প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান: সংকটে শিক্ষা: আমার একগুচ্ছ প্রস্তাব

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান: প্রায় দেড় বছর যাবৎ আমাদের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। গত বছর মার্চে করোনা সংক্রমণের শুরুতেই আমরা ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক প্রায় সবাই দাবি করেছিলাম অনতিবিলম্বে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার জন্য। জনতার দাবি সবসময় বিজ্ঞানসম্মত না হলেও এই দাবির পেছনে বৈজ্ঞানিক যুক্তির সমর্থন ছিলো। যারা অনবরত ‘টকশো’ এবং মানববন্ধনে সব কিছু খোলা রেখে কেবলমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার যুক্তি খুঁজে পাচ্ছেন না, তাঁরা অতীতকালের মহামারিগুলোর সময় গৃহীত ব্যবস্থাদি এবং ওই সকল ব্যবস্থার ফল পর্যালোচনা করলে দেখবেন তাদের দাবি কেবলই ‘রাজনৈতিক’; বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। বাইরে রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ানো অথবা খোলা আকাশের নিচে শিমুলিয়া ঘাটে ফেরি পারাপারের জন্য ভিড় করা আর আবদ্ধ কক্ষে ক্লাস নেওয়া সংক্রমণ ছড়ানোর বিবেচনায় একই রকম না।
গবেষণায় দেখা গেছে, আউটডোর থেকে সংক্রমণের কেবল মাত্র ১০ শতাংশ আসে, ৯০ শতাংশ সংক্রমণ হয় ইনডোরে অর্থাৎ আবদ্ধ জায়গায় জনসমাবেশ থেকে। বিগত দেড় বছরে করোনার সংকটকালে শিক্ষাব্যবস্থা আরো সক্রিয় রাখার জন্য আমাদের করণীয় কী ছিলো? কোথায় কোথায় আমরা ভুল করেছি? সেগুলো নিয়ে পর্যালোচনা হতেই পারে। তবে এখন আশার কথা হচ্ছে করোনা সংক্রমণের হার নিম্নগামী হওয়ায় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় আগামী মাসে খুলে দেয়ার জন্য প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক সমস্যা বিবেচনা করে ইউনেস্কো থেকেও আর বিলম্ব না করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংশ্লিষ্টদের একই আহ্বান জানিয়েছেন। এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় হচ্ছে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোনো। যেকোনো খারাপ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করার আগে এই পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি যথাযথ নিরূপণ হচ্ছে প্রথম কাজ। দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দুইটি বড় ক্ষতি হয়েছে একটি হচ্ছে শিক্ষণ ক্ষতি (learning loss), আরেকটি হচ্ছে cyber poverty gap এর কারণে বৈষম্য বৃদ্ধি (increases inequality)। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে এর বাইরে আরো অনেক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, এর মধ্যে একটি হচ্ছে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের মধ্যে স্কুল ড্রপ আউটের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে বাল্যবিবাহের হার বেড়ে যাওয়া। দীর্ঘমেয়াদে যেসকল ক্ষতির মোকাবেলা করতে হবে তা হচ্ছে শিক্ষন ঘাটতির কারণে উপযুক্ত কাজ না পাওয়া, পড়াশোনায় অধিক বছর লেগে যাওয়া, ভবিষ্যৎ উপার্জনের পরিমাণ কমে যাওয়া। এছাড়াও এ সকল ছাত্র ছাত্রীরা তাঁদের আগেকার এবং করোনা উত্তরকালের ছাত্র-ছাত্রীদের তুলনায় সব সময় একটু পিছিয়ে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসকল বিষয় বিবেচনায় নিম্মোক্ত কয়েকটি সুপারিশ তৈরি করা হলো :

প্রথমত, শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে আসলে তাঁদের তাৎক্ষণিক( ( just-in-time) একটা মূল্যায়ন করতে হবে এবং যে সকল শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষা সহায়তা আবশ্যক তাদেরকে চিহ্নিত করে তাদের জন্য বিশেষ টিউটোরিয়ালের ব্যবস্থা করতে হবে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গবেষণায় দেখা গেছে ১২ সপ্তাহ টিউটোরিয়াল ক্লাস নিয়ে ৬/৭ মাসের স্কুলে না আসার শিক্ষণ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব। Cyber poverty gap এর কারণে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাসের এবং মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয় সুপারিশটি হচ্ছে, আমাদের শিক্ষাখাতের বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং শিক্ষা প্রযুক্তিতে ব্যয় বাড়াতে হবে। বিভিন্ন দেশে শিক্ষণ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। যুক্তরাজ্য সরকার এক বিলিয়ন পাউন্ডের ‘pupil catch-up fund’ গঠন করেছে। এরমধ্যে ৭৬ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করা হবে ‘জাতীয় টিউটরিয়াল প্রগ্রামে’। যেই প্রোগ্রামের আওতায় অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আনা হবে। তৃতীয় সুপারিশটি হচ্ছে, ভবিষ্যতে করোনার পরবর্তী ঢেউগুলো মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নেয়া। ধরে নিতে হবে করোনা সহসা নির্মূল হবে না। অতএব করোনার ঢেউ যদি পালাক্রমে আসতে থাকে তাহলে যেন আমরা অপ্রস্তুত না হই সেজন্য শিক্ষার একটি ‘হাইব্রিড মডেল’ আমাদের তৈরি করতে হবে অর্থাৎ আবার ঢেউ আসলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও লেখাপড়া বন্ধ হবে না। খুব সহজে যাতে আমরা অনক্যাম্পাস থেকে অফক্যাম্পাসে রূপান্তরিত হতে পারি সে ধরনের ব্যবস্থা আমাদের গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষণ প্রযুক্তির (Edtech) যা কিছু ঘাটতি আছে এই সময়ের মধ্যে জরুরী ভিত্তিতে সেই ঘাটতি দূর করতে হবে। যেমনটা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও করা হয়েছে। শুরুতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে ভঙ্গুরতা এবং দৈন্যদশা দেখা গিয়েছিলো গত এক বছরে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। জেলা হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। আই সি ইউ বেড এবং ভেন্টিলেটরের সংখ্যা অন্তত দশ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ৪০০০ ডাক্তার এবং প্রায় আট হাজারের মতো নার্স এবং স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। একই ব্যবস্থা আমাদের শিক্ষা খাতের জন্যও নিতে হবে। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস রুমের সংখ্যা বাড়াতে হবে, বিশেষ করে ইন্টারনেট এবং মাল্টিমিডিয়া সংযুক্ত ক্লাসরুমের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সাইবার দক্ষতা সম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। আর যারা এখন কর্মরত আছেন তাঁদেরকে সাইবার দক্ষতা এবং অনলাইন ক্লাস এবং পরীক্ষা নেয়ার জন্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পারদর্শী করে তুলতে হবে।

চতুর্থ সুপারিশটি হচ্ছে, আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস নেয়ার জন্য রোটেশন পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে অর্থাৎ সাপ্তাহের একদিন একটি শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসবে অন্যরা সেদিন আসবে না। প্রয়োজনে অন্যরা ক্লাসের সরাসরি সম্প্রচারে বাড়িতে বসে সংযুক্ত থাকবে। পালাক্রমে সপ্তাহের অন্যান্য দিনগুলোতেও এই আবর্তনটি চলতে থাকবে। তাহলেই শিক্ষার্থীদেরকে আমাদের বিদ্যালয়গুলোর সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাসরুমে বসানো সম্ভব হবে। যেমন একটি বিদ্যালয় প্রথম শ্রেণীতে যদি ৫০ জন শিক্ষার্থী থাকে তাদেরকে ওই বিদ্যালয়ের পাঁচটি রুমে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে দশ জন করে বসানো হবে এবং বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকরা ওইদিন কেবলমাত্র ওই শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরকে সারাদিন টিউটোরিয়ালের মতো করে পাঠদান করবেন। শিক্ষার্থীদের বাড়ির কাজ দিয়ে দিবেন। আর বন্ধের দিনে গ্রামাঞ্চলে শিক্ষকরা খুব সহজেই বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এবং তাঁদের অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অগ্রগতি নিয়ে কথা বলতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে আসতে পারবেন। একই সঙ্গে সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ গ্রামে গেলে গ্রামবাসীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথাটিও বলতে পারেন এবং শিক্ষকদের কথায় অভিভাবকরাও স্বাস্থ্যবিধি মানতে উদ্বুদ্ধ হবে এটা আশা করা যায়। পঞ্চম সুপারিশটি হচ্ছে, খোলা মাঠে ক্লাস ক্লাস নেয়া। আমাদের গ্রাম অঞ্চলের স্কুলগুলোতে প্রায় প্রত্যেকটিতে খেলার মাঠ আছে এবং আশেপাশে পর্যাপ্ত খালি জায়গা আছে। শিক্ষার্থীদেরকে শ্রেণিকক্ষে আবদ্ধ না রেখে আউটডোরে বসিয়ে ক্লাস নেয়া যেতে পারে। মহামারী কালে শিক্ষার্থীকে খোলা মাঠে বসিয়ে ক্লাস করানোর নজির প্রায় দেড়শত বছরের পুরনো। সংকটের কথা বাদ দিলেও খোলা মাঠে, গাছের নিচে, নদীর পাড়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে ক্লাস এর উপকারিতা অপরিসীম। ১৯০১ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে গাছের নিচেই শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়েছিলেন। ইউরোপে ‘ওপেন এয়ার স্কুল’ প্রথমে শুরু হয় জার্মানী ও বেলজিয়ামে ১৯০৯ সালে। ১৯০৭ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে খোলা জায়গায় স্কুল শুরু হয়। খোলা চত্বরে, মাঠে, ভবনের ছাদে এমনকি পরিত্যক্ত নৌকায়ও ক্লাস নেয়া হয়। চলতি করোনা মহামারী কালেও নিউ ইয়র্কে বিদ্যালয়ের বাইরে ক্লাস নেয়া হচ্ছে। ১৯২২ সালে ‘লীগ ফর ওপেন এয়ার এডুকেশন’ প্রথম সম্মেলন ডাকে প্যারিসে। এই সংকটকালে আমাদের দেশে খোলা মাঠে ক্লাস নেয়া শুরু করলে দুটি সুবিধা হবে- প্রথমটি হচ্ছে খোলা জায়গায় সামাজিক দূরত্ব মেনে শিক্ষার্থীদের বসানো যাবে, অপরটি হচ্ছে শিক্ষার্থীরা একটি প্রাকৃতিক পরিবেশে জ্ঞান আহরণ করতে পারবে। আজকাল অত্যন্ত স্বল্প দামে প্লাস্টিকের চেয়ার টেবিল পাওয়া যায়। প্রয়োজনে লেখা ও পরীক্ষার কাজে হালকা ওজনের এসব চেয়ার টেবিল মাঠের বড় পরিসরে ব্যবহার করা যেতে পারে। সহজেই আবার গুটিয়ে স্কুল ঘরেই সংরক্ষণ করা যেতে পারে। ঈষৎ সংক্ষেপিত।
লেখক : শিক্ষক, মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত