প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এম. নজরুল ইসলাম: টিউলিপ সিদ্দিক- বিলেতে বাঙালীর জনপ্রতিনিধি

এম. নজরুল ইসলাম: মানুষের ইচ্ছাশক্তি এগিয়ে নিয়ে যায় তাকে। এই ইচ্ছাশক্তির প্রমাণ আমরা পাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারে। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে জাতির জনককে হত্যার পর তাঁর জীবিত দুই কন্যার রাজনীতিবিমুখ হওয়ার কথা ছিল। তারা দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হতে পারতেন। কিন্তু তারা সেপথে যাননি। দেশের প্রতি ভালবাসার টানে দেশসেবাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সদস্য টিউলিপ সিদ্দিক নিজেকে তার পরিসরে যোগ্যতার সঙ্গে মেলে ধরতে চেয়েছেন। তিনি তা পেরেছেন। যেখানে সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা, সেখানে তিনি শুধু নিজের যোগ্যতাই প্রমাণ করেননি, গ্রহণযোগ্য হিসেবেও গড়ে তুলেছেন। এ সবই সম্ভব হয়েছে তার ইচ্ছাশক্তির গুণে, যা তিনি অর্জন করেছেন তার পারিবারিক সংস্কৃতি থেকে। তিনি সেই ঐতিহ্যের ধারক, যেখানে চ্যালেঞ্জ নেয়া থেকে কাউকে পিছিয়ে আসতে দেখা যায়নি। টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক প্রমাণ করেছেন, দূরপ্রবাসেও বাঙালী নিজেকে তুলে ধরতে পারে। টিউলিপের এই অর্জন আমাদের সবাইকে গৌরবান্বিত করে। বাংলাদেশের মানুষও এই কৃতিত্বের অংশীদার। টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক এখন নিজের পরিচয়েই পরিচিত। কিন্তু তার আরেকটি পরিচয়ে বাঙালী মাত্রই শ্লাঘা অনুভব করে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্তের উত্তরাধিকার।

গ্লোবাল ভিলেজ মতবাদের পক্ষে যাদের অবস্থান, তারা নিজেদের বিশ্ব নাগরিক হিসেবেই ভাবতে ভালবাসেন। বিশ্ব নাগরিকত্বের পথে নিজেকে একধাপ এগিয়ে রেখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য এখন বিলেতের রাজনীতিতেও রীতিমতো প্রভাব বিস্তার করেছেন, এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, ভাবতেও ভাল লাগে।

তাকে নিয়ে গর্ব করতেই পারে বাঙালী। বিলেতে নতুন প্রজন্মের বাঙালী জনপ্রতিনিধি তিনি। জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনীতি যার রক্তের উপাদান উত্তরাধিকার সূত্রে, তিনি বিদেশেও সক্রিয় হবেন, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মায়ের একনিষ্ঠ যত্ন ও পারিবারিক ঐতিহ্য- এই দুইয়ের মিশেলে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। তার পরিচয় এখন কারও কাছে অজানা নয়। বাঙালী মেয়ের লন্ডন জয় বাঙালীকে নতুন গৌরবে অভিষিক্ত করেছে। এই বাঙালী মেয়ে টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক। যিনি উচ্চারণ করতে পারেন, ‘গ্রান্ড ফাদারের আদর্শই আমার চরিত্র গঠন করেছে। পারিবারিক ঐতিহ্যই আমাকে একজন স্ট্রং সোশ্যালিস্টে পরিণত করেছে।’ এই গ্রান্ড ফাদার আর কেউ নন, বাঙালীর হাজার বছরের অবিসংবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই বাঙালী কন্যাকে নিয়েই সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর প্রশংসিত উচ্চারণ, ‘সন্দেহ নেই, বঙ্গবন্ধুও চাইতেন, বাঙালী তার জাতীয় স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা নিয়ে জেগে উঠুক এবং বিশ্ব জাতীয়তার মোহনায় আপন বৈশিষ্ট্য নিয়ে মিলিত হোক। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার ছেলেমেয়েরা তার সেই সাধই পূর্ণ করেছে বলে মনে হয়। যদি তা না হতো তাহলে বিলাতে বাস করে, উচ্চশিক্ষা লাভ করে, চারদিকে এত অর্থবিত্তের পেশা থাকতে টিউলিপ রাজনীতিকে তার পেশা হিসেবে গ্রহণ করতেন না।’

বাঙালী মেয়ে টিউলিপ নিজের চেষ্টাতেই আজকের এই অবস্থানে উঠে এসেছেন। হ্যাম্পস্টেড ও কিলবার্ন আসন থেকে ২০১০ সালে টিউলিপ প্রথম কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। লেবার পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে ২০১৫, ২০১৭ সালের পর ২০১৯ সালে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে নতুন এক ইতিহাস রচনা করেছেন তিনি। টিউলিপ সিদ্দিক শ্যাডো আর্লি ইয়ারস মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ব্রিটেনের ছায়া শিশুবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। বাঙালী ও বাংলাদেশের জন্য এ এক অনন্য অর্জন। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, আজকের ক্যারিয়ার পলিটিশিয়ান টিউলিপ সিদ্দিক মাত্র ১৬ বছর বয়সে লেবার পার্টির সদস্য হয়ে যুক্ত হন ব্রিটিশ রাজনীতিতে।

ব্রিটিশ রাজনীতিতে বাঙালীর উপস্থিতি এবং প্রভাব বাড়ছে যাদের কারণে, তিনি তাদের একজন। রাজনীতি ও সমাজকর্মে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন নানামুখী কাজের ভেতর দিয়ে। এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ফিলিপ গ্লউড এ্যাসোশিয়েটস, সেভ দ্য চিলড্রেন, বেথনাল গ্রিন এ্যান্ড বো আসনের সাবেক লেবার এমপি ওনা কিং, টুটিং এলাকার লেবার এমপি ও সাবেক মন্ত্রী সাদেক খান, লেইটন ওয়ানস্টেড এলাকার সাবেক লেবার এমপি হ্যারি কোহেনের সঙ্গে কাজ করেছেন। ক্যামডেন ও ইজলিংটন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের গবর্নর, কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এ্যাসোসিয়েশন ইউকে-এর সদস্য ও এমপি টিসা জোয়েলের পলিসি এ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। লেবার পার্টির ইয়ং লেবার অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন টিউলিপ সিদ্দিক। লেবার নেতা এড মিলিব্যান্ড-এর লিডারশিপ ক্যাম্পেনের ফিল্ড ডেপুটি ডিরেক্টর ছাড়াও লন্ডন লেবার পার্টির প্রেস অফিসার, গ্রেটার লন্ডন অথরিটির রিসার্চার হিসেবে কাজ করার ব্যাপক অভিজ্ঞতায় নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। ব্রিটিশ রাজনীতির উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছেন। প্রবাসে থেকেও যে জনকল্যাণে কাজ করা যায়, যুক্ত হওয়া যায় রাজনীতিতে তা প্রমাণ করেছেন তিনি। বলেছেন, মানুষের সেবা করা যায় যে কোন স্থানে থেকেই।

১৬ সেপ্টেম্বর টিউলিপ সিদ্দিকের জন্মদিন। বিলেতে বাঙালীর প্রতিনিধি হিসেবে সংগ্রামী বাঙালী জাতির মুখ আরও উজ্জ্বল করেছেন তিনি। বিশ্বের দরবারে বাঙালীকে পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বনাগরিকের সম্মানজনক অবস্থানে।

লেখক : সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

[email protected]

সূত্র : জনকণ্ঠ

সর্বশেষ