প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শাহনেওয়াজ কাকলী: দশ বছর আগে কাবুলের মেয়েটি কেঁদেছিল

শাহনেওয়াজ কাকলী: দশ বছর আগে পাঁচ তারকা হোটেলে কাবুলের মেয়েটি কেঁদেছিল। আমি ও রামিজা আক্তার তাকে জড়িয়ে শান্তনা দিয়েছিলাম। অসম্ভব মিস্টি চেহারায় পদ্মভাসা দুটো চোখে জলের ধারা যেন আঁকা ছবির মাদকতা।
ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের শেষ রাত। পরের দিন সকালে সবাই ফিরে যাবো যে যাঁর দেশে। তাই স্পেশাল লেডিস পার্টি ডাকলেন ফেস্টিভাল ডিরেক্টর তাঁর রুমে আড্ডা হলো তিনজনের মাত্র। আর আগেই আমরা ডিনারপার্টি সেরে এসেছি গোয়া বিচের পাশেই মনোরম পরিবেশের এক রেস্টুরেন্টে।
তিনজনের একজন আমি বাংলাদেশী, আরেকজন ইন্ডিয়ান আর অন্যজন আফগানিস্তান।
আমরা আমাদের চলচ্চিত্র বানানোর অভিজ্ঞতাসহ নানান গল্প করছিলাম।
আসলে রামিজা আক্তার জানতে চেয়েছিলেন আমরা নারীরা কিভাবে আমাদের দেশে চলচ্চিত্র বানাতে পাচ্ছি,ভাবছি? পুরুষতন্ত্রী মনোভাবের ভেতর দিয়ে মেয়েদের কাজের পরিবেশ,মর্যাদা, সম্মান এগুলো কিভাবে নির্ধারণ হয়?
সেদিন আমি গর্ব করে আমাদের কাজের পরিবেশ, সহযোগীতা, শিল্পভাবনা যোদ্ধাদের গল্প করতে পেরেছিলাম। রামিজা আক্তার বললেন,উত্তরের সুরের প্রথম দৃশ্যের লম্বা শট দেখেই আমি তোমার ছবি সিলেক্ট করে ফেলেছি। রংপুরের ভাষা,গ্রাম মানুষ দেখে নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। যা গল্প দিয়েছো,কান্নায় চোখ ভিজে গেছেরে!
মিস রামিজা আমাকে অকস্মাৎ অবাক করে দিয়ে বললেন,তিনি রংপুরের মেয়ে ছিলেন। কিছুই মিলছেনা,কোথায় গোয়া আর কোথায় রংপুর? বাংলাদেশ-ভারত যোগসূত্র একমাত্র গল্প ৪৭ থেকে ৭১’র যুদ্ধ। আমার মুণ্ডুতে তখন কলকাতা পর্যন্তই জানা।
আসার পর ওনি যখন আমাদের রিসিভ করলেন দু একটা শব্দ ইংলিশে বলার পর পরই বাংলা শুরু করলে আমার চোখ কপালে,জানতে পারলাম ওনি বাংগালী।
আমাকে আমার ফেস্টিভ্যাল কো-অডিনেটর কিছুই জানাননি। প্রথম ছবি,প্রথম ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অন্ধের মত শুধু উড়েই যাচ্ছি।
অবাক আর অবাক এক এক করে বিস্ময়ের বাক্স খুলে যাচ্ছে।
তিনি নাকি আমার সালেমা স্কুলের ছাত্রীও ছিলেন।
ক্লাশ সেভেনে থাকতে চলে এলেন ইন্ডিয়াতে তারপর লিখাপড়া,ক্যারিয়ার, কালচার নিয়ে পুরা ইন্ডিয়া। থাকেন দিল্লীতে, মননে একজন ক্লাসিক্যাল শিল্পী। অসাধারণ কন্ঠে গায়েকী।
আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম নারীসৌন্দর্য,গুণ,মর্যাদাশীলার মহিমার দ্যুতি।
দেশ মানুষকে তাড়িয়ে দেয়। হিংসা আর যুদ্ধ করে আসছে মানুষ সৃষ্টির আদিকাল থেকেই, যা এখনও চলমান। চলবেই অদৃশ্যমান প্রত্যাশার বিপ্লব।
যুদ্ধ-লোভ-রাজনীতি-ধর্ম-ক্ষমতাবলের শীর্ষ গল্পে আফগানিস্তান একটি দেশ।
ফিল্মমেকার অলকা গল্প করতে করতে তাঁর দেশ নিয়ে কেঁদে দিলো। আমরা সবাই জানি পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা শিল্পসংস্কৃত,সম্পদ,সৌন্দর্যময় দেশের মধ্যে আফগানিস্তান একটি ছিল। যা ধ্বংসিকা বিশেষ। নারীদের অনেক বাধা,সেগুলোকে উত্তরণ করে চলচ্চিত্র বানানোর সুবিধা অসুবিধা গল্প উঠে আসার একটু পর সে কান্না করছে তাঁর বান্ধুবীর কথা বলে।
বান্ধুবী মেয়েটির একজন প্রেমিক বন্ধু ছিল। দীর্ঘসময় সম্পর্ক ছিল এখন ছেলেটি অন্য একজনের সাথে সম্পর্ক বা বিয়ে করতে চায় এমন কিছু। কিন্তু মেয়েটি যখন প্রেমের দাবী নিয়ে তাঁর কাছে যায় সে বারবার তাকে ভয় দেখায়। কারণ সে তার একটি নগ্ন ভিডিও করেছিল। মেয়েটি আত্মহত্যা পথ বেচে নিতে চায়।
যদিও এটা আমাদের নিকট খুব সাধারণ গল্প। কিন্তু এমন গল্পগুলো তখন আমাদের দেশে শুরু হয়নি। ২০১১-১২ সালে গন মানুষের হাতে স্মার্ট ফোন পৌঁছাইনি।
তখনও আমাদের দেশের মানুষের সারল্য নিয়ে গর্ব করা যেতো। মাত্র একযুগের মধ্যে দেশে অনৈতিকতার বিভীষিকা গ্রাস করেছে। রোজ অনবরত উলঙ্গ সমাজ নৃত্যরত। আর আমরা তালিরত!
তালেবান! তালেবান!তালেবান শব্দের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর আরো বেশি পরিচয় ঘটলো। আগে স্কুলে বা রেডক্রিসেন্ট করতে বন্ধুরা দুষ্টুমি করে একে অপরকে বলতো। একটি নেগেটিভ শব্দ,অপশক্তি দল এইটুকুই বুঝতাম আটটার বিটিভি সংবাদ বদৌলতে।
রাজনীতি নিয়ে আমার কোনকালেই আগ্রহ ছিলনা। কিন্তু দলীয় সংগঠন শক্তি ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করবেন কেমনে? আমি এমন একটি শক্তিতে হলে থাকার সিট পেলাম। তার বিনিময়ে মাঝেমাঝে মধুর ক্যান্টিন,ক্যাম্পাস চত্বর,টি এস সি তে বসতে হতো।
মধুর ক্যান্টিন টেবিলে ছাত্র ইউনিয়নের বড়ভাইদের দীর্ঘ রাজনৈতিক আলোচনা আমার মাথার উপর দিয়ে যেতো। একদিন শরীফ ভাইকে বলেই ফেললাম,বিএনপি, আওয়ামীলীগ ছাড়া বামফ্রন্ট কি কোনদিন ক্ষমতায় আসবে? শুধু শুধু বৃথা অধিকার আদায়ের কথা! ভাগ্যিস পাগল ভাবতো বলে বকা না খেয়ে মাথায় গাট্টা খেয়েছিলাম।
ভাইরা বলেছিল,সবই সম্ভব! আমাদের রক্তে নীতিগত জাগরণ মন্ত্রের বীজ বুনে দিলো। তারপর থেকেই গরীব ছাত্রী-ছাত্রের লেখাপড়া,অসুখবিসুখ সুবিধা অসুবিধার পাশে ইউনিয়ন, বেতন,সিট,খাতা কলমের মুল্য বৃদ্ধিতে আগেই আওয়াজে ছাত্রইউনিয়ন। মৃত্যু,খুনখারাপি,রাহাজানি সকল প্রশাসনিক জবাবদিহিতা আওয়াজে বামফ্রন্ট। তালেবান অপশক্তির বিরুদ্ধে মিছিলকারী ইউনিয়ন।
আরে,আমার মাথা আসেনা আরেক দেশের দল তালেবান নিয়ে আমরা রাস্তায় রোদে পড়ি,তৃষ্ণার্ত হয়ে যাই কেরে? ওরা কি জানলো আমরা মিছিল করলাম। কি যে রাগ হতো তখন? কারণ ছদ্মবেশী তালেবান অনেক আগেই আমাদের চিপায় চিপায় মসজিদে ঘাটি গেড়েছে।
একটা তালিবানি শক্তি এদেশেও ঘুরপাক খায়। যদিও ছাত্র কন্ঠে এই হুশিয়ারি কর্ণপাত হয়না ক্ষমতাবানদের কখনই।
আমার দেখা,মাত্র পঁচিশ বছরেই তালেবানের ক্ষমতা দখল হলো আফগানিস্তানে আজ। পঁচিশ বছরে বদলেছে আবহমানকাল সোনার বাংলার পটভূমি। সবই ভয়ংকর হুশিয়ারি!
আমাদের মাথা নীচু হয়ে গেছে সেলফোনের ছবিতে। আমাদের চারিদকে কি হচ্ছে? আমরা জানিনা। কানে কাকের ডাকও আজকাল পৌঁছায় না। বন্ধঘরে দরজা জানলা এঁটে,এসি ছেড়ে আমরা ভিপিএন প্রক্সিতে ঘুরে বেড়াই। সিরিয়া শহরের মত একদিন মাথায় বোমা পড়লেও আমরা পরীমনির সংবাদ পড়তেই থাকবো।
মাত্র দশ বছর আগে আমার ফিল্মমেকার বান্ধুবী কেঁদে বলেছিল আফগানিস্তানের ব্যথা। কাল নিউজ দেখতে দেখতে মেয়েটার জন্য বুকের ভেতর মোচড়াতেই ওর আইডি খুলে দেখতেই দেখি বন্ধ।
আরো চিন্তা বেড়ে গেলো ওকি সবার মত পালাচ্ছে? বিচ্ছিন্ন জীবনে বিচ্ছুরিত হয়ে কোলে ছোট শিশুটি নিয়ে ছুটছে।
সে নিজেরই সিনেমা,ডকুমেন্টারির গল্প হয়ে গেছে।
জীবনে মানুষের সাথে খুব বেশী দেখা হয়না, তবুও বুকের ভেতরে স্মৃতিতে থেকে যায়।
ভাবছি,দশবছর পর আমি কোথায়?

শাহনেওয়াজ কাকলী: চলচ্চিত্র নির্মাতা

সর্বাধিক পঠিত