প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: তালেবান উত্থানে খুশির কারণ নেই, আতঙ্ক আর উদ্বেগ সর্বত্র

দীপক চৌধুরী: তালেবানরা বর্বর ও পশ্চাৎপদ হিসেবে অভিযুক্ত। আধুনিক চিন্তার মানুষ ও আধুনিক বিজ্ঞানের এ সময়ে তালেবানের এমন উত্থানে বিশে^র নেতারাও চিন্তিত। অস্ত্রবাজির উল্লাস ছিলো তালেবানের পুঁজি। আফগানের একশ্রণির কর্মকর্তার সীমাহীন দুর্নীতিই তালেবানদের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

প্রায় দুই দশক আগে “আমরা হবো তালেবান, বাংলা হবে আফগান’’ এমন স্লোগান শুনতাম ঢাকা শহরে বিভিন্ন অলিগলিতে, হঠাৎ হঠাৎ। মিছিলে হাতে গোণা কিছু লোক থাকতো। এক পর্যায়ে মায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটেও এমন স্লোগান শোনা যেতো। ওইসব সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী উচ্চমহল থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পেতো।

মূলত অতীতে বিএনপি-জামায়াতের দোসরদের মুখেই আমরা শুনেছি, “আমরা হবো তালেবান, বাংলা হবে আফগান।” এবার তালেবানের ক্ষমতা দখলে দেশের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা ওই সব সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী কিছুটা উল্লসিত হয়েছে। তারা এতোটাই উল্লসিত যে, এতোটাই আফসোস্ যে, সবকিছু তো ঠিকই আছে তাহলে কেনো এতো দেরি করছে তালেবানরা আফগানের ক্ষমতা নিতে। ভাবটা এমন যে, আফগানিস্তানে বৃষ্টি হলে এদেশ থেকে কীভাবে ছাতা ধরা সম্বব তা নিয়ে তারা স্বপ্নে বিভোর। আমি মনে করি, বর্তমান সুদক্ষ প্রশাসনের নজরে রাখতে হবে ওই মহলটির প্রকৃত তৎপরতা কী, তা নিয়ে।

নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুদের জন্য ভয়ংকর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আফগানিস্তান। তালেবানদের এমনতরো উত্থান শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাবে দেশটিকে এটাও উদ্বেগের বিষয়। নব্বইয়ের দশকে যখন তালেবান ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা কট্টরপন্থী শাসনব্যবস্থা চালু করেছিল। নারীদের সবাইকে বোরখা পরতে বাধ্য করা হচ্ছে। বাড়ি বাড়ি লুটপাট-ভাংচুর-তল্লাশী সর্বক্ষণ। টিভিতে বিমানের যে দৃশ্য দেখা গেলো বা সীমান্ত অঞ্চলে যেসব দৃশ্য নজরে এলো তাতে প্রশ্ন জাগে, নিজের দেশ ছেড়ে পালায় মানুষ পৃথিবীতে কী এমন দেশ আছে? ছিল না। সাম্প্রদায়িকতাকে আধুনিক বিশ^ ভীষণ অপছন্দ করে। নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে যেখানে সেখানেই সাম্প্রদায়িগোষ্ঠী দুষ্ট বীজ বুনে দিচ্ছে। তারা নারীপ্রধান সরকারের ঘোরবিরোধী। তারা যেকোনো ষড়যন্ত্রের সঙ্গে থাকে শুধু ক্ষমতা দখলের আশায়। কোনো যুক্তিই তাদের কাছে বোধগম্য নয়। কৃতজ্ঞতাবোধ, পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা এবং আতিথেয়তা সাম্প্রদায়িক অপশক্তির অভিধানে নেই।

এই কয়েকমাস আগের কথা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম এলাকায় ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দল ও সংগঠনের বিক্ষোভে বাংলাদেশকে আফগানিস্তানে পরিণত করার হুমকি দেয়া হয়েছিল। সেখানে নিজেদের তালেবানের মতো জঙ্গিতে রূপান্তরের কথাও জানানো হয়। বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে শুক্রবার জুমার নামাজের পর এই বিক্ষোভ হয়। মাইক হাতে একজনের বক্তব্য সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। একবক্তা বলেছিলেন, মোদি বাংলাদেশে এলে তারা সন্ত্রাসে পরিণত হবেন। ওই বক্তা বলেছিলেন, ‘যদি মোদিকে আসতে দেয়া হয়, তাহলে আমরা সবাই সন্ত্রাসে পরিণত হব।’

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে সরকার। ২৬ মার্চ তিনি আসেনও। আমন্ত্রণ কার? সরকারের। সুবর্ণজয়ন্তীতে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি প্রথম কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঢাকার বাইরেও এসেছেন মোদি। টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি সেখানকার ওড়াকান্দি ও সাতক্ষীরায় দুটি মন্দির পরিদর্শন ও পূজা করেন। ওরা কিন্তু ভারতীয় সরকারপ্রধানের সফর ঠেকিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু পারেনি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, আফগানিস্তানে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের অংশগ্রহণে তালেবান জঙ্গিরা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। এক পর্যায়ে ৯০ দশকের শেষ দিকে তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাও দখল করে নেয়। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে বিমান হামলার পর আফগানিস্তানে জঙ্গিবিরোধী অভিযান শুরু করে বিশ্বের খ্যাতিমান প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র। সে সময়ও ওই রাজনৈতিক দলের নেতারা ‘আমরা হব তালেবান, বাংলা হবে আফগান’ স্লোগান দিয়ে সভা সমাবেশ করে। তৎকালীন বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের নেতা ফজলুল হক আমিনী ঢাকার পল্টন ময়দানে হাতে তলোয়ার নিয়ে উপস্থিত হয়ে এই স্লোগান দিয়েছিলেন। তবে তালেবান জঙ্গিরা পরে কোণঠাসা হয়ে গেলে ওরা চুপ হয়ে যায়।

সাম্প্রদায়িক শক্তির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল আগেই। ৯০-এর দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের উপর সশস্ত্র আক্রমণ করা হয়। হরকাতুল জিহাদের সদস্যদের উত্থান ঘটে বিএনপি-জামায়াতের সমর্থনে। ১৯৯৯ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকায় কবি শামসুর রাহমানের বাড়িতে তার উপর হামলা, ২০০৩ সালের ২৩ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার সভাস্থলে বোমা স্থাপন করা, ২০০১ সালের (পহেলা বৈশাখে )১৪ এপ্রিল রমনার বটমূলে বোমা হামলা, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে একসঙ্গে সিরিজ বোমা হামলা চালানো হয়। বিক্রমপুর-মুন্সীগঞ্জ ছাড়া ৬৩ জেলায়। জামায়াত বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান তখন এটাও প্রমাণিত হয়। ওই হামলার মাধ্যমে জেএমবি তাদের শক্তির মহড়া দেয়। মানুষকে বোমা, গ্রেনেড মেরে হত্যা করে ফেলা হয়। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, ২০০৪ সালে সিলেটে হযরত শাহজালাল মাযার শরীফ যিয়ারতকালে সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর বোমা হামলা, ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জের বৈদ্যেরবাজারে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালিয়ে হত্যা, লেখক হুমায়ুন আজাদকে ছুরিকাহত করা হয়। আমরা সবসময়ই দেখেছি, সুযোগ পেলেই মূলত সাম্প্রদায়িক অপশক্তির উত্থান ঘটে।

যশোরে উদীচীর সম্মেলনে হামলা, গোপালগঞ্জের বানিয়ারচর অ্যাটাক, পুরানা পল্টনে সিপিবি’র সমাবেশে হামলা, নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা, সিলেটে হযরত শাহজালাল মাযার শরীফ-এ বার্ষিক ওরশ চলাকালে হামলা, বাগেরহাটে শেখ হেলালের জনসভায় মুফতি হান্নানের পরিকল্পনা ও নির্দেশে ইসলামি জঙ্গিরা বোমা-বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল বলে গোয়েন্দারা তথ্য পান।

তাই আশঙ্কা করা হচ্ছে, বর্তমান সময়ে আফগানিস্তানে তালেবানের এ উত্থানে সাম্প্রদায়িকগোষ্ঠী নানারকম চক্রান্তে লিপ্ত থাকতে পারে। সুতরাং কঠোর দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট–এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গত দেড়-দুই বছরে তালেবান নেতৃত্ব আফগান কর্মকর্তাদের সঙ্গে উৎকোচের বিনিময়ে যুদ্ধ না করার আপস ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ওয়াশিংটন পোস্ট–-এর তথ্য অনুযায়ী তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে বিরত থাকার জন্য আফগান বাহিনীর সৈন্যদের প্রত্যেককে ১৫০ ডলার পর্যন্ত উৎকোচ প্রদান করা হচ্ছিল। তাড়াতাড়ি পাততাড়ি গোটানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রবল সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছেন, এমনকি তার নিজ দলের নেতাদের পক্ষ থেকেও। ভাবা হচ্ছে, কাবুল বিপর্যয়ের কারণে বাইডেনকে কড়া মূল্য দিতে হতে পারে। মার্কিনরা নিজেদের অজেয় দেখতে ভালোবাসে। অনেক আমেরিকাবাসী মনে করেন, দেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে না। বাইডেনের জন্য নতুন মাথাব্যথা হিসেবে যুক্ত হলো আফগানিস্তান। ক্ষমতা গ্রহণের পর তালেবান যদি আগের অভ্যাসে ফিরে যায়, মানবাধিকার লঙ্ঘন করে ও নারীর মৌলিক অধিকার খর্ব করে, তা বাইডেনের জন্য কলঙ্ক হিসেবেই চিহ্নিত হবে। তালেবানদের ব্যাপারে যতই সমাজের কিছু ব্যক্তি ‘সাফাই’ গাওয়ার চেষ্টা করুক না কেন তা কখনো বিশ্বাসীর কাছে বিশ্বাস্য হবে না এমন কথা বলেছেন রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা। তালেবান নৃশংসতার উদ্বেগে নারীরা। নারী ফুটবলার, সাধারণ নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুরা।

সবশেষে নিরাপত্তা ইস্যু। তালেবানের বিজয় নিয়ে প্রায় সব নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞই প্রচণ্ড উদ্বেগ ব্যক্ত করেছেন। তাদের এ উদ্বেগ যুক্তিসংগত। কারণ, তালেবানদের অতীত আদর্শের সঙ্গে বর্তমানের তফাৎ কী আছে। কাবুলের মানুষ কোনোভাবেই আশ্বস্ত হচ্ছে না। প্রাণ বাঁচাতে যেভাবেই হোক, শহর ত্যাগের চেষ্টা করছে অনেকেই। শহরে ও এয়ারপোর্টে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করতে দেখা গেছে।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

সর্বাধিক পঠিত