প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: শিক্ষকদের ‘ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্সে’ রাখতে হবে কেন?

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: ‘ঘটনাচক্রে শিক্ষক হবেন না, শিক্ষকতা পেশাকে স্বপ্ন হিসেবে ধরেই আসতে হবে’। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। যারা এমন একটি ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছে যেখানে শিক্ষকতা পেশাকে স্বপ্ন হিসেবে নেওয়া একটা দুঃস্বপ্নের মতো আবার তারাই এখন বলছে ঘটনাচক্রে শিক্ষক হবেন না। সত্যি কি সেলুকাস। যেই সমাজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাষ্ট্রের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর মর্যাদা দেয় সেই সমাজে শিক্ষকতা পেশাকে স্বপ্ন হিসেবে নিবে? তারা নিজেরা কি চান তাদের সন্তান হওয়ার স্বপ্ন দেখুক? এ দেশের ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্সে জাতীয় অধ্যাপকের অবস্থান জানেন? এই লিস্টের ৮ম স্থানে আছে মিনিস্টার্স, চিফ ইলেকশন কমিশনার, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি প্রমুখ (অঢ়ঢ়বষষধঃব উরারংরড়হ)। ৯ম স্থানে আছে স্টেট মিনিস্টার্স, ইলেকশন কমিশনার, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ। ১০ম স্থানে আছেন ডেপুটি মিনিস্টার্সরা। ১২তম অবস্থানে আছে কেবিনেট সেক্রেটারি, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি, আর্মি, নেভি ও বিমান বাহিনীর প্রধানগণ। এরকমভাবে গিয়ে ১৭তম অবস্থানে হলো জাতীয় অধ্যাপক। জাতীয় অধ্যাপকের উপরে আছেন সচিবরা, মেজর জেনারেল পদের আর্মি, নেভি ও বিমানবাহিনীর লোকজন। কল্পনা করতে পারেন জাতীয় অধ্যাপক যিনি হবেন তিনি একজন পিএইচডি করা, অনেক ক্ষেত্রে একাধিক পোস্ট-ডক করা, যিনি জ্ঞান সৃষ্টি করা একজন মানুষ, যিনি প্রচুর সচিব বিচারপতি তৈরির কারিগর তার অবস্থান ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্সের ১৭ নম্বরে।

আর সকল অধ্যাপক না। সিলেকশন গ্রেড অধ্যাপক অর্থাৎ সিনিয়র অধ্যাপকের অবস্থান হলো ১৯ নম্বরে। এখন বলুন শিক্ষকতা পেশাকে স্বপ্ন হিসেবে নিবে কোন বলদে? আর সরকারি কলেজের শিক্ষক? সেটার নিয়োগ হয় পিএসসির মাধ্যমে ংড় পধষষবফ ইঈঝ পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে। সেখানে শিক্ষকতা পেশার চাহিদা হলো ব্যতিক্রম ছাড়া সর্বনিম্নে বা শেষ চয়েস। কারণ যারা শিক্ষকতা পেশাকে ফেসিলিটেটর হিসাবে দেখভাল করার দায়িত্বে তারা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় নেমেছে। যেন তাদের একমাত্র কাজ শিক্ষকতা পেশাকে নিয়ন্ত্রণ করে বেতনে, সম্মানে ও সুযোগ-সুবিধায় নিষ্পেষিত করা। এখন বলুন শিক্ষকতা পেশাকে স্বপ্ন হিসেবে নিবে কোন বলদে? শিক্ষামন্ত্রী কি এসব জানে না? জানে। জেনে শুনেই তারা এসব মেঠো বক্তৃতা দিয়ে সমাজে শিক্ষকদের আরও অপমান অপদস্ত করেন। কারণ শিক্ষকরাতো তাদের ক্ষমতায় বসানোর হাতিয়ার না। এই রাষ্ট্রে তাদেরই মর্যাদা যারা দুর্নীতির মাধ্যমে হউক আর অনৈতিকভাবেই হউক যদি সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে সহায়তা করতে পারে তাহলে তারাই কেবল রাষ্ট্রের সুযোগ সুবিধা পাবে। একজন অতিরিক্ত সচিব গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লক্ষেরও বেশি টাকা লোন পান, প্রতিমাসে ৫০ হাজার টাকা গাড়ি চালানোর খরচ পান আবার বিভিন্ন প্রজেক্ট থেকে ঝটঠ গাড়ি পান।

কলেজের শিক্ষক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বেতনের বাহিরে কি পান? আর প্রাথমিকের শিক্ষক? সেতো তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। রাষ্ট্রের নির্বাচন বা অন্যান্য সকল কাজে কামলা খাটানোতে প্রাথমিক শিক্ষকদের খাটায়। আর পারিশ্রমিক দেয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী বিবেচনা করে। তারা কোনো দাবি নিয়ে রাস্তায় নামলে কি পরিমাণ অপমান করে সেটা না হয় আর নাইবা বললাম। কারণ বলতেও লজ্জা লাগছে। আবার বলে ঘটনাচক্রে শিক্ষক হবেন না, শিক্ষকতা পেশাকে স্বপ্ন হিসেবে ধরেই আসতে হবে। কেমনে? কীভাবে? শিক্ষকদের ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্সে রাখতে হবে কেন? আর রাখলে অপমানজনক অবস্থানে রাখবেন কেন? শিক্ষকদের ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্সে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। শিক্ষকদের জন্য একটি আলাদা বেতন স্কেল করুন। আর মর্যাদা? ওটা শিক্ষকরা নিজেরা অর্জন করে নেবেন। লেখক : শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ