প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাসুদ রানা: বাংলার ‘আদিবাসী’ কারা?

মাসুদ রানা: বাংলাদেশে ৪৪টি বা এর কাছা-কাছি সংখ্যক জাতিসত্তার নাম, ভাষা ও সংস্কৃতিকে তাঁদের নিজস্ব নামে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত না-করে ‘আদিবাসী’ নাম দিয়ে নির্দেশ করা হচ্ছে তাঁদের আদি আত্মপরিচয় ভুলিয়ে দিয়ে নতুন আত্মপরিচয়ে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা একটি ভুল প্রয়াস। আমি দুঃখিত যে, অনেকেই না বুঝেই ‘আদিবাসী’ শব্দবন্ধটির ভুল ব্যবহার করে থাকেন এবং এমনকি এ-নামে আত্মপরিচয়ও দিয়ে থাকেন।

‘আদিবাসী’ বলতে বুঝায় একটি দেশের সে-জনগোষ্ঠী, যারা আদি থেকে সে-দেশের অধিবাসী। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যাণ্ড ও কানাডাতে প্রধান স্রোতধারার মানুষেরা মূলত ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত, যারা ঐ দেশগুলোতে গিয়ে উপনিবেশ স্থাপন করে, সেখানে আদি থেকে বাসকরা যে মানুষদেরকে গণহত্যা ও খাদ্যবঞ্চনা-সহ নানা কৌশলে সংখ্যায় হ্রাস করেছিলো এবং দাসে পরিণত করেছিলো, তাঁরাই হচ্ছেন আদিবাসী।

বাঙ্গালা বা বাংলা নামের দেশটির আদিবাসী কারা? পাঠককে এ-প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে বলে আমি প্রাসঙ্গিক দ্বিতীয় প্রশ্নটি করছিঃ বাঙালীরা কি বাংলার আদিবাসী নয়? আপনারা যাঁরা বাংলা নামের দেশটিতেই বাঙালী জাতিকে আদিবাসী বলত চান না, তারা কি বলবেন এ-বাঙালী জাতির লোকেরা কোন দেশের লোক বা আদিবাসী?

একটি ভাষাজনজাতিকে তো আর কারখানায় বানানো হয় না, তাদের উৎপত্তি তথা আদি কোনো না কোনো দেশেই থাকে। যেমন, ইংল্যাণ্ডে আমরা বাঙালী জাতির লোক আছি, কিন্তু এ-দেশ আমাদের আদি দেশ নয়। ইংল্যাণ্ড হচ্ছে আপেক্ষিক অর্থে ইংরেজদের আদি দেশ। তো আমাদের আদিদেশ কোনটি? উত্তর হচ্ছেঃ আমাদের আদিদেশ হচ্ছে বাংলা, বর্তমানে যেটিকে প্রধানতঃ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ বলা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছেঃ বাংলাদেশের বাঙালীদেরকে যারা আদিবাসী মানেন না, তাঁদেরকে বলতে হবে, বাঙালীদের আদিদেশ যদি বাঙ্গালা বা বাংলা না হয়, তাদের আদিদেশ তবে কোনটি?

ধরা যাক, আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম অনেকটা পনেরো শতকের স্পেইনের মতো যে, আদিবাসী ছাড়া সবাইকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে তাদের আদিদেশে পাঠিয়ে দেবো।স্বভাবতঃ প্রশ্ন হবে, কোন দেশে পাঠাবো এ-বাঙালী জাতিকে? কোনটি তাদের আদিদেশ? আদিবাসী বলে পরিচিত বাংলাদেশের মোটামুটি ৪৪টি জাতির মধ্যে প্রধানতম ও সর্বাধিক উল্লেখিত হচ্ছে চাকমা জাতি। তো, চাকমা জাতি কি বাংলাদেশের আদিবাসী? যদি তাই হতো, ধারণা করি, বাংলাদেশের নাম সম্ভবতঃ হতো চাকমাদেশ কিংবা চাকমা ভাষায় কোনো একটি নাম।

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিট্যানিকা জানাচ্ছে, চাকমা জাতি হচ্ছে প্রাচীন ভারতের মগধ রাজ্যের আদিবাসী, যারা পরবর্তীতে বার্মায় অভিবাসিত হয় এবং পরে আরকান বা আজকের রাখাইন হয়ে রোহিঙ্গাদের (রোহিঙ্গারা আসলে বাঙালী) মতোই সেখান থেকে উচ্ছেদিত হয়ে বাংলায় আশ্রয় লাভ করে। চাকমা জাতির ওপর বাংলাদেশী জাতীয়তবাদের নামে যে-নির্যাতন করা হচ্ছে, আমি এর বিরুদ্ধে যে-কোনো পর্যায়ে লড়তে প্রস্তুত আছি। আমি বলবো, পাকিস্তানীরা বাঙালীর ওপর যেভাবে মুসলিম পাকিস্তানী জাতীয়তবাদের নামে নির্যাতন চালিয়েছিলো, প্রায় সেভাবেই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নামে চাকমাদের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে বলে আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পাই। কিন্তু সেটি একটি ভিন্ন প্রসঙ্গ, যা বর্তমান পৌস্টের প্রতিপাদ্য নয়।

আমি বলতে চাইছি, চাকমা জাতিকে বাংলার আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে এ-ইতিহাস জানার পরও যে, বাংলায় আসার আগে তাঁরা ছিলেন আরাকানে, আরাকানের আগে বার্মাদেশে, এবং তারও আগ প্রাচীন ভারতের মগধ রাজ্যে। ধারণা করা হয়, সর্বোচ্চ মাত্র ৪/৫শ বছর আগে চাকমা জাতির লোকেরা বাংলায় অভিবাসী হন। তাদেরকে মোটেও আদিবাসী বলা যৌক্তিকও সমীচীন নয়।

একইভাবে মনিপুরী জাতির লোকেরা, ত্রিপুরা জাতির লোকেরা, ও নাগা জাতির লোকেরা বাঙ্গালায় বা বাংলায় অভিবাসী হয়ে এসেছে যথাক্রমে ভারতের মনিপুর, ত্রিপুরা, নাগাল্যাণ্ড রাজ্য থেকে। তাঁরা ঐ দেশের আদিবাসী, এবং তাঁদের জাতি নাম ঐ দেশের নামেই পরিচিত, যেমনিভাবে বাঙ্গালী বা বাঙালী জাতি পরিচিত বাঙ্গালা বা বাংলার নামে পরিচিত। তাই, বাঙালীদের বাদ দিয়ে মনিপুরী কিংবা ত্রিপুরা জাতির লোকদেরকে বাংলার আদিবাসী বলা ঠিক হবে না।

অন্যদিকে সাঁওতাল জাতির মতো অনেক জাতিও আছে, তারা বাংলার প্রাচীনতম অধিবাসীদের একটি। কিন্তু তাঁরা “আদিবাসী” বলে নয়, বরং নিজস্ব নামেই আত্মপরিচয় দিয়ে থাকেন। আমি প্রতিটি জাতির নিজস্ব নামে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পক্ষে। আমি চাই, চাকমা ভাষা থেকে শুরু করে, সাঁওতালী ভাষা, গারো ভাষা, মনিপুরী, বাঙালী জাতি, সবাই তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে আত্মপরিচয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হোক।

বস্তুতঃ বাঙালী মোটেও কোনো বহিরাগত জাতি নয়, এবং তারা কোনো রেইসও নয়। বাঙালী হচ্ছে আদিবাসী বিভিন্ন জাতির সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা বাঙ্গালার ভাষাজনজাতি, যাদের পরিচয়ের ভিত্তি হচ্ছে বাঙ্গালা দেশ ও বাঙ্গালা ভাষা। ফলে, বাঙালী হচ্ছে বাঙ্গালার আদিবাসী।

বাঙালী, চাকমা, গারো, সাঁওতাল, মনিপুরী, ত্রিপুরা কিংবা নাগা যারাই বাংলাদেশের নাগরিক তাদের সকলের অধিকার সমান। প্রত্যেকেরই জাতিগত আত্মপরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি-সহ বাংলাদেশ রিপাবলিকের সমস্ত ক্ষেত্রে সমান অধিকার ধারণ করেন।

আমি মনে করি, তাঁদের কারও উচিত নয় জাতিগত আত্মপরিচয় ভুলে নতুন-করে উদ্ভাবিত কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক আরোপিত নাম নিয়ে আত্মবিস্মৃত হওয়া। আত্মপরিচয় ভুলে নয়, বরং আত্মপরিচয় ঊর্ধ্বে তুলে ধরে সকল জাতির সাথে সৌহার্দ্য ও সম-মর্যাদের ভিত্তিতে সহযোগিতার মধ্য দিয়ে জাতিগত আত্মপ্রতিষ্ঠা ও অধিকারের সংগ্রাম করা। লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত