প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মঞ্জুরে খোদা টরিক: ‘নজরুল সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুর্ভাগা ব্যক্তি যার চিন্তা-চেতনা, আদর্শকে অনেক বেশি ভুল বোঝা হয়েছে, ভুল ‘অনুবাদ’ করা হয়েছে’

মঞ্জুরে খোদা টরিক: কবি নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে লক্ষ্য করছি, যে যার বিশ্বাস-দর্শন অনুযায়ী কবিকে তুলে ধরছেন, উপস্থাপন করছেন। কেউ বলছেন, তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট, বলছেন সমাজতন্ত্রী, সাম্যবাদী, কিন্তু তিনি মাকর্সবাদী ছিলেন না ইত্যাদি। আবার কেউ বলছেন, তিনি ছিলেন নাস্তিক, কেউ বলছেন তিনি ছিলেন আস্তিক, কেউ বলছেন তিনি ছিলেন হিন্দু, কেউ বলছেন তিনি ছিলেন মুসলমান। কেউ বলছেন তিনি ছিলেন বাঙালি, কেউ বলছেন ভারতীয়। যে যাই বলছেন, সবাই তার স্বপক্ষে কিছু না কিছু কাজ, প্রমাণ, বক্তব্য দেখাতে পারবেন, কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু তার বিরুদ্ধ ভাবনা, চিন্তা, কর্ম, দর্শণ, কাব্য, গীতি, সাহিত্যকে কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না! নজরুল নিজেও কখনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল-দর্শণের পক্ষে ধারাবাহিক ছিলেন না! এ বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলেনও নি এবং তার সেই বক্তব্যে তিনি কখনোই স্থিত/অটল থাকেননি। তিনি ইসলামের পূর্ণজাগরণের পক্ষেও লিখেছেন, আবার ধর্মান্ধতা-মতান্ধতার বিপক্ষেও প্রচণ্ড সরব ছিলেন। তিনি আজান নিয়ে লিখেছেন, উলুধ্বনি নিয়েও লিখেছেন। তিনি সুর-অসুর, প্রেম ও অপ্রেম সবই লিখেছেন। তিনি বাঁধনও নিয়ে লিখেছেন ছন্নছাড়াও নিয়েও লিখেছেন। তিনি হা’মদ-না’দ লিখেছেন আবার শ্যামা সঙ্গীতও লিখেছেন। তিনি কালির চরণে লুটিয়েও পরিণু লিখেছেন আবার ভগবানের বুকে পদচিহ্নও এঁকে দিয়েছেন। তিনি বিদ্রোহের কবিতা লিখেছেন, আবার প্রশান্তির কাব্য রচন করেছেন। যিনি নিজেকে আস্ত কাফের দাবি করেছেন, আবার মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই তাও বলছেন।

এ বিষয়ে বন্ধু চিররঞ্জন সরকরের মন্তব্য বেশ আগ্রহোদ্দীপক, তার মতে, ‘নজরুল মানুষটা ধর্মকর্ম খুব একটা মানতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। বিয়ে করেছেন জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে। কবিতায় লিখেছেন, ‘বিধি ও নিয়মে লাথি মেরে, ঠুকি বিধাতার বুকে হাতুড়ি ।’ বলেছেন, ‘স্রষ্টারে আমি চুষে খাই। ভগবানে আমি পোড়াব বলিয়া জ্বালায়েছি বুকে চিত।’ বলেছেন, ‘হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।’ তিনি ভজন লিখেছেন, কীর্তন লিখেছেন। লিখেছেন গজল। আমরা নজরুলকে বুঝলাম আমাদের মতো করে। আমরা ভুলে গেলাম নজরুলের সেই মহান বাণী, ‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নাই কিছু মহীয়ান।’

আমরা ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই’- এই কথাটিকেই নজরুলের একমাত্র ‘আদর্শ’ হিসেবে চালালাম। নজরুল সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুর্ভাগা ব্যক্তি যার চিন্তা-চেতনা-আদর্শকে অনেক বেশি ভুল বোঝা হয়েছে, ভুল ‘অনুবাদ’ করা হয়েছে।’ সে কারণে বলছি, প্রচলিত অর্থে কবি নজরুলের কোনো নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন ছিলো না। তিনি ছিলেন মানবতার কবি এবং ব্যক্তি হিসেবে মানবতাবাদী। তাঁকে যারা কোন দল, দর্শন ও তরিকার মধ্যে ফেলে যে যার দলে টানতে চাইছেন, তারা ভুল করছেন। তিনি ছিলেন মুক্ত মানুষ, মুক্ত কবি। এটাই আসলে একজন কবির উত্তম গুণ যিনি নিজেকে ভেঙে নিজেকে তৈরি করেন, নিজের বিপক্ষে নিজেকে দাঁড়া করান। এটাই ছিলো নজরুল, তিনি ছিলেন যুগ সন্ধ্যিক্ষণের কবি। তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন ছিলো না। তিনি ছিলেন মানবতার কবি, শৃঙ্খল মুক্তির কবি, প্রতিবাদী কবি। ধর্মান্ধদের কথা শুনে মনে হয় বলি, নজরুল তুমি করিয়াছ ভুল, রাখো নাই দাড়ি রখিয়াছো চুল। শতত শ্রদ্ধাঞ্জলি কবি। লেখক ও গবেষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত