প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিপন্ন ৯৬ প্রজাতির গাছ ফিরেছে চবির পাহাড়ে

নিউজ ডেস্ক: তেলিগর্জন, নাগেশ্বর, পিতরাজ, সিধাজারুল, কামদেবের মতো দুর্লভ গাছ সারিবদ্ধভাবে লাগানো। শিশুকাল পেরিয়ে কেবল কৈশোরে পা দিয়েছে তারা। বর্ষা মৌসুমের শেষে তাদের প্রাণচঞ্চল, সজীবতায় দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) দুটি পাহাড়। বিজ্ঞান অনুষদ ক্যাফেটোরিয়ার পেছনে জাঙ্গলিয়া নামক স্থানে বিপন্ন ৯৬ প্রজাতির দুই হাজার ৮৮০টি বৃক্ষ নিয়ে এ বনায়ন গড়ে তুলেছে বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউট। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যতে গবেষণার কাজে এবং বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ও ড. মো. দানেশ মিয়ার সহযোগিতায় এখানে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীও কাজ করছেন। ইতোমধ্যে দু’জন শিক্ষার্থী এ বিষয়ে থিসিস করেছেন।

এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ‘এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফ্লোরা অ্যান্ড ফাউনা বাংলাদেশ’-এর তথ্য মতে, দেশে ৪৮৬ প্রজাতির বৃক্ষ বিপন্নপ্রায়। এর মধ্যে বেশিরভাগ গাছ আবার বিলুপ্ত হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রোপণ করা অন্য গাছগুলো হলো- রক্তন, চাপালিশ, চম্পাফুল, নারিকেলী, টালি, চুন্দুল, তেলসুর, ঢাকিজাম, শিমুল, বান্দরহোলা, বলাম, পিতরাজ, ধলিগর্জন, কাউ, গোদা, বাটনা, ধারমারা, পলাশ, তেজবহল, মদনমাস্তা, আছার, মুস, ছাতিম, তুন, বাঁসপাতা, বুরা, অশোক, বরমালা, চিকরাশি, কনক, জলপাই, কেসটুমা, সিঁদুর, খরুলা, কানিয়ারি, চাকুয়াকরই, বর্তা, আরশল, হারগাজা, আমলকী, আমড়া, ভাদী, হলদু, শীলভাদী, উদাল, বন সোনালু, বহেড়া, কুর্চি, কুসুম, গান্ধীগজারী, পলাশ, কুরচি, হরীতকী, বইট্টাগর্জন, চাকুয়াকড়ই, শিমুল, ভেলা, সিভিট ও মেন্দা। বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যান, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, মধুপুর জাতীয় উদ্যান, হিমছড়ি জাতীয় উদ্যানসহ বাংলাদেশের পাহাড়ি ও সমতল বনভূমি থেকে এই প্রজাতিগুলো আনা হয়।

জানতে চাইলে ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ১০০ থেকে ২০০ বছর আগে আমাদের ভূখণ্ডে যে বৃক্ষগুলো ছিল তার মধ্যে অনেকগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিশ্বের সব দেশ তাদের বৃক্ষসম্পদ সংরক্ষণ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আমাদের ক্যাম্পাসে যেহেতু অনেক খালি জায়গা আছে, তাই আমরা পরিকল্পিত উপায়ে বিলুপ্ত ও বিপন্নপ্রায় উদ্ভিদগুলো নিয়ে বনায়ন করতে চাচ্ছি। তিনি বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য হলো, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যেন বাংলাদেশের বেশিরভাগ উদ্ভিদ প্রজাতির একটি জীবন্ত সংগ্রশালা হয়। বোটানি, মাইক্রো বায়োলজি, ফার্মেসি, ফরেস্ট্রি বিভাগগুলো যেন জীবন্ত গবেষণাগার হিসেবে এটিকে ব্যবহার করতে পারে। এ ছাড়া কোনো প্রজাতির প্রসার ঘটাতে চাইলে তা যেন এখান থেকে করা যায়।

বনায়নের ব্যাপারে তিনি বলেন, প্রথমে আমরা বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে বীজ সংগ্রহ করেছি। শিক্ষার্থীরা ওগুলো নিয়ে গবেষণা করেছে। পরে ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণের নার্সারিতে চারা উৎপাদন করে পাহাড় দুটিতে লাগানো হয়েছে। প্রতিনিয়ত আমরা গাছগুলোর পরিচর্যা করছি। পাশাপাশি আরও গাছ লাগানোর কাজ চলছে।

ইনস্টিটিউটের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নুর আলী বলেন, স্থানীয় প্রজাতির বৃক্ষ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। সেগুলোকে সংরক্ষণ করতেই এই বন গড়ে তোলা। এটাকে বলা হয়, ‘বীজ ব্যাংক’। জনসাধারণ অনেক প্রজাতির নাম, উপকারিতা সম্পর্কে জানেন না। তাদের জানাতে পারলে অনেকেই স্থানীয় প্রজাতি রোপণে আগ্রহী হবেন। সঙ্গে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি ফের প্রতিস্থাপিত করা যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, বর্তমানে ক্যাম্পাসের মোট আয়াতনের পাঁচশ একরের মতো বনভূমি রয়েছে। ২৮৮ প্রজাতির ছোট-বড় তিন লাখ ৮০ হাজার বৃক্ষ রয়েছে। তবে ১৯৮২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দেশীয়, বিলুপ্তপ্রায়, বিপন্ন, ফলদ, বনজ ও ঔষধি মিলিয়ে ৩০০ প্রজাতির পাঁচ লাখ ৫০ হাজার বৃক্ষ রোপণ করা হয়। প্রায় একযুগের ব্যবধানে এত বিপুল সংখ্যক গাছ কমে যাওয়ার বিষয়ে ইনস্টিটিউটের এক সিনিয়র শিক্ষক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছ কাটা এবং বিপুল পরিমাণ গাছ চুরি হয়ে যাওয়ার ফলে ক্যাম্পাসে গাছের সংখ্যা কমে এসেছে। পাশাপাশি পাহাড়ে আগুন দেওয়ার ফলে প্রতি বছর প্রচুর গাছ মারা যায়। লতা ও গুল্ম মিলিয়ে ৮৩৫ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে এখানে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২১৫ প্রজাতির পাখি, ১৭ প্রজাতির ব্যাঙ, ৬৫ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ আয়োজিত বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ড. মো. ফরিদ আহসান এসব তথ্য জানান। বনমোরগ, মথুরা, সবুজ তাউরা, কাঠশালিক, রেড হেডেড, ভীমরাজ, হাঁড়িচাচা, কানাকোয়া, কাবাসি, চন্দনা টিয়া, মদন টিয়া, কানাকুয়া, শিষধামা, হলদে বক, মালকোহা, পাকড়া মাছরাঙা, বসন্ত বাউরি, রুপাস নেকড, বেনেবউ, মৌটুসীসহ ২১৫ প্রজাতির পাখি রাজত্ব করে এই ক্যাম্পাসে। এ ছাড়া বন্যশূকর, সজারু, বনরুই, মায়া হরিণ, বিভিন্ন প্রজাতির সাপসহ অন্যান্য প্রাণীর দেখা মেলে। সূত্র: সমকাল

সর্বাধিক পঠিত