প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিধিনিষেধে গতিহীন অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস

নিউজ ডেস্ক: করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে চলমান বিধিনিষেধে অর্থনীতির চাকার ঘূর্ণন কমে গেছে। এতে বাড়ছে ক্ষতির পরিমাণ। বিধিনিষেধ আরও দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। ফলে ১৫ মাসের করোনার ক্ষতি কাটিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম আরও বিলম্বিত হবে। চলমান কঠোর বিধিনিষেধের কারণে পুনরুদ্ধারের চেয়ে দেশের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। করোনার শুরু থেকে গত ১৫ মাসের মধ্যে সাড়ে ৬ মাসই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি সীমিত করা হয়েছে। এর প্রভাবে গত ১৫ মাসে ব্যবসা-বাণিজ্যের সর্বত্র নেমেছে ধস।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিধিনিষেধের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে মানুষের আয় কমছে। কমে যাচ্ছে ভোগ। ফলে অর্থনীতিতে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। করোনার প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে, তখনই আসে দ্বিতীয় ঢেউ। এতে শ্লথ হয়ে পড়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি। যে কারণে করোনার আঘাত সহ্য করে অর্থনীতি নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে বেশি সময় লাগছে।

৫ এপ্রিল থেকে বিধিনিষেধ চলছে। এর মধ্যে কয়েক দফা শিথিল করার পর গেল শুক্রবার থেকে আবার শুরু হয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে আবার স্থবিরতা নেমেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প পথে বসেছে। বড় শিল্প ধুঁকছে। কমেছে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে করোনার শুরু থেকে মে পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সার্বিক একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এসব তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, করোনার প্রভাবে দেড় বছরে ব্যাংকিং খাতে টাকার প্রবাহ বেড়েছে। কিন্তু ঋণের প্রবাহ বাড়েনি। ফলে রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে অলস টাকা। ঋণের সুদের হার কমানো এবং শর্ত শিথিল করা হলেও বাড়েনি চাহিদা। তবে সহজ শর্তে এবং কম সুদে প্রণোদনার ঋণ অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে অনেক সহায়তা করেছে। করোনার মধ্যে আর্থিক খাতে অনলাইন লেনদেন ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বেড়েছে। পাশাপাশি পণ্য সরবরাহে ই-কমার্সের চাহিদাও বেড়েছে। এতে এ খাতটি দাঁড়িয়ে গেছে। তবে শিল্প ও সেবা খাত বেশি ক্ষতি হয়েছে। কৃষির ক্ষতি হয়েছে তুলনামূলক কম। বরং কৃষি খাতের উৎপাদন বাড়ার কারণে অর্থনীতিতে করোনার নেতিবাচক প্রভাব সেভাবে পড়েনি। যুগান্তর

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দীর্ঘ সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে অর্থনীতির একটি অন্তর্নিহিত সহ্য ক্ষমতা দাঁড়িয়ে গেছে। যে কারণে করোনার দুই দফা ধাক্কায় আরোপিত লকডাউনের মধ্যেও এখনো বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেনি। অঞ্চলভেদেও অর্থনীতির একটি শক্তি দাঁড়িয়ে গেছে। যে কারণে কোনো অঞ্চলে বড় ধরনের কোনো ঘাটতি তৈরি হয়নি। তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিকে বেশিদিন থামিয়ে রাখা ঠিক হবে না। একে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিতে হবে। তা না হলে সৃষ্ট ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হবে। তখন আবার তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এজন্য করোনার সংক্রমণ রোধে সরকারকে এখন থেকে বিকল্প ভাবতে হবে। বেশির ভাগ মানুষকে টিকার আওতায় আনাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারিতে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়েছিল ১১ শতাংশ। মার্চেও ১১ শতাংশের মধ্যে থাকে। করোনার মধ্যে টাকার প্রবাহ আরও বাড়ানো হয়েছে। ফলে মে পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ শতাংশে। বাজারে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যেই টাকার প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নীতি সহায়তায় ব্যাপক ছাড় দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকার জোগান এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। কিন্তু টাকার প্রবাহ যেভাবে বেড়েছে, সেভাবে বাড়েনি ঋণের প্রবাহ। গত বছরের জানুয়ারিতে অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহ বেড়েছিল ১৪ শতাংশ। কিন্তু ওই বছরের মার্চে তা কমে ১২ শতাংশে নেমে যায়। চলতি বছরের মার্চে তা আরও কমে ৬ শতাংশে নামে যায়। মেতে আবার কমে ২ শতাংশে নেমে যায়। সরকারি ও বেসরকারি দুই খাতেই ঋণের প্রবাহ কমেছে। ফলে অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহও কমেছে। গত বছরের জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছিল ১০ শতাংশ। মেতে তা কমে ৬ দশমিক ২১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে করোনার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেভাবে টাকার জোগান বাড়িয়েছে, সেই তুলনায় ঋণের জোগান বাড়াতে পারেনি ব্যাংকগুলো। ফলে ব্যাংকিং খাতে অলস টাকার পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে মেতে ২ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। গত বছরের জানুয়ারিতে এর পরিমাণ ছিল এক লাখ কোটি টাকা। দেড় বছরের ব্যবধানে অলস টাকা বেড়েছে এক লাখ কোটি টাকা। এসব অর্থের বড় অংশ এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ভল্টে পড়ে আছে। ব্যাংকগুলোয় অলস টাকার পাহাড় জমায় নগদ অর্থের চাহিদা কমে গেছে। এতে কলমানি মার্কেটের সুদের হার কমে দেড় থেকে ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের জানুয়ারিতে এটা ছিল ৪-৫ শতাংশ। ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হার ছিল ৯ শতাংশ। এখন তা কমে ৫ শতাংশ হয়েছে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ২০১৯ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ শতাংশ। গত বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে তা ৪০ শতাংশ নেতিবাচক অবস্থায় চলে আসে। গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতে প্রবৃদ্ধি নেই। কৃষি খাতের ঋণ বিতরণ বাড়লেও আদায় কমে গেছে। ফলে বেড়েছে বকেয়া ঋণের পরিমাণ। শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণের প্রবাহ কমেছে ৩২ শতাংশ, আদায় কমেছে ৩০ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার বিস্তার ঠেকাতে ২০২০ সালের ২৬ মার্চ থেকে অর্থনৈতিক কার্যক্রম অনেকাংশ সীমিত করে দেয় সরকার। সামাজিক খাতসহ বিভিন্ন খাতে দেশের যখন অগ্রগতি হচ্ছিল, তখনই করোনার আঘাত আসে। এতে অর্থনৈতিক গতি থমকে যায়। এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উদ্বেগ ছড়াবে।

করোনার মধ্যে সরকারের রাজস্ব আয়েও ধস নামে। ২০২০ সালের মার্চে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২০ হাজার কোটি টাকা। একই বছরের মেতে তা সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকায় নেমে যায়। জুলাইয়ে তা বেড়ে আবার ৩০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি চলে যায়। সেপ্টেম্বরে তা ১৫ হাজার কোটি টাকার নিচে নেমে যায়। এরপর থেকে রাজস্ব আয় বাড়ছে। গত বছরের এপ্রিলে রাজস্ব আয় কমেছিল সাড়ে ৫৪ শতাংশ। এপ্রিলে বেড়েছে ১১৬ শতাংশ। তবে গত অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিলে বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ।

করোনায় দেড় বছরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও আয় খাতে। বিনিয়োগ কমায় কর্মসংস্থান কমেছে। এর প্রভাবে কমেছে আয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার প্রভাবে স্বল্প বেতনের অদক্ষ কর্মীদের আয় বেশি কমেছে। আর যারা অস্থায়ী কর্মী, তাদের আয় বেশি কমেছে। একই সঙ্গে শিল্প, সেবা ও কৃষি খাতেও শ্রমিকদের আয় কমেছে। অর্থনীতির মূল ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে স্বল্প বেতনের দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমের চলাচল কমে যাওয়ায় তাদের আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত রয়েছে। আয় কমায় আর্থসামাজিকভাবে তাদের একটি দুর্বল অবস্থানে ফেলেছে। লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হওয়ায় সার্বিক কার্যক্রমে কয়েক মিলিয়ন (১০ লাখে এক মিলিয়ন) শ্রমঘণ্টা সময় নষ্ট হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার মধ্যে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনা কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। খাদ্যসামগ্রীর দামও বেড়েছে। টাকার জোগানও বাড়ানো হয়েছে। সব মিলে মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে। এর মধ্যে দেশে খাদ্যোৎপাদন বাড়ার পরও এ খাতে মূল্যস্ফীতির হার বাড়ছে। এটি উদ্বেগজনক। গড় মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাড়ছে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার। গড় মূল্যস্ফীতির হার ৫ থেকে ৬-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। কমেছে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতির হার। গত বছরের জানুয়ারিতে এ হার ছিল ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। মেতে তা কমে ৫ দশমিক ২০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। মেতে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

করোনার মধ্যে আমদানি কমেছে। অন্যদিকে বেড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক অনুদান। এ কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। গত বছরের জানুয়ারিতে রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার। এখন তা বেড়ে ৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্পোৎপাদন গত বছরের জানুয়ারিতে বেড়েছিল ৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিলে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৩৪ শতাংশে। গত বছরের মার্চে সার্বিক মজুরি বৃদ্ধির সূচক ছিল ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ। চলতি বছরের মেতে তা কমে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশে নেমে যায়।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত