প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] অভাবে এলাকা ছাড়ছে হাওরবাসী

মিনহাজুল আবেদীন: [২] ‘এলাকায় কাজকাম নাই। হাওরে মাছ মারা নাই। আমার পুত (ছেলে) ঢাকা গেছিন কাম করতো। গিয়া অনেক কষ্ট কইরা গার্মেন্টেসে চাকরি নিছিলো। একদিন কইল জ্বর অইছে। আমি কইলাম বাড়িত আইও। পুত কয়, আম্মা অতো কষ্ট করে চাকরিটা নিছি। বাড়িত আইলে চাকরি ছাইড়া আইতে অইব।’ ঢাকা পোস্ট

[৩] কাজের জন্য শহরে যাওয়া ছেলেকে নিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের জয়পুর গ্রামের বাসিন্দা নূর মদিনা বেগম। তিনি জানান, তার ছোট ছেলে মো. ইজাজুল ঢাকায় কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি গার্মেন্টসে কাজও পেয়েছিলেন। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যান তার ছেলে। নতুন চাকরি, বাড়ি এলে তা থাকবে না। এজন্য বাড়ি আসেননি ছেলে ইজাজুল। পরে তিনি মারা যান।

[৪] নূর মদিনার গ্রাম জয়পুর ছাড়াও গোলাবাড়ি, জয়পুর, ছিলাইন তাহিরপুর, রনচি, মন্দিআতা টাঙ্গুয়ার হাওর সংলগ্ন গ্রাম। এসব গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই হতদরিদ্র। উত্তরাধিকার সূত্রে তারা হাওরে মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) হাওর সংরক্ষণে আসার পর বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না করে তাদের জীবিকার পথ মাছ ধরা বন্ধ করে দেয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাদের জাল, নৌকাসহ মাছধরার যন্ত্রপাতি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

[৫] এরপরই গ্রামগুলোতে বিপর্যয় নামে। তবে হাওর ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে একটি মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী গোপনে মাছ ধরা শুরু করে। এ গোষ্ঠীর কারণেই এখন হাওরের পরিবেশ আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। স্থলজ-জলজ জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বিশ্ব ঐতিহ্য টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা দেশ-বিদেশের পর্যটকদের জানা। সুযোগ পেলেই দেহ-মন সতেজ করতে তারা টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে আসেন শীত-বর্ষায়।

[৬] অপেক্ষাকৃত ধনী পর্যটকদের অনেকেই হাওর অঞ্চলে জায়গা-জমি কিনে ব্যবসা শুরু করেছেন। ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য তারা তৈরি করেছেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক নৌকা। একদিকে হাওরে যখন এমন অবস্থা, অন্যদিকে তখন দরিদ্র হাওরবাসীদের অবস্থা করুণ। জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ পাচ্ছেন না তারা। হাওরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে রাজধানী ঢাকার গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাজের আশায় ছুটছেন। এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় তাদের সন্তানদের পড়ালেখাও অনিশ্চিয়তার মুখে পড়েছে। এতে বিপর্যয়ে পড়েছে কৃষি অর্থনীতিও।

[৭] হাওর সংলগ্ন গ্রাম গোলাবাড়ির আশি-ঊর্ধ্ব প্রবীণ গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমাদের গেরামটা অভাবী। অভাবে অনেক পরিবার ঢাকা গেছেগা। আর ঢাকা থাইক্যা অনেকে আইয়া এহানে রুজি করে। আমরা দিন দিন গরিব অই। না মাছ ধরতে পারি। না কাম করতে পারি।’

[৮] ৯৭ দশমিক ২৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের টাঙ্গুয়ার হাওরটি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও ধরমপাশা উপজেলার ছোট বড় ৮৮টি গ্রাম নিয়ে বিস্তৃত। এসব গ্রামের ৮০ হাজার জনসংখ্যার ৩০ ভাগ মৎস্যজীবী, ৬০ ভাগ কৃষিজীবী এবং ১০ ভাগ মানুষ অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত।

[৯] ২০০৩ সাল থেকে আইইউসিএন দেশীয় কয়েকটি এনজিওকে নিয়ে হাওর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল। ২০১৭ সালে চলে গেছে আইইউসিএন। সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে পরিবেশ ও প্রকৃতি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কার্যক্রম নেওয়া হলেও অভিযোগ উঠেছে সংরক্ষণকালেই পরিবেশ ধ্বংস হয়েছে। গাছ, মাছ, পাখিশূন্য হয়ে গেছে টাঙ্গুয়ার হাওর। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংরক্ষিত জলাভূমি (রামসারসাইট) হওয়ার পরও এখন অরক্ষিত অবস্থার সুযোগে পর্যটকদের দখলে চলে গেছে টাঙ্গুয়ার হাওর।

[১০] জয়পুর গ্রামের বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব গৃহিণী হাজেরা বেগম বলেন, ‘আমরা (আমাদের) গেরাম থাইক্কা সাদ্দাম, সায়েদ, আবুল কাশেম, সেলিম, সবুজ, সাগর, মুজিবুর, সোহাগ ও তওফিকের পরিবার ঢাকায় গেছেগা (চলে গেছে)। টাঙ্গুয়ার পাড়ো থাইক্যা আমরার রুজি নাই। বাইস্যা মাসো (বর্ষার সময়) ঘরো বইয়া থাকি। এখন সবাই জি-পুত (ছেলে-মেয়ে) বাঁচানোর লাগি ঢাকা চইল্যা গ্যাছে।’

[১১] একই গ্রামের গৃহিণী খুকি সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা গেরামের মানুষ কষ্টে আছি। কামাই-রুজি করতাম পারি না। মাছ ধরতাম পারি না। মাছ ধরতে গেলেও মাছ নাই। টাঙ্গুয়ার মাছ লুট অই গিছে (হয়ে গেছে)। কতো কতো মানুষ আউর (হাওর) দেখতে আয়, আমরার লাগি তারা কুনুতা (কিছু) করে না।’

[১২] মো. নুর হোসেন বলেন, ‘আমাদের গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই গরিব। বৈশাখে সামান্য বোরো ধান ছাড়া আর কিছু পায় না তারা। বর্ষায় মানুষ ঢাকায় কাম করতে চলে যায়।’

[১৩] তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রামের অভাবী অনেক পরিবার ব্যবসায়ী পর্যটকদের কাছে জায়গা জমি বিক্রি করে দিয়েছে। আর পর্যটকরা সুন্দর সুন্দর নৌকা তৈরিসহ নানা কিছু করে ব্যবসা করছেন। তারা কেউ টাঙ্গুয়ার মানুষের জন্য কিছু করছেন না।’

[১৪] বিষয়টি নিয়ে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, ‘হাওর এক ফসলি এলাকা। বর্ষায় কোনো কাজ থাকে না। তাছাড়া হাওরে এখন আগের মতো মাছ নেই। বিকল্প আয়ের সুযোগ নেই। তাই টাঙ্গুয়ার হাওরসহ অন্যান্য হাওরপাড়ের মানুষজন ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কাজের সন্ধানে যাচ্ছেন। আমরা তাদের জন্য বিকল্প আয়ের পথ বের করার চিন্তা করছি।’

[১৫] টাঙ্গুয়ার হাওরে রয়েছে ৫২টি বিল, ১২০টি কান্দা-জাঙ্গাল জুড়ে রয়েছে ১৪১ প্রজাতির মাছ, ২০০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২১৯ প্রজাতির পাখি, ৯৮ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি, ১২১ প্রজাতির দেশী পাখি, ২২ প্রজাতির পরিযায়ী হাঁস, ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী পাণী, ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ১১ প্রজাতির উভচর প্রাণীসহ অসংখ্য স্থলজ ও জলজ প্রাণী। দেশের সর্ববৃহৎ হিজল-করচের বাগান রয়েছে এ হাওরে।

সর্বাধিক পঠিত