প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: বিধিনিষেধে তৎপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, অতঃপর

দীপক চৌধুরী: করোনায় রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু বেড়েই চলেছে তবুও নানা অজুহাতে মিথ্যে তথ্যের মাধ্যমে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘোরাফেরা ও যাতায়াত চলছেই। এটা কী চোর-পুলিশ খেলা! যেনো সকল নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সড়কে, রাস্তায়, অলি-গলিতে চলছে ঘোরাফেরা। মহাসড়কের পথে আগন্তুক কোনো যাত্রীকে ঢাকামুখী হবার কারণ জিজ্ঞেস করলে উত্তর আসে, ‘না গেলে খামু কী?’ খুব সহজ উত্তর ! আমরা জানি সকল সরকারি-বেসরকারি অফিস কারখানা বন্ধ। তবুও কেনো ঢাকা আসা চাই! কথা শুনে মনে হবে, কেউ খাবার তৈরি করে রেখেছে ঢাকায়। গিয়েই তৈরি খাবার মুখে দেওয়া যাবে। প্রতিদিনই মৃত্যুর হৃদয়বিদারক খবর আমরা শুনছি, গণমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে। এরপরও ধৈর্য্য আমাদের নেই। যারা অতিপ্রয়োজনে শহর থেকে গ্রামে বা গ্রাম থেকে শহরে যাচ্ছেন, যাদের ঘর থেকে বেরোনোর প্রয়োজনীয়তা জরুরি- তারা তো ঘরের বাইরে যাবেনই। এতে কারো আপত্তি নেই।

কিন্তু সড়ক-মহাসড়ক, শহর-উপশহর বা মেট্রোপলিটন শহরে যা দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মানানো যাচ্ছেই না। আইন অনুযায়ী জরিমানা করা হচ্ছে, নানারকম জেরার মুখে পড়তে হচ্ছে। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি না মানার কোনো যুক্তিসংগত জবাব নেই এমন যাত্রী বা মানুষের সংখ্যা অনেক অনেক অনেক বেশি। এমন কী শুধু চলাফেরা নয়, করোনার ভ্যাকসিন নিতে এসেও স্বাস্থ্যবিধির দিকে নজর নেই। ক্রমেই যে, করোনা বাড়ছে তাতে গা শিহরিত হয়ে ওঠার কথা। দেখলাম, টেলিভিশনে চিকিৎসকরা কথা বলে সাংবাদিকদের জানাচ্ছেন, ‘গ্রাম থেকে রোগী আসছে প্রতিনিয়ত।’ শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, বিভাগীয় বিভিন্ন বড়বড় হাসপাতালে রোগীর চাপ মারাত্মক হারে বাড়ছে। সিট পাওয়া যাচ্ছে না।

করোনা রোগী ভর্তির জন্য সিট নেই। গত ২২ জুলাই মৃত্যু হয়েছে ১৮৭ জনের, ২৩ জুলাই মৃত্যু হয়েছে ১৬৬ জনের, ২৪ জুলাই মৃত্যু হয়েছে ১৯৫ জনের, ২৫ জুলাই মৃত্যু হয়েছে ২২৮ জনের, ২৬ জুলাই মৃত্যু হয়েছে ২৪৭ জনের, ২৭ জুলাই মৃত্যু হয়েছে ২৫৮ জনের, ২৮ জুলাই মৃত্যু হয়েছে ২৩৭ জনের। গতকালের হিসেবে প্রতিদিনই বেশি রোগীর দেহে সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। গত ১৬ মাসের মধ্যে এই প্রথম এক দিনে রোগী শনাক্তের সংখ্যা ১৬ হাজার ছাড়াল। এর মধ্য দিয়েই দেশে মোট শনাক্ত করোনা রোগীর সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়েছে। মোট মৃত্যু ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবরের পাশাপাশি মৃত্যু বাড়ছেই। বিশ্বে ৪২ লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। বাংলাদেশে মাস্ক না পরার ভয়ংকর চিত্র দেখছি আমরা। গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হলেও কারো হুঁশ হচ্ছে না যেনো। করোনা হাসপাতালে আইসিইউ নেই, এটা পুরান খবর। ভয় না পাওয়ার ও সতর্কতা অবলম্বন না করার কী কারণ থাকতে পারে সংশ্লিষ্টরাও এর ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না। আবার কোথাও কোথাও বিধিনিষেধে তৎপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এটা দেখা গেলেও অতঃপর ঢিলেমি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কেন, কঠোরতা নেই!

ছেলের জন্য আইসিইউ বেড ছেড়ে দিয়ে আজ এক ঘণ্টা পর মায়ের মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রামে। মা ও ছেলে দু’জনেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন হাসপাতালে। মায়ের অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে নেওয়া হয় ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ)। আইসিইউ বেডে মৃত্যুশয্যায় থাকা মা শোনেন ছেলের অবস্থাও খুব খারাপ। তারও আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন। ছেলের প্রয়োজনে মা ইশারা দিয়ে চিকিৎসককে বলেন, তাকে বাদ দিয়ে ছেলেকে যেন আইসিইউ সাপোর্ট দেয়া হয়। সেখানে ঘণ্টাখানেক পরই মায়ের মৃত্যু হয়। বুধবার রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে সিট না পেয়ে মোটরসাইকেলে করে করোনায় আক্রান্ত স্ত্রী নাসরিন সুলতানাকে নিয়ে রওনা হন আবদুর জাহেদ রাজু। নাসরিনের শরীর এতটাই খারাপ লাগছিল যে তিনি ঠিকমতো দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না। মোটরসাইকেলে উঠতেই পড়ে যাচ্ছিলেন। পরে হাসপাতালে তাকে ভর্তি করানো যায়।

লকডাউন চলছে ঢিলেঢালাভাবে। কিন্তু সড়কে গণপরিবহন না চললেও অন্যান্য যান চলাচল বাড়ছেই। সেনা, পুলিশ-র‌্যাব, বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। তারা আন্তরিকতার সঙ্গে নানাভাবে মানুষকে ইতিবাচক পরামর্শ দিচ্ছেন। ঘরে থাকা ও বাইরে বের হলে মাস্ক পরার কথা সর্বত্র বলা হচ্ছে কিন্তু কেউই যেনো শুনতে চাইছেন না এসব পরামর্শ। এটা কী মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানোর প্রতিযোগিতা? যুদ্ধ করে তো মানুষকে সুপরামর্শ মানানো যায় না। ‘কঠোর লকডাইন’ কীভাবে কঠোর করা যায় এটা ভাবা জরুরি!

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

সর্বাধিক পঠিত