প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খান আসাদ: আমেরিকার ‘ওয়ার অন্ টেররের’ সিদ্ধান্ত কি ‘গণতান্ত্রিক’ উপায়ে হয়েছিলো

খান আসাদ : আমেরিকার সদ্য সমাপ্ত ‘ওয়ার অন্ টেররের’ সিদ্ধান্ত কি ‘গণতান্ত্রিক’ উপায়ে হয়েছিলো? অথবা এই সিদ্ধান্ত কি সমাজবিজ্ঞানের অগ্রসর জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে হয়েছিল? প্রথমে দেখা যাক সিদ্ধান্তটি কেমন এবং তারপর দেখা যাক কী প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিলো। টুইন টাওয়ারে আক্রমণ হলো ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ সাল। এটি কোনো দেশ/রাষ্ট্র আমেরিকাকে আক্রমণ করেনি। অর্থাৎ এটি কোনো কনভেনশনাল যুদ্ধ ছিলো না। এটি ছিলো একটি ‘সন্ত্রাসী’ হামলা, যে সন্ত্রাসীদের একসময় আমেরিকা তৈরি করেছিলো ‘কমিউনিজম’ ঠেকাবে বলে এবং এই সন্ত্রাসীরা ‘ট্রান্স ন্যাশনাল’, অপারেট করছে গ্লোবালি।

২০০১ সালের আগেই ‘সন্ত্রাসবাদ’ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। সাধারণভাবে সহিংসতা ও শান্তি নিয়ে অনেক অনেক গবেষণা ও সমাজবৈজ্ঞানিক জ্ঞান রয়েছে। রাজনীতিবিদদের না থাকলেও আমেরিকা ও ইউরোপের একাডেমিয়া ও শান্তি কর্মীদের রয়েছে। আমেরিকা সিদ্ধান্ত নিলো, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধ করা হবে দেশ/রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। সরাসরি সন্ত্রাসী গ্রুপের বিরুদ্ধে না। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। গোলপোস্ট শিফট হয়ে গেলো। দুই যুক্তিতে, সমস্যাটা ‘ইসলাম ভার্সেস ওয়েস্ট’ এবং হয় তুমি তাদের পক্ষে, না হয় আমাদের’। তাত্ত্বিক যুক্তি যথেষ্ট না, মিথ্যাচার করা হলো, ষড়যন্ত্র করা হলো ‘ওয়েপন অব মাস ডেস্ট্রাকশন আছে’ এই নিয়ে গুজব দিয়ে ইরাক আক্রমণের। সমাজবৈজ্ঞানিক গবেষণালব্দ জ্ঞান দিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী রণকৌশল ও পদক্ষেপ কেমন হতো? (বাদ দিন সমাজবিজ্ঞান, কমনসেন্স দিয়ে এগুলেই বা কি হত?) একটি আশু পদক্ষেপ নেওয়া হতো, সামরিক বা পুলিসি। সার্চ অ্যান্ড ডেস্ট্রয়। সার্চ করা মানে জানা তারা কে কোথায় আছে। মার্কিন ‘সিআইএ’, সৌদি ও পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দারা তাদের নাড়ি-নক্ষত্র জানে।

ফলে, সার্চ পার্ট খুব জটিল ছিলো না। এরপর কীভাবে ‘ডেস্ট্রয়’ করতে হয়ে আমেরিকা ও বৃটিশ সামরিক বিশেষজ্ঞরা তা ভালোই বুঝেন। তারাই দেশে দেশে ‘এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিংয়ের প্রশিক্ষক। দ্বিতীয় আরেকটি সাংস্কৃতিক পদক্ষেপ হতো। সন্ত্রাস বাদের পেছনে যে মতাদর্শ বা বিশ্বাস, যা দিয়ে সন্ত্রাসের ‘বৈধতা’ দেওয়া হয়, সেই বিশ্বাস-ধারণা, মতাদর্শ নিয়ে ব্যাপক প্রচার। এর রাজনৈতিক অর্থনীতি, মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, ডিস্কারসিভ চর্চা- এসব নিয়ে জ্ঞানের উৎপাদন ও সম্প্রসারণে পুঁজি বিনিয়োগ। এমন সব কালচারাল প্রোডাক্ট তৈরি করা সিনেমা ইত্যাদি যা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে আপাত বিরোধ নেই। আমি যা বললাম, এই সাংস্কৃতিক কাজ কিছুটা শান্তিবাদী সংগঠনের বা ব্যক্তির উদ্যোগে হয়েছে।

২০০৬ সালেই অমর্ত্য সেনের বই Identity and Violence প্রকাশিত হয়। এটি হতে পারতো সন্ত্রাসবাদ বিরোধী কৌশল নির্ধারণের বাইবেল। কিন্তু তা হয়নি। কেন হয়নি? ওইযে ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’ ও ‘আউট সোরসিং’ তত্ত্ব। কি এই তত্ত্ব? ‘যুদ্ধকেও রাষ্ট্রের বা সরকারের হাতে না রেখে, ব্যাক্তি মালিকানায় দিয়ে দাও’। কনট্রাক্টরদের হাতে দিয়ে দাও। আপনি বলবেন তাহলে তো মার্সেনারি মানে ভাড়াটিয়াদের হাতে দিতে হবে। হ্যাঁ, কিন্তু না, আফগানিস্তানে তাদের একটি নাম আছে চগঈ, মানে প্রাইভেট মিলিটারি কোম্পানি। অন্য নাম সিকিউরিটি কনট্রাকটর। ২০২০ সালে এরকম কনট্রাকটর ছিলো ২৭০০০, মার্কিন সেনাদের চেয়ে তিনগুন বেশি। কেন এই তত্ত্ব? কারণ এর পেছনে আছে প্লুটোক্রেসি। প্লুটোক্রেসি মানে, একটি অতিক্ষুদ্র বিত্তবান ব্যবসায়ী সামরিক-কর্পোরেট গোষ্ঠী, রাষ্ট্রীয় বা সরকারী সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে। এখানে, এটাকে অলিগার্কি বলাও ভুল হবে। তারা কারা? তেল ও নিরাপত্তা ব্যবসায়ীরা যেমন এক্সন মবিল ও ব্ল্যাক ওয়াটার ইত্যাদি। মানে গোটা সিদ্ধান্তই একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বার্থে, জাতীয় স্বার্থে নয়। জী হ্যাঁ, এই ক্ষেত্রে এনলাইটেন্ড ডিক্টেটরশিপ অনেক অনেক ভালো, অলিগার্কি বা প্লুটোক্রেসি থেকে। প্লুটক্রেসি বা অলিগার্কি থেকে সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান রাখে এরকম ‘আলোকিত স্বৈরতন্ত্র’ কাজের। গণতন্ত্র নাম দিয়ে, কারণ ওই সরকার ভোটে জিতে এসেছে, এরকম অলিগার্কি বা প্লুটোক্রেসি শুধু একটি ক্ষুদ্র শ্রেণির স্বার্থে কাজ করে, জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে।
২০ বছর মেয়াদী যুদ্ধে আমারিকা লজ্জাজনকভাবে হেরেছে?।

প্রায় তিন ট্রিলিয়ন খরচ করেছে, নিজের দেশের অনেক তরুণ সৈন্যের জীবন গিয়েছে। সারা দুনিয়ায় যে কি কি ডিজাস্টার করেছে সেটা এখনও হিসাব চলছে। কিন্তু প্রশ্ন করতে হবে, ‘কারা লাভবান হয়েছে’? কারা? তালেবান? জী না ভাই, প্রধানত চগঈ বা যুদ্ধ বেনিয়ারা, ওয়ার কনট্রাকটর্স, হত্যা বা সহিংসতার ঠিকাদারেরা। দুই দেশেই। পৃথিবী আরেকটি ঠাণ্ডা যুদ্ধের সামনে। ৯০শতাংশ আমেরিকান মাত্র ৬টি সংবাদ ঠিকাদারের বানানো সংবাদ জানে। এ সংবাদের বা মগজধোলাইয়ের প্রভাব পরে, বাংলাদেশসহ দুনিয়ার অন্যান্য দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের উপর। তারা চীনের কর্তৃত্ববাদ নিয়ে সোচ্চার। কিন্তু মার্কিন, ইউরোপীয় বা নিজের দেশের অলিগার্কি, প্লুটোক্রেসি বা শ্রেণি-কর্তৃত্ববাদ নিয়ে নয়। এই মধ্যবিত্তদের হাতে টাকা দেওয়ার জন্যই কিন্তু ‘মুক্ত বাজার’ বা প্রাইভেটাইজেশন দরকার। লটারির মতো, কেউ পায়, অনেকেই বেকার থাকে। বেকার হলে কি হবে, চোখের সামনে লটারি জেতার স্বপ্ন। ফেসবুকে এই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যুক্তি দেবে, ‘আন্নে আমেরিকাত আইচেন ক্যান, আমেরিকা এত্ত খারাপ হইলে?’ না রে ভাই, প্রশ্নটা আমেরিকা বা আফগানিস্থান নিয়ে নয়। প্রশ্নটা বৈষম্য ও সহিংসতার। প্রশ্নটা শ্রেণি শাসনের। প্রশ্নটা দেশ প্রেমের।

কোনো সন্দেহ নেই, চীনে একটি পার্টির শাসন যদিও আক্ষরিক অর্থে বহু দলীয়। একটি পার্টির শাসন হোলেই তা জাতীয় স্বার্থ বিরোধী হবে এমন নয়। অন্যদিকে নামে ‘গণতন্ত্র’ ও দুইটি প্রধান পার্টির সরকার হোলেই তা দেশপ্রেমিক হবে এমনটাও নয়, যদি তা শুধু একটি ক্ষুদ্র বিত্তবান শ্রেণির শাসন, প্লুটোক্রেসি বা অলিগার্কি বা শ্রেণি কর্তৃত্ববাদ হয়। জনগণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্রের পথ অনেক দীর্ঘ। তবে সেই পথে হাঁটতে হলে সকল ধরনের বৈষম্য ও সহিংসতার বিরোধিতা করতে হবে। সহিংসতাকে পণ্য ও পেশা হিসেবে পুঁজিবাদী চর্চার বিরোধিতা করতে হবে। আশাকরি আমেরিকার জনগণ, এই ‘ওয়ার অন্ টেরর’ থেকে রাজনৈতিক শিক্ষা নেবে। আমেরিকায় বৈষম্য ও সহিংসতা বিরোধী শান্তি কর্মীরা নতুন উদ্যোগে ‘জনগণতান্ত্রিক আমেরিকার’ জন্য সংগ্রাম করবে। সেটা হলে, দুনিয়ার অন্যান্য দেশেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত