প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খান আসাদ: সমাজ ও জীবনকে দেখার চোখ

খান আসাদ: আমার পুত্রের কন্যাটির বয়স এখনো দুই বছর হতে মাস দুয়েক বাকি। পার্কে, শিশুদের খেলার মাঠে অনেক ধরনের অবকাঠামো। আনন্দের সঙ্গে শারীরিক কসরত শিক্ষার আয়োজনও। যারা পার্কগুলো ডিজাইন করেছেন, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের, দক্ষতা ও সামাজিকায়নের, ভাবনা পরিকল্পনায় ছিলো বলেই মনে হয়। বালু, পানি ইত্যাদি নিয়ে খেলার এক পর্যায়ে, আমরা বেরুবো। বেরুনোর মুখে সে একটি গোলাপি রঙের বাইসাইকেল দেখলো। আমাকে জোর করে, টেনে সে সাইকেলটি ‘দখলে’ নিলো। একটু পরেই ওর বয়সী আরেকটি শিশু এসে জানালো, সাইকেলটির ‘মালিক’ সে।

পৌত্রী মন খারাপ করে সাইকেলটি দিয়ে দিলো। সে মালিককে ‘না বলে’ (পড়ুন ‘চুরি’ করে) সাইকেলটি নিতে পারেনি। উপড়ে আমার ভাষা একটু খেয়াল করুন। ‘দখল’, ‘মালিকানা’ না বলে নেয়া বা চুরি’। এই শিশুদের যা বয়স, তাতে, এদের ‘দখলের’ বা ‘ব্যক্তি মালিকানার’ বা ‘চুরি’ ধারণা নেই। এই ধারণা যারা দেখছে বা ব্যাখ্যা করছে, তাদের শ্রেণীবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ মাত্র। শিশুদের চেতনার বাস্তবতার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। আপনি শিশুমনস্তত্ত্বের জ্ঞান দিয়ে, মুক্তমনে, ভিন্ন ভাবেও এই ঘটনাকে ভাবতে পারেন, ভিন্ন ভাষায়। শিশুরা স্থির অনড় খেলনার চেয়ে গতিশীল খেলনা বেশি ‘পছন্দ’ করে। দুটো শিশুরই এই খেলনাটি পছন্দের। রঙ কেমন, উজ্জ্বল আকর্ষণীয় কিনা সেটাও মনোযোগ আকর্ষণের কারণ। শিশুরা ‘দখল’ বা ‘ব্যক্তি মালিকানা’ জন্মসূত্রে পায় না।

পায় সামাজিকায়নে, বয়স হলে। অনেকেই সমাজতন্ত্র ‘ভুল’ বা ‘ব্যর্থ’ কিংবা সমাজতন্ত্র ‘পুঁজিবাদে ফিরে গেছে’ এই ধরনের ভাষায় যা প্রকাশ করে, সেটি বাস্তবতার একটি ব্যাখ্যা, যা এই ব্যাখ্যাকারীরা মনে মনে প্রত্যাশা করে। সমাজবিজ্ঞান দিয়ে ‘সমাজতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রের বিবর্তন বুঝতে হলে, তা সমাজইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ও ওই সমাজের দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে বুঝতে হবে।
পুঁজিবাদী সমাজের এন্টিথেসিস হিসেবে সমাজতান্ত্রিক ধারণা। একদিকে পুঁজিবাদী শোষণমূলক ব্যবস্থার বিবর্তন হচ্ছে, অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থারও বিবর্তন হচ্ছে। এই বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় পুঁজিবাদের কেন্দ্রে একধরনের পরিবর্তন আসছে, আবার সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আরেক ধরনের পরিবর্তন আসছে। এই দুই পরিবর্তনের দ্বান্দিকতায় গোটা বিশ্বপুঁজিবাদী ব্যবস্থার পরিমাণগত পরিবর্তন হচ্ছে, যা আগামীতে গুনগত রূপান্তর হবে। আমার বা আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম একটি পুঁজিবাদ উত্তর সমাজতান্ত্রিক সমাজ দেখবো। চলমান ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ পুঁজিবাদের মতোই পুঁজিবাদ উত্তর একটি সমাজের অভিমুখী।

আজকের ‘সমাজতন্ত্র’ বলে যা দাবি করা হয়, তা কোন পুঁজিবাদ উত্তর সমাজতান্ত্রিক সমাজ না। এগুলি দলীয় প্রচেষ্টা, যা রাষ্ট্র ক্ষমতা দিয়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হচ্ছে। ফলে, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গুলিকেও বিবর্তনের ধারাতেই দেখতে হবে, এগুলি বিশুদ্ধ কোন ব্যবস্থা নয়, একটি সমাজতন্ত্র অভিমুখী প্রচেষ্টা মাত্র। আমরা মতান্ধ সবজান্তা হতে পারি, অথবা মুক্তমনে সমাজবিজ্ঞান দিয়ে সমাজ ও জীবনকে বোঝার চেষ্টা করতে পারি। এই চেষ্টা করতে গিয়ে একটি চিন্তা-মূল্যায়ন মাপকাঠি, আমরা কি বৈষম্য ও সহিংসতাকে বৈধতা দিচ্ছি, না কি এর বিপক্ষে দাঁড়াচ্ছি। নিজের মতান্ধ বিশ্বাসকে প্রশ্ন বা সন্দেহ করা উচিৎ, এবং এই সন্দেহকেও সন্দেহ করা উচিৎ। এভাবেই আমরা মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞান চেতনা ধারণ করে সমাজ ও জীবনকে বুঝতে পারবো। এবং শুধু জানা বোঝাই শেষ কথা নয়, আমাদের একটি সাম্যের ও শান্তির সমাজের জন্য নিরন্তর সক্রিয় থাকাও মানবিক দায়। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত