প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শরিফুল হাসান: সতের কোটি মানুষের দেশে মাত্র ১৭০০ মানুষ সৎ হলে গোটা দেশ বদলে যাবে

শরিফুল হাসান: আসলে রাষ্ট্র না চাইলে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জড়িত না থাকলে বা তারা দায়িত্বে অবহেলা না করলে, এই দেশে কোনো দুর্নীতি হওয়া সম্ভব নয়। নথিপত্র ঘেঁটে এবং আমার নিজস্ব পর্যবেক্ষণে দেখেছি, সরকারি নানা প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি, চুক্তি, বিল থেকে শুরু করে সবজায়গায় যাদের রক্ষক হওয়ার কথা ছিলো তারাই ভক্ষক হয়েছেন। অর্থাৎ যাদের কাজ ছিলো দুর্নীতি ঠেকানো তারাই এই দুর্নীতি করেছে। সে কারণেই বারবার বলি, নীতি নির্ধারকদরে সততা খুব প্রয়োজন। ফেসবুক মনে করিয়ে দিচ্ছে, গত তিন বছর ধরে এই একই কথা লিখছি যে ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে বেশিরভাগ লোকই দুর্নীতি করে না। করে গুটিকয়েক লোক। এও লিখেছিলাম, ১৭ কোটি লোকের এই দেশে শুধুমাত্র ১৭০০ লোক ঠিক হলেই গোটা বাংলাদেশ বদলে যাবে। কীভাবে শুনবেন? দেখেন, বর্তমান মন্ত্রিসভার পূর্ণ মন্ত্রী ২৫ জন, প্রতিমন্ত্রী ১৯ জন ও উপমন্ত্রী তিনসহ মোট ৪৮ জনের মন্ত্রিসভার নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী একা যতোই সৎ হোক পারবেন না যদি তার সঙ্গের এই ৪৮ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী সৎ না হন। কিন্তু সত্যি সত্যিই যদি এই ৪৮ জন সৎ হতেন, এর সঙ্গে ৩০০ জন সংসদ সদস্য, ৮২ জন সচিব, দুর্নীতি কমিশনের প্রধান থেকে শুরু করে শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তা, অর্ধশত সরকারি প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক বা প্রতিষ্ঠান প্রধান, সবমিলিয়ে মোটামুটি পাঁচশজন মানুষ তাহলে দেশটা মোটামুটি ঠিক হয়ে যেতো।

পরের ধাপে যদি যুক্ত করেন ৬৪ জন ডিসি, ৪৯২ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা, তিন বাহিনীর প্রধান, একজন আইজিপি, ৬৪ জেলার ৬৪ জনসহ পুলিশ সুপার মর্যাদার কয়েকশ কর্মকর্তা, শ পাঁচেক থানার ওসি, বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্তা, প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের সাতজনসহ হাইকোর্টের প্রায় একশ বিচারপতি, শ খানেক জেলা জজ ও চীফ মেট্টোপলিটন ম্যাষ্ট্রেট, অর্ধশত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, গোটা ৫০ ব্যাংকের এমডি। দেখবেন সব মিলিয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়াবে ১৭০০ এর মতো। শুধু সরকারি না বেসরকারি খাত, ব্যাংক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা যে কোনো কিছুই এই দেশে কোনো না কোনোভাবে সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আর সিটি নিয়ন্ত্রণ করেন এই ১৭০০ মানুষ। আপনি যেই খাতের দুর্নীতির কথাই বলেন না কেন এই ১৭০০ মানুষ ঠিক হলে সেটা বন্ধ হবেই। কাজেই ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে এই ১৭০০ মানুষ যদি শতভাগ সৎ হন পুরো বাংলাদেশ বদলে যাবে। দেশটাও ঠিক হবে। তার মানে কোটি কোটি জনগণকে গালি দিয়ে লাভ নেই, শুধু দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা ঠিক হলেই গোটা দেশটা বদলে যেতো।

কিন্তু আদৌ কি এই ১৭০০ মানুষ ঠিক হবেন? আমার জানা নেই। কিন্তু এটা জানি এই ১৭০০ মানুষ ঠিক হলে দেশ ঠিক হয়ে যাবে। এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। শুধু জানি না কবে সেটা হবে। কবে দেখে দেখে এই ১৭০০ লোককে বাছাই করা হবে।
দেখেন আজকে এই দেশের রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সবাই বঙ্গবন্ধুর কথা বলেন। কিন্তু র্দ্নুীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর কথাগুলো কেউ মানেন না। ১৯৭৫ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে প্রদত্ত এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘করাপশন আমার বাংলার মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ, যারা আজকে ওদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি। আজ যেখানে যাবেন, করাপশন দেখবেন। ’ না বঙ্গবন্ধুর কথা কেউ শুনেননি। সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তোমার মাহিনা দেয়, তোমার সংসার চালানোর জন্য ট্যাক্স দেয়, তার কাছে তুমি আবার পয়সা খাও! মেন্টালিটি চেইঞ্জ করতে হবে। সরকারি কর্মচারী, মন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট আমরা জনগণের সেবক, আমরা জনগণের মাস্টার নই। মেন্টালিটি আমাদের চেইঞ্জ করতে হবে। আর যাদের পয়সায় আমাদের সংসার চলে, যাদের পয়সায় আমরা গাড়ি চড়ি, যাদের পয়সায় আমরা পেট্রল খরচ করি, আমরা কার্পেট ব্যবহার করি, তাদের জন্য কী করলাম? সেটাই আজ বড় জিনিস।’ কথা কেউ শোনেনি। ১৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষ্যে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘একদল লোকের পয়সার লোভ অত্যন্ত বেড়ে গেছে। পয়সার জন্য তাদের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। মাঝে মধে মনে হয়, এখন তাদের মূলনীতি লুটপাট আর দুর্নীতি।’ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর প্রায় ৪৬ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। এ বছর জাতি পালন করছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী। স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন হবে। অথচ এই দেশের শিক্ষা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, ভূমি থেকে শুরু করে পুলিশ আদালত, পাসপোর্ট থেকে শুরু করে ওয়াসা, তিতাস, সড়ক পরিবহন, রেল প্রতিটি সেবাখাত দুর্নীতিগ্রস্ত। আফসোস এই দেশে কয়েক বোতল মদ উদ্ধারে অভিযান হয় কিন্তু দুর্নীতিবাজ, লুটেরাদের বিরুদ্ধে কিছু হয় না। জানি না কবে পরিস্থিতি বদলাবে। কবে ১৭ কোটি লোকের এই দেশের দায়িত্বশীল ১৭০০ মানুষ ঠিক পথে চলবেন? স্বাধীনতার ৫০ বছর হতে চললো। আর কবে?

সর্বাধিক পঠিত