প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কড়াকড়ির পরও ঢাকায় রমরমা মাদক

নিউজ ডেস্ক: মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান স্তিমিত হয়ে এলেও ঢাকায় এখনো ব্যাপক অভিযান হয়। কিন্তু কড়াকড়ির মধ্যে রাজধানী শহরে অভিনব কায়দায় অন্তত ৩৫ ধরনের মাদকদ্রব্য ঢুকছে। জরুরি পণ্যের ট্রাক, লাশবাহী গাড়ি, তেলের লরি, অ্যাম্বুল্যান্স, পিকআপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সেগুলো আসছে। কালের কণ্ঠ

চলতি বছরের গত আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে ১৩ হাজার ৪২৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে ৯ হাজার ৪৮৮টি মামলা দেওয়া হয়েছে। সে হিসাবে দেখা গেছে, এই সময়ের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে রাজধানীতে মাদকসংশ্লিষ্টতায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫৬ জনকে এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে ৪০টি। গত বছরের তুলনায় মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও মামলার সংখ্যা বেড়েছে।

গত বছর ১৮ হাজার ৫৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি। যার বিপরীতে মামলা দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার ৬১৯টি। সে হিসাবে ২০২০ সালে প্রতিদিন ডিএমপি গ্রেপ্তার করেছে ৫২ জনকে এবং মামলা হয়েছে ৩৫টি।

যেসব মাদকদ্রব্য রাজধানীতে ঢুকছে সেগুলোর মধ্যে আছে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল ও আইস বা ক্রিস্টাল মেথ। সাম্প্রতিক সময়ে লাইসার্জিক এসিড ডাইইথ্যালামাইড (এলএসডি) ও ডাইমিথাইলট্রিপ্টামাইনের (ডিএমটি) মতো নতুন মাদকদ্রব্যও উদ্ধার হয়েছে।

ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, গত বছর ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ৯ হাজার ১১৩টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের গত আট মাসে গড়ে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ১২ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। গাঁজাও আগের বছরের তুলনায় প্রতিদিন দ্বিগুণ হারে উদ্ধার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হেরোইনসহ অন্যান্য মাদকও বেশি পরিমাণে উদ্ধার করা হয়। তবে যে পরিমাণ মাদক উদ্ধার হয় তার অনেক গুণ বেশি বিক্রি হয় বা পাচার হয়ে যায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বিশেষ অভিযান শুরু হয় ২০১৮ সালের মে মাসে। গত বছর করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর এই অভিযান স্তিমিত হয়ে আসার আগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ৫ শতাধিক লোক নিহত হয়।

মাদক নির্মূলের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রেপ্তারের পর জামিনে এসেও অনেকে আবার মাদক কারবারে জড়াচ্ছে। তারা কোনোভাবে সহজে স্বাভাবিক জীবনে আসতে পারছে না। তাই তাদের দ্রুত জামিনের ব্যবস্থা বাতিল করতে হবে। জামিনে বেরিয়ে এলেও কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে। তাদের যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় তাদেরসহ অপরাধীদের প্রকাশ্যে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আবার এটাও খেয়াল রাখতে হবে, রক্ষক (আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা) যেন ভক্ষক না হন।

গত ২৭ আগস্ট চুয়াডাঙ্গার জীবননগর থানা পুলিশের অভিযানে ওই এলাকার আলোচিত মাদক কারবারি মর্জিনাকে মাদকসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এই নারী জীবনগর পৌর এলাকার পুরাতন লক্ষ্মীপুরের শুকুর ওরফে শুকুর খোঁড়ার স্ত্রী। এই দম্পতি এর আগেও বেশ কয়েকবার মাদকসহ গ্রেপ্তার হন। এর আগে গত ৮ জুলাই বগুড়ার ধুনট উপজেলার নিমগাছি ইউনিয়নের নিজ বাড়ি থেকে মাদক বিক্রির সময় লস্কর নামের একজনকে আটক করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদকসহ ২২টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও এই ব্যক্তি একই অপরাধ করে আসছেন বলে পুলিশ জানায়।

গ্রেপ্তারকৃতদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মাদক সেবন এবং কারবারে জড়িয়ে পড়া তরুণ-তরুণী ও বয়স্ক অনেক ব্যক্তি টাকার বিনিময়ে বাহক হিসেবে কক্সবাজার থেকে ঢাকায় মাদক এনে দেয়। তাদের কারো কারো বিরুদ্ধে ১০টিরও বেশি মামলা আছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট থানা। অর্থাৎ গ্রেপ্তার করা হলেও জামিনে বের হয়ে এসে আবার মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে এসব অপরাধী।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁরাও মাদক সেবন ও কারবার বন্ধে কঠোর তৎপর এবং নজরদারি করছেন। এতে করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাদক ধরা পড়ছে।

যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘মাদক নির্মূল করতে হলে প্রথমত সীমান্ত দিয়ে পাচার বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় যতই অভিযান হোক, কিছু না কিছু ঢুকে রাজধানীসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বেই।’

মাদক নির্মূল করতে আরো কঠিন অভিযানের বিকল্প নেই বলে মনে করছে সব মহল। মাদক কারবারি ও মাদকসেবীদের আটকের পর তালিকা করে সংশ্লিষ্ট থানায় ঝুলিয়ে রাখা উচিত বলে মনে করেন কেউ কেউ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমানে মনে হচ্ছে করোনার চেয়ে ভয়ংকর মাদক। মাদক নির্মূলে অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। সীমান্ত এলাকা থেকে মাদক আসা বন্ধ করতে হবে। এ ছাড়া মাদক কারবার ও মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়ার কারণ খুঁজে বের করে তাদের নিয়ে সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে কাজ করতে হবে।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (চিকিৎসা ও পুনর্বাসন) রাহুল সেন বলেন, ‘ইয়াবা সেবনে বেশি আসক্ত হচ্ছে তরুণসমাজ। ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক সেবন বন্ধ করতে পারলে জোগানটাও কমে আসবে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বিষয়গুলো মাথায় রেখে কাজ করছে। তবে সবাইকে কাজ করতে হবে। পরিবারের ভূমিকা থাকতে হবে সবচেয়ে বেশি।’

ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) ফারুক হোসেন বলেন, ‘মাদকের বিষয়ে সব সময় কঠোর অবস্থানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পাশাপাশি পরিবারকেও তার সন্তান কোথায় যাচ্ছে, বাসায় কারা আসছে, কার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে এবং কী করছে—এসব বিষয়ে নজর রাখতে হবে। মাদক নির্মূলে পুলিশকে সবার তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে হবে।’

ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘ইয়াবার পর এবার মিয়ানমার থেকে আইস (ক্রিস্টাল মেথ) বাংলাদেশে আসছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় এই মাদক সেবনের পরিমাণ বেশি। এই মাদকসহ সব মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।’

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত