প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভিকটর কে. রোজারিও : বিধবা ভাতার কার্ড ফিরিয়ে দিয়ে দেশপ্রেমের অনন্য নজির সৃষ্টি করলেন আদমদীঘির লাজিনা বেওয়া

ভিকটর কে. রোজারিও : অনলাইন, দৈনিক পত্রিকা অথবা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ মেললেই যখন মন বিষিয়ে উঠছে করোনা, ডেঙ্গুতে মৃত্যু আর নানা রকম লুটপাটের খবরে, তখন বগুড়ার এক বিধবা মা আমাদের মনে জাগাচ্ছেন আশার আলো।

গত মঙ্গলবার (৭ সেপ্টেম্বর) আদমদীঘি উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে এক বিধবা মহিলাকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। যাকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে তার নাম লাজিনা বেওয়া। বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার এক নিভৃত গ্রামের নির্লোভ বিধবা পেয়েছেন এ সম্মাননা।
লাজিনা বেওয়ার এমন যুগান্তকারী দৃষ্টান্তকে স্বাগত জানিয়ে তাঁর হাতে সম্মাননা স্মারক ও ফুলেল শুভেচ্ছা দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্রাবণী রায়।

কী করেছেন লাজিনা বেওয়া? দুইকেজি চাল আর এককেজি লবণ প্যাকেট করে কারো হাতে দিয়ে সেলফি তোলেননি তিনি। কিম্বা রাস্তার পাশে তালগাছ লাগাবেন বলে ব্যানার সাটিয়ে সাংবাদিকদের ডেকে চা-সিঙ্গাড়াও খাওয়াননি। তবে তিনি করেছেনটা কী? করেছেন একটি সাধারণ কাজ। করেছেন চুপচাপ, প্রায় নিভৃতেই।

কিন্তু আদমদীঘি উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্রাবণী রায় বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ ও মহৎ কাজ মনে করেছেন। তাই তিনি লাজিনা বেওয়াকে তাঁর কার্যালয়ে ডেকে এনে সম্মানিত করেছেন। এ মহৎ উদ্যোগের জন্য ইউএনও শ্রাবণী রায় নিজেও জাতির শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন, ধন্যবাদ প্রাপ্য হয়েছেন।

যদিও তিনি এসবের জন্য তা করেননি। কিন্তু তিনি যা করেছেন তা তাঁর রুটিন কাজ নয়, এ কাজটি না করলে সরকারী নথিতে তাঁর নামে কোন ‘নোট’ যোগ হতো না। তবুও তিনি করেছেন যেন লাজিনা বেওয়াকে দেখে দেশের অন্য মানুষ উৎসাহী হয়, ভালো কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয়।

যখন দেশের নানা প্রান্ত থেকে বিভিন্ন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নানা দাপট দেখানোর খবর পড়ি, তখন ইউএনও শ্রাবণী রায় আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছেন এক মহৎ বিধবা নারীর অনন্য দেশপ্রেম ও ভালো কাজের দৃষ্টান্ত।

সম্প্রতি নিজের বিধবা ভাতার কার্ড ফেরত দিতে সমাজ সেবা অধিদপ্তরে আবেদন করেন লাজিনা বেওয়া। গ্রামের সাধারণ একজন নারী, স্বামী মারা গেছেন অনেকদিন আগে, যুবতি বয়সে। এরপর তাঁর জীবনে বয়ে গেছে কত কত ঝড়। সেসব ঝড়-বন্যায় নিজের ও সন্তানদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন তিনি। নিজেকে আজ প্রতিষ্ঠিত করেছেন সমগ্র জাতির সামনে।

দেশের বিধবা নারীদের কষ্ট লাঘবে সরকার সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ভাতা প্রদান করে। বৃদ্ধদের কষ্ট লাঘবে বয়স্ক ভাতার পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রতিবন্ধীভাতা প্রদান করে।

ভুক্তভোগী এবং তাদের স্বজনরা জানেন, এ দেশে এটি সরকারী ভাতাকার্ড করতে কত ভোগান্তি আর হেনস্থার শিকার হতে হয়। কত কাঠখড় পোড়াতে হয়, কত ঘুষ লেন-দেন করতে হয়। তা হোক প্রতিবন্ধী, বিধবা বা বয়স্ক ভাতার কার্ড। খুব সহজে স্থানীয় ইউ.পি. সদস্যরা কোন কার্ডই ছাড়েন না। নিরপেক্ষভাবে খোঁজ নিলে এ বিষয়ে কত হাজার বা লক্ষ অভিযোগ যে জোগার করা যাবে, তার ইয়ত্তা নেই।

সেই সোনার হরিণ বিধবাভাতার সনদ, প্রতি মাসে ঘরে বসে নিশ্চিত সরকারী সহায়তা বা আর্থিক সুবিধার কার্ডটি কোন শর্ত ছাড়াই সরকারকে ফেরৎ দিলেন লাজিনা বেওয়া। না আলোচিত হওয়া বা ভিন্ন কোন লোভের বশবর্তী হয়ে তিনি তা করেননি। করেছেন দেশপ্রেম থেকে। করেছেন নিজের দায়িত্ববোধ থেকে। করেছেন নিজের সংকল্প রক্ষায়।

প্রশ্ন আসছে কী এমন সংকল্প! জানা গেছে, আদমদীঘি উপজেলার ছাতিয়ানগ্রাম ইউনিয়নের ধুলাতর নামক নিভৃত পল্লীতে বসবাস লাজিনা বেওয়ার। ওই গ্রামের হাদিস আলীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ১৯৮২ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন। স্বামীর রেখে যাওয়া ১০ শতক সম্পত্তি আর তিন সন্তানকে নিয়ে জীবনযুদ্ধে নামেন লাজিনা।

দুই মেয়ে আর ছয় মাসের এক ছেলেকে নিয়ে চার সদস্যের সংসার চালাতে বিপাকে পরতে হয় তাঁকে। এর ছয় বছর পর ১৯৯৮ সালে অভাব-অনটনের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে বিধবা ভাতার তালিকাভুক্ত হন। তবে, সে সময় তিনি স্থির করেন, কখনোও সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরলে তিনি এ কার্ড ফেরত দেবেন।

দুই মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর একমাত্র ছেলে মামুনুর রশীদকে মাস্টার্স (এম.এ) পাশ করিয়েছেন। ২০১৬ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি পান মামুন। এরপর সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরলে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি (লাজিনা) বিধবা ভাতার কার্ড ফেরত দিতে সমাজ সেবা অধিদপ্তরে আবেদন করেন।

এ ব্যাপারে ছেলে মামুন জানান, আমাদের তিন ভাই-বোনকে সুখী দেখতে আমার মা অনেক কষ্ট করেছেন। আমি এখন সরকারী চাকরি করছি। এখন আর আমাদের সংসারে অভাব নেই। তাই আমার মা কার্ডটি ফেরত দিয়েছেন। যেন সেই কার্ডটি অন্য পরিবারের কাজে লাগে।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শরিফ উদ্দিন জানান, লাজিনা বেওয়া শুধু আদমদীঘির নয়; বরং সারাদেশে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এজন্য আমরা তাকে সংবর্ধনা দিয়ে সম্মানিত করার চেষ্টা করেছি মাত্র। লাজিনার মতো কার্ড ফেরত দেওয়ার ঘটনা দেশের কোথাও আছে কি-না, তা আমার জানা নেই। তাঁর এমন সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই। প্রকৃতপক্ষে, লাজিনার কাছ থেকে আমাদের এ সমাজের অনেক কিছু শেখার আছে। সম্পাদনা: রাশিদ

 

সর্বাধিক পঠিত