প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নানা পরিকল্পনায় বিএনপি: আন্দোলন, ঐক্য, নির্বাচনকালীন নেতৃত্ব

নিউজ ডেস্ক: আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘ছক’ কষছে বিএনপি। আন্দোলন, ঐক্য, নির্বাচনকালীন নেতৃত্ব, ভোটে যাওয়া-না যাওয়া নিয়ে হাইকমান্ডের নানা পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের বিরুদ্ধে থাকা সব বিরোধী দলকে এবার পাশে চান তারা। ‘সর্বদলীয় বিরোধী জোট’ নামে একটি প্ল্যাটফরম গড়তে ইতোমধ্যে বাম-ডানসহ বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগ শুরু হয়েছে। ‘ঐক্যবদ্ধভাবে’ কিংবা ‘যুগপৎ’ যেকোনো প্রক্রিয়ার আন্দোলন গড়ে তুলতে চায় দলটি। যুগান্তর

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা জানান, বিএনপির সংগ্রাম বড় এবং কঠিন। বাংলাদেশের স্বার্থ ও বিএনপির স্বার্থ পরিপূরক। ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপিতে দুর্বলতা ছিল এবং সে কারণেই যে ওয়ান-ইলেভেনের সৃষ্টি- তা অস্বীকার করা যাবে না। তবে টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতার বাইরে থাকলেও দল ভেঙে যায়নি, নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ আছেন- এটাও বাস্তবতা। গত নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে ড. কামাল হোসেনকে সামনে রেখে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি।

তবে ‘কৌশল’ যে ঠিক ছিল না তা নির্বাচনে ভরাডুবির মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। এরপর বিএনপি নেতাকর্মীদের ভেতরে ড. কামাল হোসেন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এবারও নির্বাচনে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সামনে আনা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ দণ্ডপ্রাপ্ত ও অসুস্থতার কারণে তাকে কোনো সভা-সমাবেশে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে নির্বাচনকালীন নেতা কে হবেন তা পরিস্থিতিই বলে দেবে। এমন যদি হয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান হবেন-এতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

দলটির নীতিনির্ধারকরা আরও জানান, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিএনপির হিসাব-নিকাশ বলছে, সামনে নানা কারণে রাজনীতির প্রেক্ষাপট পাল্টাবে। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো দেশ হস্তক্ষেপ করুক তা বিএনপি চায় না। তবে দল এটাও বিশ্বাস করে, জনগণের কাছে এখন কোন দল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় তা বহির্বিশ্বের শক্তিগুলো নিশ্চয়ই জানে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বৃহত্তর ঐক্য গঠনে কাজ চলছে। দেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ছাড়া এখন প্রায় সব দলই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে বিএনপি। এই সংগ্রামে জয় হবেই। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল হিসাবে বিএনপির দায়িত্ব, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বৃহত্তর ঐক্য এবং আগামীর রাজনৈতিক কৌশল প্রণয়নে আমরা কাজ করছি। এ ধরনের স্বৈরাচারকে হটাতে হলে জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। সেটা কী ফরমেটে হবে তা সময়ের ব্যাপার। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, নিরপেক্ষ নির্বাচন ইত্যাদি বলতে গেলে একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত। আমরা চার্টার তৈরি করব, সেখানে ন্যূনতম কিছু দফা একসঙ্গে থাকবে। এর আগে ২০ দল, ঐক্যফ্রন্ট, বাম দলসহ অন্য ছোট-বড় যেসব দল আছে তাদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করব। একই ফর্মুলায় যারাই আসবে সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করা হবে। এ ব্যাপারে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা আছে। একই প্ল্যাটফরমে এসেও আন্দোলন করা হয়, আবার যুগপৎ ও করা যায়।

জানা যায়, জোট গঠন নিয়ে বিএনপির নেতাদের দুই ধরনের মত রয়েছে। কেউ ২০ দল ও ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে দিয়ে সব দলকে নিয়ে বৃহত্তর জোট গঠনের কথা বলছেন। এ ছাড়া দুই জোটে থাকা ছোট ছোট কয়েকটি দল বাদ দেওয়ারও পক্ষে তারা। আবার অনেকে ২০ দল স্বতন্ত্র রেখে বাম দলগুলো নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের পরিধি বাড়ানোর পক্ষে। তবে এখনো এ বিষয়টি আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে, কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট-এই দুই জোটের বাইরের বেশ কয়েকটি বাম দলের সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করেছেন বিএনপি নেতারা। তারা জামায়াতে ইসলামীকে ছাড়ার শর্তে বৃহত্তর জোটে যেতে রাজি বলে বিএনপিকে জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই সব পরিকল্পনা বিএনপির। এর আগে সব রাজনৈতিক দলের মতামত নিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন চায় দলটি। এ ছাড়া দলের স্থায়ী কমিটির দু’জন নেতার সঙ্গে সিনিয়র এক নেতার দূরত্ব সৃষ্টি হলে তা সম্প্রতি সমাধান করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানান, স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই। সবাই ঐক্যবদ্ধভাবেই কাজ করছেন। জাতীয় ঐক্যের রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। সিনিয়র নেতাদের আসন বাদে অন্যান্য আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে রয়েছে। এবারের নির্বাচন বিষয়ে বহির্বিশ্বের শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজেই যোগাযোগ রাখছেন। এজন্য একটি উইংও রয়েছে তার। কোনো বার্তা থাকলে সেখান থেকেই তা দেশের সিনিয়র নেতাদের জানানো হয়। সে অনুযায়ী নেতারা কাজ করছেন।

ওই নেতা আরও জানান, ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। বিএনপি চেয়ারপারসনকে সে সময় দলের কয়েকজন নেতাসহ ২০ দলীয় জোটের একটি শরিক দল বিভ্রান্ত করেছিল। পরে ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে যা হয়েছে তা বিএনপির পক্ষে গেছে। কারণ নির্বাচনের আগের রাতে ভোট করে জনগণের কাছে বর্তমান ক্ষতাসীন দল আরও জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। এই নির্বাচনের পর সবাই ভেবেছিল বিএনপি শেষ।

কিন্তু এখন পর্যন্ত সামান্যও ঐক্যের ফাটল ধরাতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ এজেন্ডাভিত্তিক স্থায়ী কমিটির সভা। ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে সভার আগে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের কাছে মুখ বন্ধ হলুদ খামে ইস্যুভিত্তিক এজেন্ডা দেওয়া শুরু করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এতে করে অনেক বিষয় সামনে আসছে, সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধান করা যাচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে স্থায়ী কমিটির এই বৈঠক হচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আমার শক্তি আমার বল দিয়েই গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনব। সমস্যাটা দেশের, তাই সমাধানও আমাদের করতে হবে। কতটা পারব তা ভবিষ্যৎ বলে দেবে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানে নেতৃত্বে আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি।

তার নেতৃত্বেই এ দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে ন্যূনতম একটা জায়গায় তো সফল হয়েই আছে। তা হলো একটি সর্বজনীন প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের ভিত্তিতে মাঠ পর্যায় থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত নির্বাচন। সম্প্রতি রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু-তারাও একই কথা বলছেন। পাশাপাশি গুম-খুন, অগণতান্ত্রিক আচরণ, আমলাতান্ত্রিক খবরদারিত্ব-এ বিষয়গুলো আলোচনার মধ্যে চলে আসবে। মাহমুদুর রহমান মান্না, জোনায়েদ সাকির নেতৃত্বাধীন দল দুটি ছাড়া অন্য বাম দলগুলোও বলছে, বিএনপি রাস্তায় নামুক, তাদের সঙ্গে থাকব। সুতরাং প্রেক্ষিত কিন্তু তৈরি।

এখন দরকার আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে নিয়ে আসা। তিনি আরও বলেন, আমরা মনে করি দেশের ভেতরে অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক শক্তি কোনটা শক্তিশালী তাদের সঙ্গেই আধুনিক বিশ্বের দেশগুলো কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখতে চায়। সে ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিকভাবে বিএনপি কতটা সফল হয়েছে, ভোটের রেকর্ড-তা তাদের কাছে অবশ্যই আছে। তবে বিএনপির শক্তি দেশের ভেতরে। বাইরের দেশ কি বলল-না বলল তাতে আমরা বিভ্রান্ত না হলে দেশের মানুষও হবে না।

সর্বাধিক পঠিত