প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

লকডাউনে বিপাকে ফরিদপুরের দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষ

হারুন-অর-রশীদ: একদিকে দেশজুড়ে লকডাউন অপর দিকে করোনা মহামারির আতঙ্ক। এ যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা।

ভূমিহীন এক ক্ষুদ্র ফুটপাত ব্যবসায়ী কুদ্দুস মিয়া জানালেন, আজ অনেকদিন হলো রাস্তায় বসতে পারছেন না। তার ফুটপাতের খাবারের দোকানটি প্রশাসন বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। তাই সে আর বিক্রি করতে পারছেনা। অথচ তার সামান্য এই দোকানের ক্ষুদ্র আয়ে চলে তার পরিবারে বৃদ্ধা মাসহ তার ৪-৫ জনের সংসার।

তিনি জানালেন, একদম বেকার হয়ে গেছি আর দুদিন এভাবে চলতে থাকলে পেটে ভাত জুটবেনা। না খেয়ে মরতে হবে।

এদিকে আর এক অসহায় মালেকা খাতুন নামের এক মহিলা জানালেন, আমি খাবারের হোটেলসহ ডেকোরেটরে কাজ কাম করে খাই কিন্তু এখন কাজকাম সব বন্ধ কি করে যে চলবো ভেবে পাচ্ছি না। আমার ছেলেটাও বেকার হয়ে গেছে সে কিছু ঋণদিনা আছে, সামনে দিন কিভাবে কাটবে ভেবে সারারাত ঘুমাতে পারছি না।

করিম,ছুরমান,বাচ্চুসহ কয়েকজন রিক্সাচালক জানান, আমরা দিন আনি দিন খাই, না আনলে না খেয়ে থাকতে হয়। রিক্সা যদি রাস্তায় বের করতে না পারি তাহলে আমরা খাবো কি?

এদিকে রিক্সা চালক লিটন মোল্যা বলেন, আমার চারটা বাচ্চা। সাথে ঘর ভাড়া। আমি রিক্সা না চালাতে পাড়লে না খেয়ে থাকে পরিবার।পেটের দায়ে ভয়ে ভয়ে তবুও রিক্সা নিয়ে বের হয়েছি।

ইজিবাইক চালক রবিন মোল্লা জানায়, অনেকেরই কিস্তির মাধ্যমে এই বাইকগুলো কেনা হয়েছে। এখন আমরা উপার্জন করতে না পারলে কিভাবে কিস্তি পরিশোধ করবো ও পেটের অন্ন যোগাবো?

অপর আটো চালক কামাল মাতুব্বর জানান, লকডাউনের কারণে গাড়ি নিয়ে বের হতে পারছিনা। পোলাপাইনদের নিয়ে বেঁচে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, সরকারের পাঁশাপাশি সমাজের জনপ্রতিনিধি ও বিত্তবানরা যদি এগিয়ে আসতো তবে কিছুটা হলেও দুর্ভোগ লাঘব হতো।

চায়ের দোকানদার হাবিব শেখ অনেকটা কান্নাস্বরে মনের কষ্টগুলো ব্যাখ্যা করে বলেন, চায়ের দোকানের উপর আমার পরিবারের ভরণ-পোষণ চলে, দোকান বন্ধ, কিভাবে বাঁচবো? না খেয়ে মরে যেতে হবে।

সি এন্ড বি ঘাটে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার দূর-দুরান্ত থেকে আসা কয়েকজন ঘাট শ্রমিকরা জানায়, আমরা জেলার বিভিন্ন ঘাটে কাজ করি, ব্যাচেলার হিসেবে ঘরভাড়া করে থাকি। যদি কাজ করতে না পারি তাহলে আমরা খাবো কি? ঘরভাড়া দিবো কিভাবে? তাছাড়া গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী, ছেলে মেয়েরা আমাদের মুখপানে চেয়ে থাকে কখন বিকাশে টাকা পাঠাবে।

এদিকে বিভিন্ন লোকের সাথে কথা বলে ও অনুসন্ধান করে জানা যায়, মহামারী করোনাকালে এমনিতে মানুষের আয় কমে গেছে, কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় ও চলাচলে বাঁধা নিষেধ আরোপ করায় চরম সংকটে হাবুডুবু খেতে হচ্ছে দিনমুজুর, রিক্সা-ভ্যান চালক, দোকান ও ঝাল মুড়ি বিক্রেতার মত অসংখ্য মানুষকে।

করোনার শুরুতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন, প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ে ও গরীব খেটে খাওয়া মানুষের সহায়তায় অনেকেই এগিয়ে আসলেও এখন সরকার ও কিছু মুষ্টিমেয় সংগঠন ছাড়া তেমন কাউকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি।

লকডাউনের শুরুতে অর্থ ও খাদ্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছিল, কিন্তু এখন করোনা সংক্রমনের ঢেউ বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও লকডাউন বিধি নিষেধ দীর্ঘ হলেও কেউ আর তেমন ভাবে এগিয়ে আসছেন না প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের সহায়তায়। ফলে তাদেরকে ঝুঁকি নিয়েই পেটের টানে বের হতে হচ্ছে ঘরের বাইরে। সেখানে আয়ের নিশ্চয়তা না থাকলেও হয়রানি, শাস্তির অভাব নেই, এমনিতে কাজ নেই বললেই চলে, অটো রিকশাচালকে যাত্রী পেলেও নানা ঝামেলার শেষ নেই।

এ অবস্থায় সামনে দীর্ঘ কঠোর লকডাউনে কি হবে সে চিন্তায় চোখে অন্ধকার দেখতে হচ্ছে তাদেরকে। মহামারি করোনা মোকাবিলায় গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টার শেষ নেই। দফায় দফায় লকডাউনের পাঁশাপাশি নমুনা পরীক্ষা, চিকিৎসায় সর্ব শক্তি নিয়োগ করেও সামাল দিতে কঠিন হয়ে উঠেছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ডভঙ্গ হচ্ছে প্রায়ই।
আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি সঠিকভাবে মেনে চলা হলেও এখনো অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ঢিলে-ঢালা অবস্থা বিপদের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। শহর থেকে গ্রামে, সীমান্ত পেরিয়ে যেভাবে ছড়াচ্ছে তা আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে।

এ অবস্থায় লকডাউন সফল করার উপরেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশেই নির্ভর করছে। এজন্য গরিব হতদরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষের ঘরে থাকা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ঘরে খাবার না থাকলে এটা যে আদৌ সম্ভব নয় সেটাতো জানা কথা। তাই প্রশাসন থেকে খাদ্য সঙ্কটে বা বিভিন্ন সমস্যায় ৩৩৩ নাম্বারে কল করার কথা বলা হয়েছে কিন্তু এই ঘোষণা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা চোখে পড়েনি।

সুশীল সমাজের কয়েকজন ব্যক্তির সাথে কথা হলে তারা জানান, প্রান্তিক পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি রাজনীতিবিদ, মসজিদের ইমাম, স্কুল শিক্ষক, সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন, পাড়া মহল্লার ক্লাব ও ছাত্রদের সমন্বয়ে খাদ্য ও অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তার কথা প্রচার করে এবং সুষ্ঠুভাবে সহায়তা দানের ব্যবস্থা করা হলে লকডাউনে মানুষের ঘরে থাকা পুরোপুরি নিশ্চিত করা যেতে পারে। এজন্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ একান্ত জরুরী।

জেলা প্রশাসন বলছে, লকডাউনে অসহায় ও দিনমজুরদের জন্য সরকারের দেওয়া ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া ৩৩৩ নম্বরে কল করলেও তাৎক্ষণিক খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত