প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কারাগারে অনিয়মের শাস্তি শুধু বদলি

নিউজ ডেস্ক:  ‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’- এই শপথবাক্য মননে, চেতনায় ধারণ করেই দেশের কারারক্ষীদের দায়িত্ব পালন করার কথা। দেশের সব কারাফটকে বড় অক্ষরে এই স্লোগান লেখা আছে। কিন্তু এই শপথবাক্য বা স্লোগান নিজেরাই মানছেন না কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কারারক্ষীদের সহায়তায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কারাবন্দিদের বড় একটা অংশ। বন্দিদের মধ্যে শৃঙ্খলা আনা দূরের কথা, উল্টো অনিয়ম করে কোনো কোনো কারারক্ষী একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন বছরের পর বছর। এসব অনিয়ম দূর করতে দেড় বছর আগে বিভিন্ন অপরাধে প্রায় তিনশ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছিল। এর পরও অনিয়ম-দুর্নীতি থামেনি। বদলি হওয়া ওইসব কর্মকর্তা-কর্মচারীরও দুর্নীতি থেমে নেই। কারাগারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণলায়ের পক্ষ থেকে গঠিত কয়েকটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারাগারের অন্তত ৪০ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর বাইরেও নানা অনিয়মে জড়িত বিভিন্ন পর্যায়ের দুই শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। সংশ্নিষ্ট সূত্র বলছে, কারাগারে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির শাস্তি শুধু ‘বদলি’। এই লঘু দণ্ডকে তারা কোনো শাস্তিই মনে করেন না। নতুন কারাগারে বদলি হয়ে তারা ফের একই অপকর্ম শুরু করেন। এ জন্য অনিয়ম বাড়ছে বলে কারাগারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা মনে করেন।

কারা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বলা আছে- ‘কারাগারে বন্দিদের কঠোর নিরাপত্তা প্রদান ও তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখা; বন্দিদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা; যথাযথভাবে তাদের বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ নিশ্চিত করা; সুনাগরিক হিসেবে সমাজে বন্দিরা যাতে পুনর্বাসিত হতে পারেন, সে জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।’ কিন্তু সরকারি তদন্তেই দেশের কারাগারগুলোর বাস্তব চিত্র উল্টো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের কারা শাখার প্রধান ও অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, দেশের অন্তত ৩৭টি কারাগারে অনিয়ম-দুর্নীতি ওপেন সিক্রেট। অর্থের বিনিময়ে আসামিদের সঙ্গে বিশেষ সখ্য, অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া-নেওয়া হয়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একাধিক কর্মকর্তা ও কারারক্ষী এসব অপকর্ম করছেন। তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও শাস্তি হিসেবে শুধু অন্যত্র বদলি করা হয়। পরবর্তী সময়ে জোরালো তদবিরে সেই বদলিও স্থগিত করা হয়।

প্রতিবেদনে যেসব অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে: প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, প্রথমে আসামিদের কারাগারের একটি কক্ষে আনা হয়। কারাগারের ভাষায় এটিকে ‘আমদানি কক্ষ’ বলা হয়। এ কক্ষে আসা আসামিদের বলা হয় ‘গরু’। এখান থেকে তাদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিক্রি করা হয়। এসব ওয়ার্ড নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন পুরোনো বন্দি, ওয়ার্ড ইনচার্জ ও কারারক্ষীরা। ওয়ার্ড থেকে কেউ কেউ হাসপাতালে চিকিৎসার নামে বিক্রিও হয়ে থাকেন টাকার বিনিময়ে। তবে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য মাসে ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা দিতে হয়। হাসপাতাল ছাড়া অন্য ওয়ার্ডে থাকতে হলে সে ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা বন্দিদের কাছ থেকে আদায় করা হয়। প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়োজিত একজন নিয়ন্ত্রক কারা কর্মকর্তাদের উৎকোচ দিয়ে নতুন বন্দিদের ক্রয় করে থাকেন। পরবর্তী সময়ে নিয়ন্ত্রকদের মাধ্যমে ওয়ার্ড পরিচালিত হয়। নিয়ন্ত্রকদের অর্থ না দিলে বন্দিদের ওপর নেমে আসে নির্যাতন।

অনিয়মের এখানেই শেষ নয়। শীতকালে ওয়ার্ডে মোটা কম্বল বা অতিরিক্ত কম্বল পেতে হলে বন্দি প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকা দিতে হয়। পর্যাপ্ত পানি পেতে হলে টাকা দিতে হয়। কারাগার তল্লাশিকালে কোনো মাদকদ্রব্য পাওয়া গেলে সেগুলো নষ্ট করার নিয়ম থাকলেও তা করা হয় না।

টাকাওয়ালাদের আয়েশি জীবন: কেন্দ্রীয় কারাগারে আসামিরা তিন স্তরে বিন্যস্ত। সবার কাছ থেকেই কম-বেশি ঘুষ নেওয়া হয়। মোটামুটি ভালো খাওয়া ও থাকার জন্য দিতে হয় সাড়ে ৩ হাজার টাকা; মাঝারি ধরনের খাবারের জন্য দিতে হয় আড়াই হাজার টাকা এবং যে কোনো স্থানে থাকতে হলে এক হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়। টাকা আদায়ের বিষয়টি বেআইনি হলেও কারাগারে এটি এখন নিয়মে পরিণত। আগে টাকা প্রতি মাসে নেওয়া হলেও এখন নেওয়া হয় সপ্তাহে। এ ছাড়াও বড় ব্যবসায়ী, সোনা চোরাচালানি ও মাদক ব্যবসায়ীরা বিলাসী জীবনযাপনের জন্য থাকেন কারা হাসপাতালে। এ জন্য জনপ্রতি গুনতে হয় ২৫ হাজার টাকা। অসুস্থ না হলেও তারা টাকার বিনিময়ে হাসপাতালে থাকা-খাওয়ার সুযোগ পান। টাকা না দিলে যারা অসুস্থ তারাও ঠিকমতো চিকিৎসা পান না। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত জিকে শামীম, বহিস্কৃত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটসহ অনেকেই চিকিৎসার নামে হাসপাতালে অবস্থান করছেন। নানান ছলচাতুরী ও কারাগারের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে রোগী সেজে অধিকাংশ সময় হাসপাতালে থাকছেন তারা। এমন অভিযোগ মাঝেমধ্যে উঠলে কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে। এভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতি দীর্ঘদিন চলমান থাকলে কারাভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন ডেপুটি জেলার হুমায়ন কবির, জেলার এজি মাহমুদ, জেল সুপার নুরুন্নবী ভুঞা, কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের জেল সুপার জাকের হোসেন, প্রধান কারারক্ষী তপন কুমার হালদার, সরবরাহকারী ঠিকাদার নরেন্দ্রনাথ সাহা, প্রাক্তন জেলার এসএম মহিউদ্দিন, ঝিনাইদহের জেল সুপার গোলাম হোসেন, রাজশাহী কারাগারের ডেপুটি জেলার সাইফুল ইসলাম, জেলার মোহম্মদ হাবীবুর রহমান, সিনিয়র জেল সুপার হালিমা খাতুন। তবে রাজশাহীর তৎকালীন ডিআইজি আলতাফ হোসেন পরিদর্শন করলেও অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন সুরক্ষা সচিবের কাছে জমা দেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সুরক্ষা সচিবের সভাপতিত্বে সব উপ-কারা মহাপরিদর্শক, অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক এবং কারা মহাপরিদর্শকের সমন্বয়ে একটি সভা করে অনিয়ম বন্ধের কর্মকৌশল তৈরির সুপারিশ করা হয়। এর পর এ বিষয়ে নানান বিশ্নেষণ করা হয়। কিছুদিন আগে সুরক্ষা সচিব অবসরোত্তর ছুটিতে চলে যাওয়ায় সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।

তদন্ত কমিটির সুপারিশ কার্যকর হচ্ছে না: তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও কার্যকর হচ্ছে না। এমনকি অগ্রগতি সম্পর্কে তাগাদা দিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে জানতে চেয়ে চিঠি পাঠানো হলে তারও সন্তোষজনক জবাব মিলছে না। ‘ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে’ বা ‘এখনও নিষ্পত্তি হয়নি’ ইত্যাদি গতানুগতিক বাক্য সংযুক্ত করে মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। এভাবেই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ফাইল ঘেরাটোপের বেড়াজালে আটকে থাকছে। এতে দুর্নীতিবাজরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন।

দায়িত্বশীলরা যা বলছেন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘বেশ কয়েকটি কারাগারের বিভিন্ন অনিয়ম বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন এসেছে। সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তা ছাড়া কারাগারগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্নিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মোমিনুর রহমান মামুন বলেছেন, তিনি যোগ দেওয়ার পর থেকে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ক্যান্টিনসহ যেখানে দুর্নীতির সুযোগ আছে, সেখানে অডিটসহ নানা নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। দুর্নীতি ধরা পড়লে শাস্তি পেতে হবে। কারাগারের নিরাপত্তায় প্রচলিত ব্যবস্থার সঙ্গে সব কারাগারকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। আরও কিছু আধুনিক নিরাপত্তা ডিভাইস বসানোর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।

আইজি প্রিজন কিছু ইতিবাচক তথ্য দেন। তিনি জানান, এখন সব কারাগারে খাবার উন্নত হয়েছে। নাশতা হিসেবে খিচুড়ি, সবজি, রুটি, হালুয়া দেওয়া হয়। বিশেষ দিনে উন্নত খাবার দেওয়া হয়। আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়া বন্দিদের আগে খাবারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এখন সে ব্যবস্থা হয়েছে। কাশিমপুর ও কেরানীগঞ্জ কারাগারে লাইব্রেরি, জিমনেশিয়াম করা হয়েছে। বন্দিদের জন্য পরিবারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আরও আটটি কারাগারে এ সংস্কার কাজ চলছে। সেখানে ধারণক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছে। সূত্র: সমকাল