প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সিআরবির রেলওয়ে হাসপাতাল ‘অকার্যকর’ করেছে কারা

সমকাল: প্রতিষ্ঠাকাল থেকে দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিল সিআরবির রেলওয়ে হাসপাতালটি। অনেক জটিল রোগীর ভরসাস্থল ছিল এ হাসপাতাল। এটি এখন শুধুই অতীত। বর্তমানে নগরবাসী দূরের কথা, খোদ রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান না। ৯৫ শয্যার হাসপাতাল সারাবছরই থাকে রোগীশূন্য। নাগরিক সমাজ বলছে, পরিকল্পিতভাবে গত এক দশকে তিলে তিলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কোটি টাকার এ হাসপাতালকে।

সিআরবি এলাকায় বেড়ে উঠেছেন কবি ও সাংবাদিক আহমেদ মুনির। তার বাবা একেএম কামাল উদ্দীন আহমেদ ১৯৯২-৯৫ সালে রেলওয়ে হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ছিলেন। শৈশবের স্মৃতিচারণ করে আহমেদ মুনির বলেন, ‘তখন পুরো এলাকা ছিল নির্জন। এখনকার মতো ছিল না এত দোকানপাট। সিআরবি এলাকায় তখন প্রথম কোনো স্থাপনা ছিল উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। আর রেলওয়ে হাসপাতালটি রোগীতে পূর্ণ থাকত। ছিলেন পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স। জটিল অনেক অস্ত্রোপচার হতো এ হাসপাতালে। সুদৃশ্য কেবিনের চারপাশ ছিল সবুজ গাছগাছালিতে ভরা। চমেক ও জেনারেল হাসপাতালের পরেই চট্টগ্রামের রোগীদের ভরসার স্থান ছিল রেলওয়ে হাসপাতাল।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরের মূল কেন্দ্রে রেলওয়ে হাসপাতালের অবস্থান হওয়ায় যাতায়াত ব্যবস্থাও অত্যন্ত ভালো। তারপরও এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন না রোগীরা। নগরের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে যখন রোগীদের উপচে পড়া ভিড় থাকে, তখনও রোগী পায় না সিআরবির রেলওয়ে হাসপাতাল। ঈদুল আজহার আগে একজন রোগী ভর্তি থাকলেও চলতি সপ্তাহে সাধারণ ওয়ার্ড ও করোনা আইসোলেশন সেন্টারের ৫০ শয্যার সবই পড়ে আছে ফাঁকা। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে, রেলওয়ে হাসপাতালে চিকিৎসকের ১৭টি পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত মাত্র তিনজন। এর মধ্যে একজন থাকেন ছুটিতে। তবে পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকলেও এখানে ছয়জন সিনিয়র নার্সসহ দায়িত্বে আছেন ১৪ জন। রোগী না আসায় তারাও ‘বেকার’ বসে থাকেন।

বছরজুড়ে রোগী সংকটে থাকার কথা স্বীকার করে রেলওয়ে হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা (সিএমও) ডা. আব্দুল আহাদ বলেন, ‘হাসপাতালে নেই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় সিরিয়াস রোগীকে এখানে ভর্তি রাখা যায় না। কয়েক কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালে সবসময় নির্দিষ্ট শয্যার কয়েক গুণ রোগী ভর্তি থাকলেও এখানে আসেন না কোনো রোগী। করোনা রোগীও চিকিৎসা নিতে আসেন না। রোগী সংকটের বিষয়টি একাধিকবার ঊর্ধ্বতন মহলে জানিয়েও প্রতিকার মেলেনি।’

হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. নুরুল আবছার বলেন, ‘করোনা রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় রেলওয়ে হাসপাতালে ১০০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার গড়ে তোলা হয়। অফিসিয়ালি ১০০ শয্যার কথা বলা হলেও এখানে শয্যা আছে ৫০টি। তবে বর্তমানে একজন রোগীও ভর্তি নেই। এখানে রোগী এলে অন্য হাসপাতালে চাপ কিছুটা কমত।’

হাসপাতালের এমন অবস্থার জন্য অবশ্য চট্টগ্রাম রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকেই দায়ী করেছে স্থানীয় নাগরিক সমাজ। তাদের মতে, পরিকল্পিতভাবেই হাসপাতালটি অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। অবশ্য স্বাস্থ্য বিভাগও এর দায় এড়াতে পারে না। পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ ও প্রচার-প্রচারণার অভাবে বর্তমানে হাসপাতালটি অনেকটা নিষ্প্রাণ।

এ প্রসঙ্গে কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেছেন, রেলওয়ের বিদ্যমান হাসপাতালটি অকার্যকর রেখে সিআরবিতে পরিবেশ ধ্বংস করে বেসরকারি হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি চট্টগ্রামের আপামর মানুষকে অত্যন্ত ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। কবি ও সাংবাদিক ওমর কায়সার বলেন, ‘নতুন হাসপাতাল নির্মাণের জন্য

চট্টগ্রামে আরও অনেক স্থান রয়েছে। রোগী না আসা রেলওয়ে হাসপাতালের কয়েক গজের মধ্যেই নতুন হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক। রেলওয়ের বিদ্যমান হাসপাতালটিতে নতুন করে চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ দিয়ে এটিকে আরও আধুনিক করতে সরকার উদ্যোগ নেবে বলে আশা করছি।’

মুক্তিযুদ্ধের গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবার রেলওয়ে হাসপাতালকে ধ্বংস করতেই বড়লোকের ইউনাইটেড হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা এটা হতে দিতে পারি না। ক্যাবের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, রেলওয়ে হাসপাতালটি বছরজুড়ে রোগীশূন্য থাকে। এটি দুঃখজনক।

তবে এমন অভিযোগ মানতে নারাজ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কেন হাসপাতালটি অকার্যকর করে রাখব? হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক সংকট রয়েছে। এরই মধ্যে বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। আশা করছি, শিগগির প্রয়োজনীয় চিকিৎসক পাব। নতুন একটি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য পুরোনোটি অকার্যকর করে রাখা হয়েছে- এটি সঠিক নয়।’

রেলওয়ের তত্ত্বাবধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা হাসপাতালগুলোও নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসক সংকট কেবল এখানেই নয়; সব হাসপাতালেই। রেল একটি পরিবেশ ও জনবান্ধব বাহন। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষও সবসময় পরিবেশের পক্ষে। নতুন হাসপাতালটি গোয়ালপাড়াতে হচ্ছে। সেখানে তেমন গাছপালা নেই। চট্টগ্রামে একটি ভালোমানের হাসপাতালের প্রয়োজন রয়েছে। হাসপাতালটি নির্মিত হলে চট্টগ্রামের মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাবেন না।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত