প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রফি হক: ইংরেজি ‘মিডল্ ক্লাস’ আর বাংলা ‘মধ্যবিত্ত’ একার্থক নয়

রফি হক: ইংরেজি ‘মিডল্ ক্লাস’ আর বাংলা ‘মধ্যবিত্ত’ একার্থক নয় । বিলেত দেশে ‘মিডল্ ক্লাস’ একটা সামাজিক বিভাজনÑ অভিজাতকুল আর শ্রমিক শ্রেণী এই দুয়ের মাঝখানে যারা আছে তারাই মিডল্ ক্লাস । উচ্চ-বংশ-জাত কেউ দরিদ্র হলেও সে মিডল্ ক্লাসের মধ্যে পড়ে না। আবার যে দোকান ব্যবসা-বাণিজ্য করে ধনবান হয়েছে সে অভিজাত বলে স্বীকৃত হয় না, সে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যেই পড়ে।

ব্রিটেনে ‘জেন্টলম্যান’ বলে একটা স্তর ভেদ ছিল বা আছে (এখনো কি আছে? এখন তেমন শুনি না)। কথাটা অনেক অর্থ হয়, সেখানে সামাজিক স্তরে এর মানে উচ্চ বংশজাত এবং সাধারণ ভূসম্পত্তির মালিক। বাংলা ‘ভদ্রলোক’ দিয়ে ঠিক ইংরেজি ‘জেন্টলম্যান’Ñএর অনুবাদ করা যায় না। ফরাসি ‘বুজোর্য়া’র অর্থ মূলত সাধারণ মানুষ বা নাগরিক বা ইংরেজি মিডল্ ক্লাস। এরই নিচের স্তরে আছে ‘পেটি বুর্জোয়া’ আর বুর্জোয়ার ওপরে আছে ‘জঁতিলওম’ অর্থাৎ অভিজাত— বিশেষত যাদের জীবিকা-উপার্জনের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা নেই।

বস্তুত, ইংরেজি মিডল্ ক্লাসের কোনো সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ নেই, যেমন মধ্যবিত্তের ইংরেজি প্রতিশব্দ নেই। আমার বাবাদের সময়ের মধ্যবিত্ত বলতে শুধু আয়ের দিকটা বুঝতাম না, আরও অনেক কিছু বুঝতাম। ‘ভদ্রলোক’ মাত্রই মধ্যবিত্ত ছিলেন না, কিন্তু তখনকার দিনের মধ্যবিত্তরা সবাই ‘ভদ্রলোক’ ছিলেন। বেশিরভাগ ছিলেন চাকরিজীবী— কাজ করতেন সরকারি অফিসে, স্কুলে, কলেজে, নিউজপেপারে, প্রশাসনে, আর্মিতে, পুলিশ ইত্যাদি।

যাঁর চাকরি ছিল তাঁরও ডাইনে আনতে বায়ে কুলোত না। বাড়িতে আসবাবপত্র যথাসম্ভব কমÑকয়েকটা তক্তপোশই প্রধান সম্বল। বহুআগে কলকাতার প্রেসিডন্সি কলেজের এক অধ্যাপকের স্মৃতিকথা পড়েছিলাম, তিনি লিখেছিলেন, ‘আমাদের সমাজে তক্তপোশের মতো সর্বার্থসাধক আসবাব আর নেইÑ একাধারে তা শোবার খাট, বসবার সোফা, তলায় বাক্স ইত্যাদি রাখার ‘কাবার্ড’। সত্যিই তাই, ছোটোবেলায় আমাদের বাড়িতেও দেখতাম, আমরা বলতাম—‘একের ভিতর পাঁচ’। তখন বোধহয় ‘একের ভিতর পাঁচ’ পাঁচ নামে একটি স্কুলের নোট বই ছিলো, যার মধ্যে স্কুলের পাঠ্য ইংরেজি, বাংলা, পাটিগণিত, বীজগণিত, জ্যামিতি বিষয়গুলোর সমাধান থাকতো। আপনাদের কারো মনে আছে কি?

আমার আব্বা তাঁর গ্রামের একমাত্র বিএ পাস ছিলেন সেই সময়ে। গ্রামে সকলে চিনতো ‘আব্দুল মজিদ বিএ’ নামে। আবার যুক্তও ছিলেন প্রকাশনা ও পুস্তকের মতো অন্যধারার ব্যবসার সঙ্গে। তাও ছোট্ট মফস্বল শহরে। তিনি আত্মীয় পরিচিতজনদের মধ্যে যাদের দেখতেন পড়ালেখার আগ্রহ, উনি গ্রাম থেকে তাদের কুষ্টিয়াতে এনে স্কুল বা কলেজে ভর্তি করে দিতেন। ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে দেখতাম অনেক আত্মীয়স্বজন থাকতেন। তাঁরা গ্রাম থেকেই এসেছিলেন। তাঁরা স্কুলে হায়ার ক্লাসে বা কলেজে পড়তেন আমাদের বাড়িতে থেকে। তাঁরা সকলেই ছিলেন আমাদের নিকট আত্মীয়। যেমন, আমার ছোট মামা, আমার আম্মার মামাতো বোনেরা, ফুফাতো ভাইয়েরা, আমার চাচতো ভাই। দুটি বড় চারচালা, তাতে চারটি ঘর, উত্তরে আম্মার হেঁসেল ঘর, উত্তর পশ্চিমে চৌবাচ্চা সহ কুয়া তলা, দক্ষিণে ফাঁকা, মাঝখানে বড় উঠোন। কুয়াতলার এক কোনায় বড়ো একটি নিমগাছ। গাছটি সারাক্ষণ ছায়া দিয়ে ঢেকে রাখতো কুয়াতলাটি। এ স্মৃতিদৃশ্য আমার একাত্তরপূর্ব। পাঁচ/ছয় বয়সের স্মৃতি। একাত্তর পরবর্তী স্মৃতি বড় করুণ।

এখন ভেবে অবাক হই, ওইটুকু বাড়িতে আব্বা-আম্মা সহ চার ভাইবোন। তার ওপরে আরও সাত আটজন। সারাক্ষণ কোলাহল, হৈচৈ, আনন্দÑ কোথাও অভাব দেখতাম না। যাঁরা খালা-মামা-কাজিনদের সঙ্গে থাকেননি একত্রে তারা বুঝবেন না শৈশব-কৈশোরের আনন্দ ঠিক কী? নিশ্চয়ই আমার আব্বাকে কষ্ট করতে হতো। তাঁর প্রকাশনার ব্যবসা ছিল। তাঁরও নিশ্চয়ই ডাইনে আনতে বায়ে কুলোত নাÑকিন্তু কোনো অভিযোগ করতেন না। আমার চাচাতো ভাইয়েরা ওনাকে রাঙা চাচা বলতেন। উনার গায়ের রং ও চেহারা নাকি অমনই ছিল। আমার মনে পড়ে না। আসলে আমাদের সময়ে আব্বার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা বা তাঁর মুখের দিকে তাকানোর সাহসই হয়নি। উনি অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ ও বন্ধুবৎসল অমায়িক মানুষ ছিলেন বলে শুনেছি। তখন আমার বোধবুদ্ধির বয়স হয়নি। সেভাবে বুঝিনি তাই। এ কথা মনে পড়লে ভালো লাগে যে, যাঁরা আমাদের বাড়িতে থেকে পড়ালেখা করেছিলেন, পরবর্তী জীবনে তাঁরা সরকারের সচিব হয়েছেন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর চেয়ারম্যান হয়েছেন, রাষ্ট্রদূত হয়েছেন, সেনাবাহিনীর জেনারেল হয়েছেন, বিডিআর চিফ হয়েছেন, অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়র হয়েছেন।

আম্মা খালাদের সঙ্গে প্রায় প্রায় আত্মীয়দের বিয়ে খেতে যেতাম। বিয়েতে বই আর শাড়ি ‘উপহার’ দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। উপহার দেবার জন্য আম্মার পছন্দের বই ছিল— ‘মোকসুদুল মোমেনীন’ বা মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’। আব্বার পছন্দ ছিল শরৎচন্দ্রের সিল্ক প্যাডে বাঁধানো‘পরিণীতা’। ফলে দুটো বই একসঙ্গেই উপহার দেওয়া হতো।

বাড়িতে ছিল রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের কাঁচে বাধানো ছবি। পরে যোগ হয়েছিল সুকান্ত ভট্টাচার্য। আগেকার প্রায় মধ্যবিত্তের বাড়িতেই অন্তত রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের ছবি থাকত। এঁদের ছবি থাকা মানে একটি আদর্শকে জানা। ওদের জীবন শুনে খুব উৎসাহ হতো, অনুপ্রেরণার কী যেন একটা তৈরি হতো মনে মধ্যে। পাড়ার সমাজ কল্যাণ মাঠে যে বৎসরে একটা প্রোগ্রাম হতো, সেটিও ‘রবীন্দ্র-নজরুল’ জয়ন্তী। ফেসবুক থেকে