম্ন রয়ে গেছে। মানুষের আচরণিক জরিপ থেকে উচ্চমাত্রার অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি তাত্পর্যজনক অন্যায্যতার বোধ এবং এসব প্রবণতার বদলে সক্রিয় সরকারি নীতিগুলোর প্রতি মানুষের বিপুল সমর্থন প্রকাশ পেয়েছিল।

ন্যায্যতা ও সামাজিক গতিশীলতা বাড়ানোর একটা উপায় হলো দরিদ্র পরিবার থেকে আসার কারণে মানুষ যেন বঞ্চনার শিকার না হয়, সুবিধাবঞ্চিত না থাকে, তা নিশ্চিত করা। আমাদের প্রতিবেদনে একটি সমন্বিত উত্তরাধিকার কর ও উপহার পাওয়া সম্পদ বা অর্থের মূল্যের ওপর কর (গিফট ট্যাক্স) প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সুফলভোগীভিত্তিক এবং সমুদয় গৃহীত অর্থের দিক থেকে প্রগতিশীল। প্রতিটি মৃত্যুতে সম্পদ হস্তান্তরে কর আরোপের পরিবর্তে নতুন ব্যবস্থায় উত্তরাধিকার কর্তৃক প্রাপ্ত মোট হস্তান্তরিত সম্পদের ওপর কর আরোপ করা যাবে, যাতে যারা বেশি সম্পদ-সম্পত্তি পাবে, তাদের ওপর বেশি হারে কর আরোপ করা যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো শিক্ষাগত মান ও শিক্ষা অর্জনে ব্যবধান কমানো। বিষয়টি বেশ কিছুদিন ধরে ফ্রান্স ও অন্যত্র জাতীয় বিতর্কের অংশ হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে কেবল সাম্প্রতিক বছরগুলোয়। তবে অনেকটা কাজ করা এখনো বাকি রয়ে গেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যবধান কমাতে আমাদের প্রস্তাবগুলো হলো দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষায় অভিগম্যতা বাড়ানো, পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের নিম্নমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার সুফল বাড়ানো, শিক্ষকতা বিষয়ে পুনর্ভাবনা এবং সেটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলা, স্কুল প্রশাসনকে আরো বেশি দায়িত্ব ও স্বাধীনতা প্রদান, বৃত্তিমূলক ও বৃত্তিমূলক বিদ্যায়তনিক উভয় ধারা জোরদার করা এবং স্কুল থেকে শ্রমবাজারে উত্তরণের বিষয়টিতে উন্নতি ঘটানো।

সার্বিক অসমতায় ঊর্ধ্বমুখিতা ঠেকাতে ফ্রান্সের সফল হওয়ার অন্যতম কারণ দেশটির উচ্চমাত্রার সামাজিক সুবিধা ও জীবনধারণের ন্যূনতম মজুরি। তবে এসব সুবিধা তাদের নিজস্ব কিছু সমস্যাও সৃষ্টি করেছে। উৎপাদনশীলতায় সমানুপাতিক বৃদ্ধির অনুপস্থিতিতে নিচের স্তরে সরকারি নির্দেশনায় মজুরি বাড়ানো আয় ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটা উত্তেজনা-ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে কেবলই যারা শ্রমবাজারে ঢুকছে তাদের জন্য। ফ্রান্সে তরুণদের অত্যধিক উচ্চ বেকারত্ব হার (প্রায় ২০ শতাংশ) এ উত্তেজনারই নির্দেশক, ইঙ্গিতবাহী।

আয় বণ্টনের নিচের দিকে যারা আছে, তাদের জন্য শোভন ও ভালো বেতনের চাকরির জোগান বাড়াতে প্রয়োজন উৎপাদনশীলতায়ও সমানুপাতিক বৃদ্ধি। শোভন চাকরি ও ভালো প্রতিষ্ঠান হাত ধরাধরি করে চলে। প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শোভন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টিতে সমর্থ উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের অভাবে চাকরি পাওয়ার জন্য তা যথেষ্ট নয়। সামাজিক নীতি ও প্রবৃদ্ধি নীতি পারস্পরিকভাবে পরিপূরক। কাজেই সেগুলো যথাযথভাবে প্রণয়ন করা জরুরি।

এটা মাথায় রেখে আমরা একগুচ্ছ সমাধান প্রস্তাব করেছি, যা শ্রমবাজার নীতিকে শিল্প, আঞ্চলিক ও উদ্ভাবন নীতির সঙ্গে সংযোগ ঘটায়। এ শোভন চাকরির কৌশলের মধ্যে নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বিত সক্রিয় শ্রমবাজার নীতিও অন্তর্ভুক্ত এবং এটি চাকরিপ্রত্যাশীদের আরো ব্যাপকভাবে সেবা দেয়। আবার এটি কর অব্যাহতি ও নগদ প্রণোদনা থেকে দূরে থাকা বিদ্যমান শিল্প ও আঞ্চলিক নীতিগুলোকে পুনর্বিন্যাস করে এবং বিশেষভাবে শোভন চাকরি সৃষ্টিতে মনোযোগ দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কাস্টমাইজড সরকারি সেবার পরিধি বাড়াতেও সাহায্য করে। তদুপরি এটি সেসব প্রযুক্তি উৎসাহিতকরণে বিরাজমান প্রণোদনা কাঠামোকে পর্যালোচনা করতে নীতিনির্ধারকদের ভাবাতে সাহায্য করে, যা উৎপাদন ও সেবা খাতে মাঝারি দক্ষতার চাকরির সুযোগ সংকোচনের পরিবর্তে বাড়ায়।

এদিকে বিশ্বায়ন ও আন্তর্জাতিক আউটসোর্সিং যে ন্যায্য উদ্বেগ সামনে এনেছে, তাও মোকাবেলা করতে হবে; যা সমতা ও শোভন চাকরির ক্ষতি করেছে। জরিপে শোভন চাকরি কেন কমেছে, এ প্রশ্ন করা হয়েছিল। মজার বিষয় হলো, জরিপে অংশ নেয়া ফরাসিরা এক্ষেত্রে প্রযুক্তির চেয়ে দ্বিগুণ দায়ী করেছে বিশ্বায়ন ও আউটসোর্সিংকে (২৮ শতাংশ বনাম ৫৭ শতাংশ)। বাণিজ্যনীতি নিজে ভালো চাকরি সৃষ্টিতে সহায়ক না হলেও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার কাছে শ্রম মান ও নিয়ন্ত্রণের নিচের দিকে প্রযোজ্য অভ্যন্তরীণ শোভন চাকরি নীতিগুলোর অবমূল্যায়ন এটি ঠেকাতে পারে।

এ উদ্দেশ্যে আমরা একটি সামাজিক সুরক্ষা প্রক্রিয়া-পদ্ধতি প্রস্তাব করছি। এটি পণ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা, করায়ন থেকে শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে নিজস্ব নীতিমালা সমুন্নত রাখতে দেশগুলোর কর্তৃত্ব বাড়াবে। একটি ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া অনুসরণের পর আমাদের প্রস্তাবের মাধ্যমে সেসব পণ্যের আমদানি প্রতিহত করা সম্ভব হবে—বাইরে শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের কোনো পরিবেশে যা উৎপাদন হয় এবং অভ্যন্তরে চাকরি বা কর্মপরিবেশকে হুমকিতে ফেলে। আমরা বলি, এ ধরনের একটি ‘সামাজিক অ্যান্টি ডাম্পিং’ প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বৈধতা ফিরিয়ে আনবে, কাজ করবে সুরক্ষা কবচ হিসেবে।

আমাদের কিছু সুপারিশ ফ্রান্সের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট হলেও এর অনেকগুলো (সব না হলেও) অন্য উন্নত অর্থনীতিগুলোর জন্যও প্রাসঙ্গিক। অন্য দুই প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তন ও জনমিতি বিষয়ে সুপারিশগুলোর সঙ্গে আমাদের সুপারিশগুলো সামনের দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় দেশগুলোকে সমর্থ করে তুলবে, সাহায্য করবে। কাজেই দেশীয় বাস্তবতা উপযোগী করে সেগুলো প্রতিটি দেশেরই নীতি এজেন্ডায় সন্নিবেশ ঘটানো প্রয়োজন।

[ স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট ]
ড্যানি রডরিক: হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির জন এফ কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক; স্ট্রেইট টক অন ট্রেড: আইডিয়াজ ফর আ সেইন ওয়ার্ল্ড ইকোনমি বইয়ের লেখক

স্টেফানি স্ট্যান্টশিভা: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত