প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নির্মলেন্দু গুণ: ঘড়ির গল্প

নির্মলেন্দু গুণ: আমি ঘড়ির দোকানীকে ফোন করে বললাম, ‘ভাই, এতো দাম দিয়ে ঘড়িটা কিনলাম, কিন্তু এটাওতো দেখছি ঠিকমতো সময় দিচ্ছে না। আগে তো ছয়টায় সূর্য ডুবতো, এখন দেখছি সাতটাতেও সূর্য ডোবার নাম নেই। এটা কেমন হলো, আপনিই বলেন। আমি কেষ্টাকে দিয়ে ঘড়িটা পাঠিয়ে দিচ্ছি, একই দামের ভেতরে আপনি এটার বদলে অন্য একটা ঘড়ি দিয়ে দেন।’ দোকানী একটু রাগতস্বরে বললো, ‘স্যার কিছু মনে করবেন না। ঘড়ি তো আপনি অনেক বদলালেন, এবার দয়া করে একটু সময়টা বদলান। আমার ঘড়ি ঠিকই আছে। টিক টিক শব্দ করে চলছে তো? চলছে না?’ আমি বললাম, ‘তা চলছে। শব্দও করছে। কিন্তু আপনের এই শব্দ শোনার জন্য তো আমি ঘড়ি কিনিনি।’ দোকানী বললো, ‘তাও ঠিক। কিন্তু স্যার, আমার মনে হইতেছে সমস্যাটা ঘড়ির মধ্যে না, আসলে সমস্যাটা হচ্ছে আপনার সময়ের মধ্যে। আর তা ছাড়া… ’ ‘তা ছাড়া কী? থামলেন কেন, কন?’ ‘কমু? মাইন্ড খাইয়েন না, স্যার। আপনের মাথার মধ্যেও কিছু… হাহাহাহা।’ দোকানীর উচ্চকণ্ঠ হাসি শুনে আমার পিত্তি জ্বলে গেলো। হারামজাদা বলে কিনা আমার মাথার মধ্যেও… তার পরক্ষণেই ভাবলাম, কী জানি হতেও পারে। এই করোনার মধ্যে কতোকিছুই তো হচ্ছে। সময়ই বা তার আক্রমণের বাইরে থাকবে কেন? এখন কি আর সেই আগের সময় আছে?’

করোনা-পূর্ব সময়ের কথা ভাবতেই ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানটা আমার মনের ভেতরে গুণগুণ করে উঠলো। আহ! কী গান! বাঘের বাচ্চা বাঘ। গানের সেরা গান। বেঁচে থাকো আব্দুল করিম, তুমি গ্রেট। শাহ আব্দুল করিমের গানটা আমি মনেÑ মনে গাইলাম, যাতে ভেতরের ঘর থেকে আমার স্ত্রী শুনতে না পায়। শুনতে পেলে কী হবে, কী হয়- এই প্রশ্ন করেছেন দুই-একজন। তাদপর কৌতূহল মেটানোর জন্য বলি, আমার স্ত্রীর একটা কুকুর আছে, বিদেশি কুকুর অফকোর্স। আমি গান গাইছি শুনলে তিনি তার ওই আজ্ঞাবহ জার্মান বংশজাত মস্তানটিক আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন। তখন গান বাঁচানো তো পরের কথা, আমার প্রাণ বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আমি অধিকাংশ গানই মনে মনে গাই। আজই একটু গলা ছেড়ে গানের মুখটা গাইলাম। শাহ আব্দুল করিমের এই মোক্ষম গানের কয়েকটা চরণ গাওয়ার পর আমার মনটা একটু শান্ত হলো।

আমি যে দোকানীর কথায় একটু বেকায়দায় পড়েছি, আমার নীরবতা দেখে দোকানী তা বেশ বুঝলো। আমাকে তাড়া দিয়ে বললো, ‘কী স্যার, কথা বন্ধ হয়ে গেলো নাকি? কিছু বলছেন না যে! কিছু একটা কন।’ আমি আমার পূর্বার্জিত মর্যাদা বজায় রাখার চেষ্টা করে বললাম, ‘না কথা বন্ধ হবে কেন? আপনার ঘড়ি বন্ধ হয়ে গেলেও আমার কথা ঠিকই চলছে এবং চলবে।’ দোকানী শালাও কম যায় না। বললো স্যার, আপনের কথা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু আমার এই চায়নিজ ঘড়ি কখনও বন্ধ হবে না।’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, দেখা যাবে কে আগে বন্ধ হয়?’ দোকানী বললো, ‘স্যার, ঘড়িটা কি বদলে দেবো, স্যার? একই দামের মধ্যে এরকম ঘড়ি আমার দোকানে কিন্তু আরও অনেক আছে স্যার।’ ঘড়ির দোকানীর কণ্ঠে আমি স্পষ্ট বিদ্রুপের আভাস পেলাম। বললাম, ‘না, আপনাকে ঘড়ি বদলে দিতে হবে না। আমার ওই ঘড়িটাই আমাকে পাঠিয়ে দিন। আমি দেখছি কী করা যায়।’ দোকানী বললো, আলহামদুলিল্লাহ। এর উত্তরে কী বলতে হয়, আমার সঠিক জানা না থাকায় আমি চুপ মেরে গেলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার সর্বকর্মবিশারদ কেষ্টা পুরনো ঘড়িটা নিয়ে ফিরে এসে বত্রিশ দন্ত বিকশিত করে আমাকে বললো, ‘স্যার, হারামজাদা ঘড়িটা কিছুতেই বদলাইয়া দিলো না। আমারে কয় কিনা, যা, ঘড়ি ঠিকই আছে, তোর সাহেবের সময় ঠিক নেই, মাথাও ঠিক নেই।’ ওর কথা হুইন্যা আমিতো ওই শালারে একটা চড়ই মারতে চাইছিলাম, তখন ওই বেডায় কইলো, আপনে নাকি ওর কথা মাইন্যা নিছেন? তাই আর কিছু কইলাম না।’ দেখলাম, কেষ্টার মুখে আবারও বত্রিশ দন্ত বিকশিত করা হাসি। আমি বাক্য হারিয়ে ফেললাম। ‘ঘড়ি ঠিক আছে আমার সময় ঠিক নেই, মাথা ঠিক নেই’ এই কথাটাই পিন-আটকানো রেকর্ডের মতো আমার কর্ণকুহরে কেবলই বাজতে থাকলো। কেষ্টা বুঝলো, আজ তার মনিব খুব বড় একটা ঝাপটা খাইছে। তাই অন্যদিনের মতো তাকে গালাগাল না করে চুপ করে বিছানায় বসে আছেন। আইনস্টাইনের মতো কী যেন ভাবছেন। স্যারকে চুপ করে থাকতে দেখে কেষ্টা বললো, ‘স্যার ঘড়িডা কি দেয়ালে টাঙ্গাইয়া দিমু? নাকি আপনের কবিতা লেখার টেবিলে হুতাইয়া রাখুম?’ এবার আমার ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেলো। কেষ্টার আঞ্চলিক ভাষার বিদ্রুপ আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। এবার ও যখন আমার কবিতা লেখার টেবিলটিকে সামনে নিয়ে এলো, তখন আমি বুঝে গেলাম বেতন আমি দিলেও এই শালা হচ্ছে আমার কাব্যবিদ্বেষী ইস্ত্রীর এজেন্ট। রেগে গিয়ে বললাম, ‘তোর যা খুশি তুই কর, হারামজাদা, এখন আমারে একটু শান্তিতে ঘুমাইতে দে।’ ২৮ জুলাই ২০২১। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত