প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে এত বাংলাদেশি ইউরোপ যাচ্ছে কেন?

নিউজ ডেস্ক: ইউরোপে এ বছর অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অধিক বাংলাদেশি প্রবেশ করেছে। যদিও বাংলাদেশে রেকর্ড ভাঙা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রয়েছে এবং মানুষের আয় বাড়ছে। তারপরেও এ বছরের জুন মাস পর্যন্ত ৩৩০০-এরও বেশি বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছে। তাদের বেশিরভাগই উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করছে। ২০১৫ সাল থেকে এই রুটগুলো দিয়ে অভিবাসন প্রত্যাশীদের সংখ্যা নথিভুক্ত করছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। তবে এ বছরই প্রথম জাতীয়তার হিসেবে অন্য সকল দেশকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশিদের সংখ্যা। নিজ দেশে স্থিতিশীলতা থাকার পরেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এতো বাংলাদেশি কেনো ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছে তার কারণ অনুসন্ধান করেছে বৃটিশ গণমাধ্যম দ্যা টেলিগ্রাফ।

ইউএনএইচসিআরের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমটির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০১৫ সাল থেকেই ইউরোপে অভিবাসন প্রত্যাশী বাংলাদেশিদের সংখ্যা বাড়ছে।

তবে ভূমধ্যসাগর দিয়ে যাত্রা করতে গিয়ে প্রায়ই তাদের মৃত্যুর মুখে পতিত হতে হয়েছে। ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তারা বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে প্রতিবছর যত মানুষ ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করছেন, গত প্রায় ৬ বছর ধরে তাদের মধ্যে শীর্ষে আছেন বাংলাদেশিরা। যদিও গত বছর অন্য বছরগুলোর তুলনায় ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশের হার কম ছিল। এর কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও কোভিড-১৯ মহামারির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তারপরও যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান, সিরিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়া ও মরক্কোর তুলনায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা ছিল বেশি।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। সেই বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বিশ্বের সব থেকে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি। যদিও সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে তবে ইসলামী সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সফল হয়েছে বাংলাদেশ। করোনা মহামারির কারণে ২০২০-২১ সালে প্রতিবেশী দেশ ভারতের জিডিপি যেখানে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে সেখানে বাংলাদেশের জিডিপি বাড়ার সম্ভাবনা আছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশ এখন ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশ হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে।

এ বছর ভূমধ্যসাগরে এক হাজারেরও বেশি অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। জুলাই মাসে প্রায় ৬০ বাংলাদেশির মৃত্যু হয় নৌকা ডুবে। অনেকেই মনে করেন জলবায়ু পরিবর্তনই মূলত এই অভিবাসন প্রত্যাশার কারণ। বিশ্বের যে রাষ্ট্রগুলোকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রথম শিকার বিবেচনা করা হয় তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের দুই তৃতীয়াংশই সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৫ মিটারের কম উঁচুতে বাস করেন। ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের প্রতি ৭ জনের ১ জন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্থানচ্যুত হবেন। এরই মধ্যে প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষ রাজধানী ঢাকায় আশ্রয় নিচ্ছে। তারা এর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছেন।

ইউরোপে বসবাস করা মানেই উন্নত জীবন, বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে এমন একটি ধারণা বদ্ধমূল থাকাকে প্রতি বছর ইউরোপে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে মনে করেন বাংলাদেশভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম হাসান। বিশ্বের বৃহত্তম উন্নয়ন সংস্থার এই কর্মকর্তা টেলিগ্রাফকে বলেন, বাংলাদেশের সিলেটসহ কিছু জেলার মানুষের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা আছে। সেটি হলো- আপনি যদি কোনোভাবে ইউরোপে যেতে পারেন, তাহলেই জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে যারা অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের জন্য রওয়ানা হন, তাদের অধিকাংশের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে এবং তাদের একটি বিপুল অংশ লিবিয়া থেকে নৌপথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশের চেষ্টা করেন উল্লেখ করে শরিফুল হাসান বলেন, আমরা এই যুবকদের বার বার বোঝানোর চেষ্টা করেছি- এটা কোনো স্বপ্নপূরণের যাত্রা নয়; বরং মৃত্যু অভিমুখে যাত্রা। কিন্তু তারা এসব কথায় কান দিতে প্রস্তুত নন।

চট্টগ্রামের বাসিন্দা আলফাই আলি হোসেন সজীব (২৩) জানিয়েছেন তার স্বপ্নভঙ্গের কথা। দ্য টেলিগ্রাফকে তিনি বলেন, নির্মাণশিল্পের কাজে যোগ দিতে ক্রোয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য এক দালালকে এককালীন ৬ হাজারেরও বেশি ইউরো (৫ লাখ ৯৭ হাজারেরও বেশি টাকা) দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দেশটির রাজধানী পৌঁছানোর পর ওই দালালচক্রের অপর সদস্যরা তাকে একটি কক্ষে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের যাত্রীদের সঙ্গে বন্দি রেখেছিল। টেলিগ্রাফকে সজীব বলেন, তারা আমাকে আরও আড়াই লাখ টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দিচ্ছিল। প্রতিদিন তারা আমাকে নির্যাতন করতো, মারধর করতো এবং খাবারও দিতো অনিয়মিত। পরে তাকে উদ্ধার করে আইওএম।

শরিফুল হাসান বলেন, যারা কোনোভাবে ইউরোপে অনুপ্রবেশে সক্ষম হয় এবং সেখানে কাজ জোটাতে পারে, তারা দেশে টাকা পাঠায়। সেই টাকায় তার পরিবারের সদস্যরা স্বচ্ছল জীবনযাপন করে, আবাসিক ভবন তৈরি করে। অধিকাংশ মানুষ এই চাকচিক্য দেখে প্রভাবিত হয়। কিন্তু বিপুলসংখ্যক অনুপ্রবেশকারী যে যাত্রাপথে মারা যায়, কিংবা সেখানে প্রবেশের পর কাজ না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে; সেসব ঘটনা এই মানুষেরা গুরুত্ব দেয় না।

প্রতিবছর ইউরোপে যেসব বাংলাদেশি প্রবেশ করেন, তাদের প্রায় সবাই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক আহমেদ মুশফিক মোবারক। টেলিগ্রাফকে তিনি বলেন, ইউরোপে প্রবেশের জন্য প্রচুর টাকাপয়সা খরচ করতে হয় এবং পরিবার সেই টাকার যোগান দেয়। এ থেকে সহজেই ধারণা করা যায়, এই অনুপ্রবেশকারীদের প্রায় সবাই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। তারা এই বিষয়টিকে দেখছে একপ্রকার বিনিয়োগ হিসেবে। আগে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবার জমি বা বাড়ি নির্মাণের জন্য অর্থলগ্নি করতো, এখন তারা নতুন খাত হিসেবে ইউরোপ প্রবেশকে বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকরা যদিও বরাবরই বলে আসছেন, দারিদ্র্যের কারণে এই প্রবণতা বাড়ছে এবং দেশে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়লে এটি কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক তৎপরতা ও উন্নয়ন যেমন বাড়ছে, সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রতিবছর ইউরোপে অবৈধ অনুপ্রবেশের হারও।

বিষয়টি সমাধানে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন উল্লেখ করে শরিফুল হাসান টেলিগ্রাফকে বলেন, বাংলাদেশের মানুষদের সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের সমন্বয় প্রয়োজন। পাশাপাশি, দালালদের ও ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সির সদস্যদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। পরস্পরকে দোষারোপ না করে ইউরোপ এবং বাংলাদেশ- উভয়কেই এ বিষয়ে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। শরিফুল হাসান বলেন, সবাই কারো না কারো সফলতার গল্প শুনেছে। অভিবাসীদের অর্থে গ্রামগুলোতে বড় বড় বাড়ি নির্মিত হতে দেখেছে তারা। যারা ইউরোপে গিয়েছিল এবং পরিবারকে অর্থ পাঠিয়েছে। কিন্তু কেউ সেই মানুষগুলোর কথা শুনে না যারা যাত্রাপথে প্রাণ হারিয়েছেন কিংবা যাদের ইউরোপে গিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করতে না পেরে ফিরে আসতে হয়েছে। সূত্র: মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত