প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ই-কমার্সের আড়ালে অর্থ পাচার, পুলিশ-র‌্যাবের নজরদারিতে ১৫ প্রতিষ্ঠান

নিউজডেস্ক: ই-কমার্সের আড়ালে গ্রাহককে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে কোটি কোটি টাকা পাচার ও অন্যত্র স্থানান্তর করা হচ্ছে। ধামাকা শপিং ডট কম, নিরাপদ ডট কমসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বিদেশে অর্থ পাচার ও নামে-বেনামে অন্য খাতে স্থানান্তর করছে বলে প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। অন্তত ১৫টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নজরদারিতে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার ক্রাইম বিভাগ। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিশেষ অফার দিয়ে পণ্য দেওয়ার কথা বলে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ নিলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই পণ্য দিচ্ছে না। আবার গ্রাহকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা অর্থ তারা নামে-বেনামে অন্যত্র সরিয়ে ফেলছে। ইভ্যালির পর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর জালিয়াতির বিষয়ে বিশেষ নজর রাখা শুরু হয়।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল কেএম আজাদ বলেন, ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

প্রতারণা করে গ্রাহক ঠকানোর অভিযোগে সর্বশেষ গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর গুলশান-১ নম্বরে সড়ক অবরোধ করেন ই-অরেঞ্জের গ্রাহকরা। এরপর ওই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত শুরু করে পুলিশ। গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া ৫০০ কোটি টাকা ই-অরেঞ্জের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অর্থ পরিশোধ প্রতিষ্ঠান এসএসএল কমার্জের মাধ্যমে এই টাকা স্থানান্তর হয়। এ বিষয়ে আরও খতিয়ে দেখতে ই-অরেঞ্জের দুটি ব্যাংক হিসাবের লেনদেন পর্যালোচনা করবে পুলিশ। সেইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ডাটা সেন্টারের তথ্যও মিলিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা।

এর আগে ১২ জুলাই নিরাপদ ডটকম নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহরিয়ার খানকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। ওই মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বলেন, ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের একটি কমন দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয় দেখা যায়। সেটা হলো গ্রাহককে যে পণ্য দেওয়ার কথা তার মধ্যে ১০ শতাংশ তারা সময়মতো দিয়ে থাকে। বাকি ৯০ শতাংশ গ্রাহকের অর্থ তারা অনেক দিন আটকে রাখে। তাদের বলা হয় ৫-৬ মাস পর তাদের পণ্য দেওয়া হবে। এসব অর্থ অন্য ব্যবসায় স্থানান্তর করে মালিকপক্ষ। ই-কমার্স বৈধ। এর একটি নীতিমালা রয়েছে। তবে দেখা যায় অনেকেই এই নীতিমালা অনুসরণ করছে না। বেশ কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নজরদারিতে রয়েছে। তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতির বিষয়ের সন্দেহাতীত প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।

জানা গেছে, নিরাপদ ডট কমের কর্ণধারের বিরুদ্ধে ৮ কোটি টাকার মতো অর্থ জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনি পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন, এই অর্থের পরিমাণ আড়াই কোটি টাকার মতো।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপির সাইবার ক্রাইম বিভাগের ডিসি আ ফ ম কিবরিয়া বলেন, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা ও জালিয়াতির ব্যাপারে ১০টি অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। এগুলোর তদন্ত চলছে।

জানা গেছে, পুলিশ সদরদপ্তর, র‌্যাব, সিআইডির সাইবার ইউনিটও পৃথকভাবে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখছে। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ ছাড়াও এই তালিকায় রয়েছে আলেশা মার্ট, কিউকম, বুমবুম, আদিয়ান মার্ট, নিডস, দালাল, সিরাজগঞ্জ শপ, ধামাকা শপিং ডটকম, নিরাপদ ডটকম, আলাদিনের প্রদীপ, এসকে ট্রেডার্স ও মোটরস। ধামাকা শপিংয়ের গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম আদায় করা ৫০ কোটি টাকা অন্য ব্যাংকের হিসাব নম্বরে পাচার করা হয়। এই জালিয়াতির ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জসিম উদ্দিন চিশতীকে খোঁজা হচ্ছে। তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। এ ছাড়া আরও কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের অর্থ তাদের নিজস্ব বৈধ অ্যাকাউন্টে জমা না হয়ে অন্য হিসাব নম্বরে সরাসরি চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে অর্থ পাচারকারীরা কিছু মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছেন।

এদিকে গ্রাহকের ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত ১৭ আগস্ট ই-অরেঞ্জের মালিকসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা হয়। তাহেরুল ইসলাম নামে ভুক্তভোগী এক গ্রাহক বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এ মামলায় প্রতিষ্ঠানের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন, তার স্বামী মাসুকুর রহমান ও চিফ অপারেটিং অফিসার আমানউল্লাহ কারাগারে রয়েছেন। বীথি আক্তার ও কাউসার আহমেদ নামে দুই আসামি এখনও পলাতক। মেহজাবিন সাবেক ব্যাংকার ও তার স্বামী একটি মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। অভিযোগ রয়েছে, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থেকে নিজেদের আড়াল করতে কৌশলে প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের মালিকানা বদল করেন তারা।

এদিকে সোনিয়া মেহজাবিনের ভাই বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ সোহেল রানা নেপথ্যে থেকে প্রতিষ্ঠানটি চালাতেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার অনৈতিক আয়ের অর্থে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে বলেও দাবি করেন কেউ কেউ।

পুলিশের গুলশান বিভাগের ডিসি মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ই-অরেঞ্জের প্রতারণার আদ্যোপান্ত আমরা খুঁজে বের করব। জড়িত যেই হোক, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আমিনুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত মালিক হিসেবে মামলায় অভিযুক্ত পাঁচজনের নামই পাওয়া গেছে। ওই পুলিশ কর্মকর্তার সংশ্নিষ্টতার কোনো তথ্য এখনও মেলেনি। ঢাকা সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে তারা ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। মালিকানার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সিটি করপোরেশনের কাছে ট্রেড লাইসেন্স-সংক্রান্ত কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাদের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন পর্যালোচনার জন্য আদালতের অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। অনুমতি পেলে ব্যাংকের হিসাব বিবরণী সংগ্রহ করে অন্যান্য লেনদেনের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।

মামলায় এক লাখ গ্রাহকের ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠলেও এখন পর্যন্ত শুধু ৫০০ কোটি টাকা প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ প্রসঙ্গে তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানান, ‘ডাবল ভাউচার’ অফার দিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নেয় ই-অরেঞ্জ। অফারের ভাষ্য ছিল, কেউ এক লাখ টাকা জমা দিলে দুই লাখ টাকার ভাউচার পাবেন। ওই ভাউচার দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে পণ্য কিনতে পারবেন। পণ্য না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা তাদের পাওনা দ্বিগুণ অর্থের উল্লেখ মামলায় করেছেন বলে পুলিশের ধারণা।

গুলশান থানা পুলিশ জানায়, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে যাত্রা শুরু করে ই-অরেঞ্জ। মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করা প্রতিষ্ঠানটি নানা পর্যায়ে আলাদা কৌশলে ব্যবসা চালায়। গত ১৫ মে থেকে তারা পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিলে জটিলতা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ই-কমার্স পরিচালনা নিয়ে নানা সমালোচনা এবং এতে নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীলদের বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে পণ্য সরবরাহ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে তারপরও বহু গ্রাহক টাকা জমা দিয়েছেন। এই গ্রাহকদের অর্থই মূলত আটকে গেছে। অবশ্য অভিযোগ মিলেছে যে, ২৮ এপ্রিলের পর থেকে অনেক গ্রাহক আর পণ্য বুঝে পাননি।

অগ্রিম অর্থ নিয়ে গ্রাহকের পণ্য না দেওয়ার অভিযোগে মামলা হওয়ার পর আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। ১৮ আগস্ট ঢাকা মহানগর হাকিম রাজেশ চৌধুরী এ আদেশ দেন। অবশ্য এর আগের দিনই ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবুবকর সিদ্দিকের আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চান প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও তার স্বামী। শুনানি শেষে আদালত জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

সংশ্নিষ্টতা নেই- দাবি পুলিশ কর্মকর্তা সোহেলের :ই-অরেঞ্জের সঙ্গে কোনো সংশ্নিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ সোহেল রানা। তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি চালাতেন আমার বোন সোনিয়া মেহজাবিন। তবে তিনিও এখন আর এটির মালিক নন। জানুয়ারিতে তিনি বীথি আক্তারের কাছে ব্যবসা বিক্রি করে দেন। নতুন মালিক পক্ষ এপ্রিলে দায়িত্ব বুঝে নেয়। কিন্তু মামলার বাদী সম্ভবত এ বিষয়ে অবহিত ছিলেন না। এ কারণে তিনি আমার বোন ও ভগ্নিপতিকেও মামলায় আসামি করেন। প্রতিষ্ঠানটিতে আমার কোনো বিনিয়োগ বা মালিকানার অংশীদারিত্ব ছিল না।’

এদিকে সোহেল রানা উপ-পরিদর্শক (এসআই) থাকার সময় গুলশান থানায় দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ উঠেছে, গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় দায়িত্ব পালনের সুবাদে বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তার সঙ্গে তার সুসম্পর্ক তৈরি হয়। এর সুযোগ নিয়ে তিনি লোকজনকে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে বিপুল অর্থের মালিক হন। তবে তিনি বলছেন, এটা একেবারেই ভিত্তিহীন অভিযোগ। তাছাড়া একজন এসআইয়ের পক্ষে সেটা সম্ভবও নয়। যে কেউ চাইলে এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। সূত্র: সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত