প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শরিফুল হাসান: এশিয়ার নোবেল হিসেবে খ্যাত ম্যাগসেসে পুরস্কার জয়ী ফেরদৌসী কাদরী : আপনাকে দেখে এগিয়ে যাক এ দেশের মেয়েরা

শরিফুল হাসান: মানুষের জীবনটা আসলেই অদ্ভুত, আসলেই দোটানার! এখানে সুখ আর দুঃখ সমান্তরালে হাঁটে। প্রাপ্তি আর হারানোও। এই যে দেখেন, বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরী এশিয়ার নোবেল হিসেবে খ্যাত ম্যাগসেসে পুরস্কার পেয়েছেন। কী ভীষণ আনন্দের খবর। অথচ পুরস্কার লাভের সেই একই দিনে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্বামীকে হারিয়েছেন আইসিডিডিআরবির জেষ্ঠ্য বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসী কাদরী। খুশির দিনে শোকের এমন খবর! ফেরদৌসী কাদরীর স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রির শিক্ষক অধ্যাপক ড. সালেহীন কাদরী বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। পুরুস্কার ঘোষণার দিনেই মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ফেরদৌসী কাদরী বায়োকেমিস্ট্রিতে স্নাতকোত্তর করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনিও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। পরে যুক্তরাজ্যের লিভারপুল ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট করে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৮৮ সালে তিনি আইসিডিডিআরবিতে যোগ দেন।

এখানে সংক্রামক রোগ, রোগতত্ত্ব, টিকা এবং এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল নিয়ে কাজ করেন। কলেরার টিকা নিয়ে গবেষণা ও সাশ্রয়ী দামে টিকা সহজলভ্য করে লাখো প্রাণ রক্ষায় কাজ করেছেন তিনি। ফেরদৌসী কাদরী মুখে খাওয়ার টিকার (ওসিভি) উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখেন। পাশাপাশি নবজাতক, শিশু ও বয়স্কদের টাইফয়েডের টিকার উন্নয়নে তাঁর অবদান ছিলো। ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের লাখ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিকের ওসিভি টিকাদানে বিশেষজ্ঞদের একটি দলকে নেতৃত্ব দেন। এই কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আশ্রয়শিবিরকে কলেরার প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়। করোনা মহামারির এ সময়ে ড. কাদরী টিকাসংক্রান্ত গবেষণা ও পরীক্ষার কাজে যুক্ত আছেন। অনেকেই জানেন, করোনার মতোই একসময়ে সারা পৃথিবীতে মহামারি ছিলো কলেরা। এর বিস্তৃতি দক্ষিণ এশিয়া থেকে আফ্রিকা ও আমেরিকা পর্যন্ত। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে কলেরা মহামারিতে ৪০ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয় এবং ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। এই মৃত্যু ঠেকাতে মুখে খাওয়ার টিকাটি সাশ্রয়ী, কার্যকর ও নিরাপদ। আর যুগান্তকারী এই কাজটি জীবনভর করেছেন ফেরদৌসী কাদরী। ২৫ বছর ধরে কলেরা মহামারি থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের টিকা নিয়ে কাজ করেছেন এমন কয়েকজন মানুষের মধ্যে একজন তিনি।

ফেরদৌসী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টিকাবিষয়ক বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। ম্যাগসেসে পুরস্কার ঘোষণার সময় কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘লাখো মানুষের উপকারে টিকার উন্নয়নে তাঁর নিবেদিত ভূমিকার জন্য’এই পুরস্কার দেওয়া হলো। পাশাপাশি বিজ্ঞান পেশায় তাঁর জীবনভর আত্মনিয়োগ ও আন্তরিক আগ্রহকে সম্মান দেওয়া হয়। এই যে বিজ্ঞান পেশার প্রতি আগ্রহ সেটি কিন্তু হঠাৎ করে নয়। সেই ছোটবেলা থেকেই একটু অন্য রকম কিছু করার ঝোঁক তাঁর। এরই ধারাবাহিকতায় গবেষক হওয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগ থেকে সম্মান, স্নাতক দুটোতেই প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছিলেন। তখন থেকেই গবেষণা করার বিষয়টি টানতো তাঁকে। পরে যুক্তরাজ্যের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করেছেন পিএইচডি। দেশে ফিরে নিবিড়ভাবে গবেষণায় মন দিতেই চলে আসেন আইসিডিডিআরবিতে। তবে এর ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেননি মোটেও। বরং নিয়মিতই এমফিল, পিএইচডির ছাত্ররা তাঁর অধীনে কাজ করছেন। মাঝেমধ্যে ক্লাসও নিয়েছেন। বাংলাদেশের মতো একটা দেশে নারীর এগিয়ে যাওয়া তো খুব সহজ নয়। ফেরদৌসী কাদরীর কথায়, ‘প্রতিষ্ঠিত হতে হলে সবাইকেই কষ্ট করতে হয়।

গবেষণার মতো বিষয় হলে তো কথাই নেই। প্রতিনিয়তই নতুন করে আবিষ্কার করতে হয়। এ রকম পরিস্থিতিতে ব্যক্তিটি যদি মেয়ে হয়, তবে তার দায়িত্ব দ্বিগুণ হয়ে যায় স্বভাবতই। একদিকে সংসার, অন্যদিকে অফিসের কাজ। কিন্তু আমি যখন কাজ করি তখন আমার মাথাকে কয়েক ভাগে ভাগ করে নিই। যখন অফিসে আসি তখন বাসার সব চিন্তা বাদ দিয়ে দিই। আবার যখন বাসায় যাই তখন সেখানেই সব মনোযোগ।’ বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরী ম্যাগসেসে কমিটির কাছে একটি ভিডিও বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি বলেন, ‘এই পুরস্কার আমি বাংলাদেশ, আমার জন্মভূমির প্রতি উৎসর্গ করলাম। সেই সঙ্গে আমার প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবিকে উৎসর্গ করছি। এই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে আমার কাজ এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করেছে। আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ বাংলাদেশ এবং পুরো বিশ্বের কাছে। আমি ঋণী আমার পরিবারের কাছে। আমার স্বামী ও তিন সন্তানের কাছে। তাঁরা আমাকে সহযোগিতা করেছেন বিগত দিনগুলোতে।’ ফেরদৌসী কাদরী তাঁর বার্তায় বাকি জীবন জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে উৎসর্গ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য, উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্বের মানুষের মঙ্গলে আমি আমার বাকি জীবন উৎসর্গ করবো।’ নিশ্চয়ই আপনি তাই করবেন। আপনাকে দেখে এগিয়ে যাক এই দেশের মেয়েরা। এই দেশের মানুষ। আপনার জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা প্রিয় বিজ্ঞানী। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত