প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সেলিম রেজা নূর: জাতির দুর্দিনে আগুন ঝরাতো শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের কলম

সেলিম রেজা নূর: পাকিস্তানে জামাত ও ধর্মাশ্রয়ী দলগুলির প্রকৃত ধর্মাচারণের পরিবর্তে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করার অপ-রাজনীতির বিরুদ্ধে সিরাজ থেকেছেন বরাবরই খড়গ-হস্ত! ১৯৭০ সালের নির্বাচন-পূর্বকালীন সময়ে নিজ কলাম মঞ্চে-নেপথ্যে” কলামে সিরাজ সরাসরি রাজনৈতিক ইসলাম’ প্রচার ও প্রসারের অভিযোগে জামাতের বিরুদ্ধে কন্ঠ উচ্চকিত করেছিলেন – সিরাজের সেই কালজয়ী লেখাগুলি আমরা ইতিমধ্যেই মঞ্চে-নেপথ্যে’ শিরোনামেই বই আকারে প্রকাশ করেছি !

আবার ১৯৭১’র জাতির দূর্বিসহ-দূর্দিনে জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই সম্পাদকীয় নিবন্ধে আবার আমরা সিরাজেকে আমরা ঝলসে উঠতে দেখি এবং সেই একই সুর ও স্বর শুনতে পাইঃ  ইহাও আমাদের বরাবরের বিশ্বাস ইসলামিক সাম্য ও মৈত্রী প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে যাহারা ধর্মের নামে জনগনের মূল সমস্যাসমূহকে চাপা দিতে চান, তাঁহারা না ধর্মের, না দেশের কোন উপকার করেন। সমাজে ধর্ম কোন বিতর্কের বিষয় নয়। কারণ, মানুষ জানে ধর্ম কখনও অধর্মকে প্রশ্রয় দিতে পারে না। বিপত্তি দেখা দেয় কেবল তখনই, যখন দেখা যায় ধর্মকে অধর্মের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রয়াস চলিতেছে। বাহুল্য, ধর্মের নামে যাঁরা প্রকৃত সমস্যা এড়াইবার চেষ্ঠা করেন, ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে তাদের আসল উদ্দেশ্য বা মতলব কখনও চাপা থাকে না।

এদেশের মাটিতে তার প্রমাণের কোন অভাব নাই। কি পূর্ব পাকিস্তানে, কি পশ্চিম পাকিস্তানে, বিগত নির্বাচনের রায়েও আমাদের এই অভিমতের অভ্রান্ততা প্রমাণিত হইয়াছে। নির্বাচনে এ-প্রদেশের জনসাধারণ যে রায় ঘোষণা করিয়াছে, উহার অর্থ এই নয় যে, পূর্ব পাকিস্তানীরা কাহারও চাইতে কম ধর্মানুরাগী বা কম মুসলমান। ইহার অন্যথা কেহ বুঝাইবার চেষ্টা করিলে তিনি মারাত্মক ভুলই করিবেন। দেশে ধর্ম শিক্ষার প্রয়োজন নাই ইহা আমরা বলি না। কিন্তু ধর্ম শিক্ষা আর রাজনীতি এক নয়”।

পাঠক! কল্পনায় একবার চরম বিভীষিকাময় ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পরবর্তী সময়কালের অবরুদ্ধ ঢাকা নগরীর অবস্থাটি বিবেচনা করে সিরাজুদ্দীন হোসেনের এই সম্পাদকীয় নিবন্ধের বিষয়বস্তুটি আর সেই সাথে তার অন্তর্নিহিত বক্তব্যটি বুঝবার চেষ্ঠা করুন! জামাতী ধর্মোন্মাদরা সামরিক অপ-শক্তির চ্ছত্রছায়ায় থেকে  ঘাতক-বাহিনী আল-বদর, আল-শামস, রাজাকার বাহিনী গঠন করে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছে – তারা সারা দেশে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে; তাদের কার্যকলাপের ভয়াবহ খবর তখন মানুষের মুখে মুখে – যেখানে-সেখানে যত্র-তত্র যাকে বা যার কথা-বার্তা-যুক্তি পছন্দ হচ্ছেনা তাকেই/তাদেরকেই হত্যা করছে সাথে সাথেই; কারণ ওরা  গেল-গেল-গেল’ ধ্বনি তুলে ইসলাম ও পেয়ারা পাকিস্তান’ রক্ষার মহান ব্রত  নিয়ে হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল, সে কথা বলাই বাহুল্য!

প্রতিদিনই তখন সংবাদপত্রে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে অমুক জায়গায়, তমুক জায়গায় নানা সংখ্যা দিয়ে রাজাকার কর্তৃক ২১ জন ভারতীয় চর খতম/নিহত”! সারা দেশ চষে বেড়িয়ে তখন এইসব ধর্মোন্মাদ জামাতী রাজাকার-আল-বদরেরা ভারতীয়-চর’ খুঁজে বেড়াচ্ছে এবং মুহুর্তের মধ্যে তাদেরকে হত্য করছে! তাদের বিবেচনায় কারা ছিল ভারতীয় চর” ও ইসলাম-বিরোধী সেদিন?

যারা শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ’কে ভোট দিয়েছিল, যারা শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলতো ও সমর্থন করতো – এক কথায় বলতে গেলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফলই তো প্রমাণ করে দিল, মুজিব বাংলার, বাংলা মুজিবের” –  সমগ্র বাংলাদেশই তো তখন মুজিবের বাংলা, ফলে সারা বাংলা ও বাঙালী জাতিকে ধ্বংস করার কাজে ওরা নেমেছিল আর চালিয়ে যাচ্ছিল নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। আর সেই জীবন-মৃত অবস্থায় থেকে মানুষ-জন তখন ‘দিন-যাপনের গ্লাণির মধ্যে দিয়ে জীবন অতিবাহিত ক’রে যাচ্ছিল! সেই অবস্থার মধ্যে থেকে, মাথার উপর খড়গ-হাতে সাক্ষাত-মৃত্যুদূতরা দাঁড়িয়ে আছে জেনেও বাংলার সিরাজ খাপ-খোলা তলোয়ার হয়েই দেশ ও দশের সেই ভয়ানক দূর্যোগ ও দূর্দিনের মধ্যে থেকেও শত্রুদের খামোশ! বলে যেন রুখে দাঁড়ালেন!

সিরাজুদ্দীন হোসেনের কলম থেকে সেই প্রায় অস্পৃশ্য নাম/শব্দগুলি মুজিব’ আওয়ামী লীগ’ বাংলাদেশ’ এসব একাধারে উচ্চারণ করে চলেছেন অসীম সাহসে! সেই সাথে সিরাজের বাংলার বাঙালী জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক ‘বাঙালী মুসলমানদের – “মুসলমান বাঙালী” বানাবার কোশেশ ক’রে “প্রকৃত মুসলমান” বানাবার জামাতী অপচেষ্ঠাকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ ক’রে এখানে চ্যালেঞ্জ করছেন – যেটি ঐভাবে প্রকাশ্যে বলা কোনোভাবেই সম্ভব ছিলোনা সেদিন – তবুও সিরাজ সেটাই করেছিলেন সকল শুভাকাঙ্খীর নিষেধ উপেক্ষা করেই!!

সর্বাধিক পঠিত