প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

২৪০০ কবিতা, ১০টি প্রবন্ধ ও অসংখ্য গানের লেখক বালুশ্রমিক গুলজার

মাহফুজুর রহমান: কাক ডাকা ভোর হলেই ব্যালচা হাতে ছুটে যান ট্রাকে। বালু নামিয়ে অর্থ উপার্জন করেন। দু’হাতে ব্যালচা চালান আর ভাবনায় নিয়ে আসেন কবিতার ছন্দ। বাড়িতে ফিরেই লিখতে বসে যান। এভাবে দুই হাজারের অধিক কবিতা লিখেছেন বালু শ্রমিক গুলজার হোসেন ওরফে গরিব। যাকে সবাই গরিব কবি নামেই চেনেন। গরিব কবি ২ হাজার ৪’শ কবিতা , ২১০ টি আধুনিক গান ও ১০ টি প্রবন্ধ লিখেছেন।

গুলজার হোসেন ওরফে গরিব কবি’র একটি কবিতা ‘তোমাকে হত্যার পর’ ভারতের আবৃতিকার অনিন্দিতা মদক আবৃতি করেছেন, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যপক সাড়া ফেলেছে। এছাড়া ‘নদী মানুষ ও বাঁক’ নামে একটি প্রবন্ধ ভারতের একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

আর ঝিনাইদহের বেগবতি প্রকাশনা ল্যাম্পপোস্টই আলো, ঢাকার ইনভেলাপ প্রকাশনা থেকে গরিবের বিদ্বেষ ও কুহকে মোহিত নামের তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। গুলজার হোসেন ওরফে গরিব (৪১) ঝিনাইদহ জেলার মহারাজপুর গ্রামের রেজাউল ইসলামের পুত্র। হতদরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। ১৯৮০ সালে তিনি জন্ম গ্রহন করে মাত্র ১০ বছর বয়সে ৯০ সালে বাবার সঙ্গে কৃষি কাজে নেমে পড়েন। ৪ বছর কৃষি কাজ করে চলে যান ঝিনাইদহ শহরে। সেখানে মাথায় বাক্স নিয়ে আইসক্রিম বিক্রি শুরু করেন।

কখনও আইসক্রিম আবার কখনও ভ্যান চালিয়ে ৯ টি বছর পার করেছেন। তখন নিজ বাড়ি থেকে ভোরে বের হয়ে ৯ কিলোমিটার দুরে শহরে যেতেন, রাতে ফিরে আসতেন। যেটা খুবই কষ্টকর হওয়ায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঝিনাইদহ শহরে চলে আসেন। ভাড়া বাসায় থেকে দুই বছর রিক্সা চালিয়েছেন। ২০০৫ সালে হাতে তুলে নেন ব্যালচা।ট্রাক থেকে বালু নামানোর কাজ শুরু করেন। সেই সময়ে এক ট্রাক বালু নামালে ২শ’৫০ টাকা থেকে ৩শ’ টাকা হতো, বর্তমানে ৫শ’ থেকে ৬ শত টাকা আয় হয়। বর্তমানে কাঞ্চনপুর এলাকা (ট্রাক টার্মিনালের পেছনে) টিনের চালের দুই কক্ষের একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করেন। তার স্ত্রী সেলিনা বেগম বাড়ির কাজ করেন। মেয়ে মিতা নূর এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। ছেলে একরামুল কবির নবম শ্রেণিতে পড়ছে।

গুলজার হোসেন গরিব জানান, দরিদ্র বাবা তাদের ৫ ভাই-বোনের সংসার ঠিকমতো চালাতে পারতেন না। ঠিকমতো খাবার জুটতো না তাদের, যে কারনে পড়ালেখা করতে পারেননি। মহারাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া কালেই কাজে নেমে পড়েন। কিন্তু পড়ার পতি তার প্রবল আগ্রহ ছিল। মাঠের কাজ, আইসক্রিমের হকারী, ভ্যান চালানো থেকে শুরু করে যখন যা করেছেন তার মাঝে সুযোগ করে বই পড়েছেন। নিজে বই কিনতে পারেননি, অন্যের কাছ থেকে ধার করে পড়তেন। সন্ধ্যা হলেই বিষয়খালী বাজারে বসে পত্রিকা পড়তেন। গুলজার হোসেন গরিব জানান, অভাবের কারনে পড়তে পারেননি, তবে অজ্ঞ থাকবেন না এটাই পন করেছিলেন। তাই জ্ঞানার্যনের জন্য পড়ালেখা করতেন।

এভাবে ২০০১ সালে এক সময় ইচ্ছা হয় কবিতা লেখার। কিন্তু বাড়িতে কাগজ ছিল না, তাই বাজার থেকে সিগারেটের ঠোঙ্গা কুড়িয়ে নিয়ে যান। এক রাতে বাড়িতে বসে সেই ঠোঙ্গায় লিখে ফেলেন ‘আহবান’ নামের একটি কবিতা। গুলজার জানান, প্রথম লেখা কবিতাটি তিনি অনেককে দেখানোর পর সবাই খুব ভালো বলেছিল। সেখান থেকে উৎসাহ পেয়ে চালিয়ে যেতে থাকেন কবিতা লেখা। একে একে ‘এখানে যা নেই, তোমাকে হত্যার পর, গরিবের বিদ্বেষ, প্রিয় সাবির হাকা, উত্তপ্ত পৃথিবী, গভীর রাত, আব্রাহামের সংজ্ঞা মিথ্যা, মৃত্যু আসুম, অভ্যন্তরে যে কান্না,ধৃষ্টতা, লাল সালুর পোষ্ট মর্টেম, ভাইরাস’ ছাড়াও ২৪ শত কবিতা লিখেছেন। আধুনিক গান লিখেছেন ২১০ টি, যে গানগুলো স্থানীয় অনেক শিল্পীর কন্ঠে শুনেছেন শ্রতারা। ১০ টি প্রবন্ধও লিখেছেন তিনি।

গুলজার হোসেন জানিয়েছেন, একটি সময় ভ্যান-রিক্সা চালানোর সময় কবিতা মনে আসতো। আর বালু শ্রমিক হিসেবে যোগদানের পর প্রতিদিন ভোর হলেই ব্যালচা কাঁধে নিয়ে ট্রাকে চলে যেতেন। বালু বিক্রির পর ক্রেতার বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আসতেন। এ সময় কবিতার ছন্দ তার মাথায় খেলতো। বাড়িতে ফিরে গিয়ে লিখতে বসে যেতেন। যখন যে কাজই তিনি করতেন, কবিতা-গান মনের মধ্যে থেকে যেতো। তিনি জানান, দরিদ্র হওয়ায় তিনি কবিতা আর গানগুলো বেশি দূর পৌছে দিতে পারেননি।

সব লিখে জমিয়ে রেখেছেন। এরই মধ্যে আনুমানিক ৬ বছর পূর্বে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু কবিতা ছড়িয়ে দেন। তখনই সাড়া পড়ে। ভারত থেকে কবিতা আবৃতি হয়, ভারতের পত্রিকায় প্রবন্ধ ছাপা হয়। দেশের দুইটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তার কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তার কবিতা ও গান লেখা দেখে একজন একটি কম্পিউটার উপহার দিয়েছেন। এখন তিনি সেই কম্পিউটার ব্যবহার করে লিখছেন। নিজে কম্পিউটার চালানো শিখে নিয়েছেন। এখন তাঁর সব লেখা সংরক্ষণ করতে পারছেন। গরিব কবি জানান, বর্তমানে তিনি খুবই আর্থিক কষ্টে আছেন। ২০১৬ সালে একদিন ট্রাক থেকে বালু নামানোর সময় পিঠের নিচের অংশে ব্যাথা অনুভব করেন। চিকিৎসক দেখানোর পর তার কিডনীতে সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়ে দেন এবং পরামর্শ দেন ব্যালচা চালানো কাজ আর না করতে।

এই অবস্থায় তিনি জমানো ও ধার করা লক্ষাধিক টাকা দিয়ে বালুর ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু তেমন একটা লাভ করতে পারেননি উল্টো এই দীর্ঘ সময় ঔষধ খেয়ে পুজি হারিয়ে ফেলেছেন। এখন আবার ব্যালচা হাতে ট্রাকে যান। তবে প্রায়ই তাকে কাজ না করে বসে থাকতে হয়। এতে খুবই অর্থ কষ্টে সময় পার করছেন। ছেলে-মেয়ের পড়ালেখার খরচ মিটিয়ে সংসার চালানো তার পক্ষে খুবই কষ্টকর বলে জানান তিনি। সংসারের পরিস্থিতি মাথায় আসলে মাঝে মধ্যে লেখার আগ্রহ কমে যায়। গরিব কবি সম্পর্কে ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হাসান অরিন্দম জানান, গুলজার হোসেন ওরফে গরিব অত্যান্ত সংগ্রামি একজন মানুষ।

এই মানুষটি হকারি করেছেন, রিক্সা চালিয়েছেন। এখন তিনি ট্রাক থেকে বালু নামানোর কাজ করেন। তিনি বলেন, গরিব তার কবিতার মধ্যে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ ও শ্রমিক শ্রেণীর বঞ্চনা তুলে ধরেন। তাছাড়া স্ব-শিক্ষিত এই কবি এক সময় পুরানো ধাচের কবিতা লিখলেও এখন আধুনিক কবিতা লিখছেন। তিনি অনেক পড়ালেখা ও সাধনা করে যাচ্ছেন। হাসান অরিন্দম আরো জানান, কার কাছে গেলে শিখতে পারবেন এটা বুঝে তিনি তার সানিধ্য পাওয়ার চেষ্টা করেন। এভাবে চর্চা করে গেলে তিনি একজন ভালো কবি হয়ে উঠবেন বলে তিনি জানান।

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত