প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আশীষ কুমার দে : উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ মণি সিংহের প্রতি শ্রদ্ধা

আশীষ কুমার দে: মণি সিংহ। কালের পরিক্রমায় কর্মগুণে দেশ-বিদেশে পরিচিত হয়ে ওঠেন কমরেড মণি সিংহ নামে; যে নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ঐতিহ্য, দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস, এ দেশের শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের শোষণমুক্তির আন্দোলনের গৌরবগাঁথা। মণি সিংহকে নানা বিশেষণেই বিশেষায়িত করা যায়। যেমন : মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা, ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামী, ঐতিহাসিক টংক বিদ্রোহ তথা তেভাগা আন্দোলনের মহানায়ক এবং উপমহাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ।

মণি সিংহের জন্ম ১৯০১ সালের ২৮ জুলাই কলকাতার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। তাঁর বাবার নাম কালী কুমার সিংহ, মায়ের নাম সরলা দেবী। তবে কালী সিংহ বিয়ে করেন সুসং দুর্গাপুরের রাজবংশে। মণি সিংহ মাত্র আড়াই বছর বয়সে পিতৃহীন হন। এ সময় তাঁর পরিবার কিছুদিন ঢাকায় তাঁরই এক মামা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সুরেন সিংহের বাড়িতে থাকেন। সেখানে সাড়ে চার বছর কাটানোর পর সাত বছরের মণি সিংহকে নিয়ে সরলা দেবী চলে আসেন পৈতৃকনিবাস নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরে। সেখানে ভাইদের জমিদারির অংশীদার হয়ে বসবাস শুরু করেন তিনি। মনি সিংহ সুসং দুর্গাপুরে প্রাথমিক লেখাপড়া সম্পন্ন করে মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য কলকাতায় যান।

এই সময়ে ব্রিটিশ বেনিয়াদের প্রতি তাঁর তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ জন্মে। মূলত সেই ঘৃণা ও ক্ষোভ থেকে স্কুলজীবনেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন তিনি। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা থেকে যোগ দেন ‘অনুশীলন’ দলে এবং ক্রমেই স্থান করে নেন বিপ্লবী কর্মকান্ডে। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলনের বিপুল গণজাগরণ তরুণ মণি সিংহের মনে গভীর রেখাপাত করে। সন্ত্রাসবাদী পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁর মনে সংশয় দেখা দেয়। এ সময় তিনি শ্রমিক আন্দোলন ও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে কৃষকদের সংগঠিত করতে থাকেন। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লব তথা ঐতিহাসিক অক্টোবর বিপ্লবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন তিনি।

মণি সিংহ ১৯২৫ সালে প্রখ্যাত বিপ্লবী গোপেন চক্রবর্তীর সঙ্গে আলোচনার পর মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে আদর্শরূপে গ্রহণ করেন। ১৯২৮ সাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে নিজেকে বিপ্লবী কর্মকান্ডে উৎসর্গ করেন। এ সময় তিনি কলকাতায় শ্রমিক আন্দোলনে একনিষ্ঠভাবে কাজ করতে থাকেন। ১৯৩০ সালের ৯ মে তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৩৫ সালে জেল থেকে মুক্তি পেলেও নিজ গ্রাম সুসং দুর্গাপুরে তাঁকে অন্তরীণ করে রাখা হয়। এ সময় কৃষক-ক্ষেতমজুরদের পক্ষ নিলে জমিদার মামাদের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক বিরোধ তৈরি হয়। পাটের ন্যায্য মূল্য দাবি করে কৃষকদের পক্ষে ভাষণ দেয়ার অপরাধে দেড় বছরের কারাদণ্ড হয় তাঁর।

১৯৩৭ সালে জেল থেকে বেরিয়ে এলে মণি সিংহকে জানানো হয় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেছেন। এরপর দুর্গাপুরে মায়ের সঙ্গে দেখা করে কলকাতার শ্রমিক আন্দোলনে ফিরে যেতে চাইলেও এলাকার সাধারণ মানুষের দাবির মুখে যেতে পারেননি। স্থানীয় মুসলমান কৃষক এবং গারো, হাজংসহ আদিবাসী জনগোষ্ঠী মণি সিংহকে ‘টংক প্রথা’র বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য বারবার অনুরোধ করতে থাকেন। এরপর মণি সিংহ সর্বতোভাবে টংক আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন এবং পরিণত হন টংক আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে।

১৯৪১ সালে আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে থাকলে মণি সিংহকে আবার গ্রেপ্তার করে ১৫ দিন আটক রাখা হয়। ছাড়া পেয়ে তিনি পরিস্থিতি বুঝে আত্মগোপনে চলে যান। ১৯৪৪ সালে মণি সিংহ সারা বাংলার কৃষাণ সভার প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৫ সালে নেত্রকোনায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত কৃষাণ সভার ঐতিহাসিক সম্মেলনের অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে মণি সিংহ ছিলেন সম্মেলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক। ১৯৪৭ সালের আগে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম করতে গিয়ে কমরেড মণি সিংহকে অসংখ্যবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জেল-জুলুম-নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ণ গণতন্ত্র ও শোষণমুক্ত সমাজের আদর্শকে যারা সামনে নিয়ে এসেছেন মণি সিংহ তাদের একজন। আর এ কাজটি করতে গিয়ে তাঁর ওপর নেমে আসে পাকিস্তান সরকারের দমন-নির্যাতন ও গ্রেপ্তাারি পরোয়ানা। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে প্রায় ২০ বছর তিনি আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি ছিল এবং জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক সরকার তাঁকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।

১৯৫১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কমরেড মণি সিংহ আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় ওই সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৬৫ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় সম্মেলনে পুনরায় পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি জেলে থাকাকালীন ১৯৬৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির চতুর্থ সম্মেলনে (যে সম্মেলনকে পার্টির প্রথম কংগ্রেস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের মুখে অন্যান্য রাজবন্দির সঙ্গে মণি সিংহও জেল থেকে বেরিয়ে আসেন। ওই বছর ২৫ মার্চ পুনরায় সামরিক আইন জারি হলে তিনি জুলাই মাসে আবার গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীকালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় অনেক নেতাকে মুক্তি দিলেও, সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান কমরেড মণি সিংহকে মুক্তি দেননি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর বন্দিরা রাজশাহীর জেল ভেঙে তাঁকে মুক্ত করেন এবং নিজেরাও মুক্ত হন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন ও সাহায্য-সহযোগিতা আদায়ের ক্ষেত্রে কমরেড মণি সিংহের অবদান ছিল অবিসংবাদিত। তিনি ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয় বিশেষ গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ওই বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। ১৯৭১ সালে গঠিত মুজিবনগর সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। মূলত: মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন আদায়ে তিনিই ছিলেন মূল ব্যক্তি। কার্যত: তাঁর কারণেই রাশিয়া (তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন বা ইউএসএসআর) মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিল।

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পদগোর্ণী আন্তর্জাতিক নেতাদের মধ্যে সর্বপ্রথম এক চিঠিতে পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধের আহবান জানান। তখন পাকিস্তানের পক্ষে আমেরিকা ভারত মহাসাগরের উদ্দেশে ‘সপ্তম নৌবহর’ পাঠানোর প্রস্ততি নিতে থাকলে রাশিয়া তার আগেই মনি সিংহের মাতৃভূমি বাংলাদেশের পক্ষে বিশতম রণতরী (তখন অষ্টম নৌবহর নামেও পরিচিত) পাঠায়। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মার্কিন রণতরী সপ্তম নৌবহর ভারত মহাসাগর এলাকা থেকে লেজগুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল।

জনশ্রুতি আছে, মার্কিন রণতরী একেবারে কাছে চলে আসলে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লৌহমানবীখ্যাত ইন্দিরা গান্ধী হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, “সপ্তম নৌবহর যদি ভারত মহাসাগরে এক ইঞ্চিও প্রবেশ করে তাহলে সেখানেই সলিল সমাধি হবে।” তাঁর সেই হুংকারের মূল শক্তি ছিল তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র (বর্তমান রাশিয়া) এবং সে সময়ের আরো ১৮টি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক শিবির; যে শিবিরের সমর্থন আদায়ে কমরেড মণি সিংহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয় গঠিত বিশেষ গেরিলা বাহিনীর পক্ষে সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়েছিলেন।

মণি সিংহ ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পর স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে পূর্ণ গণতন্ত্র ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে সোচ্চার হন। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কমরেড মনি সিংহকে তাঁর বসতভিটে (পাকিস্তান সরকার কর্তৃক জবরদখলকৃত) ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তখন মনি সিংহ বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, যতোদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থান না হচ্ছে, ততোদিন পর্যন্ত আমার বসতভিটে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে না। যেদিন সবার ব্যবস্থা হবে, সেদিন আমারও ব্যবস্থা হবে।

কমরেড মণি সিংহ ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) দ্বিতীয় কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮০ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় কংগ্রেসে নির্বাচিত হন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর তৎকালীন সরকার স্বাধীন দেশে প্রথমবারের মতো কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি ঘোষণা করে। ১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসনামলে গ্রেপ্তার করা হয় ৭৭ বছর বয়সী কমরেড মণি সিংহকে। এরপর তাঁকে টানা ৬ মাস কারাবন্দি করে রাখা হয়। কিংবদন্তির এই বিপ্লবী ৮৪ বছর বয়স পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে পার্টির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। ১৯৯০ সালের ৩১ ডিসেম্বর তাঁর দীর্ঘ বিপ্লবী জীবনের অবসান ঘটে। মৃত্যুর পর তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় ঢাকার পোস্তাগোলা মহাশ্মশানে।

কমরেড মণি সিংহ ২০০৪ সালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত হন। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনে অসাধারণ অবদান ও অনন্য কীর্তির জন্য সরকার তাঁকে মরণোত্তর এই পুরস্কারে ভূষিত করে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ও একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বীরোাচিত অবদান থাকা সত্ত্বেও কমরেড মনি সিংহের নামে কোনো জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়নি। অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশন রাজধানীর পুরনো পল্টনের সামান্য দূরত্বের একটি সড়কের নামকরণ করেছে ‘কমরেড মণি সিংহ সড়ক’। এই বীরের অবদানের প্রতি এটুকুই বোধ হয় কৃতজ্ঞতা! অথচ লাখো শহীদের রক্তেভেজা এই দেশে বহু রাজকার ও স্বাধীনতাবিরোধীর নামে অনেক স্থাপনা এবং প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত