প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মহামারি থেকে বাঁচতে বাংলাদেশের সফলতা ভারতের জন্যে শিক্ষা হতে পারে

রাশিদ রিয়াজ : ভারতের কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক পরামর্শক বৈশালী বসু শর্মা মনে করেন বাংলাদেশের সাফল্যের কাহিনীটি যখন ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বুদ্ধিমানের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং সমর্থন নীতিগুলির ক্ষেত্রে আসে তখন তা ভারতের পক্ষে অনুকরণীয় হয়ে ওঠে। নয়াদিল্লিতে পলিসি পারসপেক্টিভস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে জড়িত এই পরামর্শক মহামারি কাটিয়ে উঠতে অর্থনীতিতে ভিন্ন এক যাত্রায় বাংলাদেশ কি সফলতা পেয়েছে তার এক চুলচেরা বিশ্লেষণে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিবেশী দেশগুলির রাষ্ট্রপ্রধানদের হাতে আমের উপহারকে ভারতীয় গণমাধ্যম যখন বাংলাদেশের ‘আমের কূটনীতি’ বলে অভিহিত করছে তখন দেশটি এ প্রয়াসকে খুবই স্বাভাবিক বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ‘সুখ’ ভাগ করে নেওয়া হিসেবে দেখছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বছরটি আসলেই উদযাপনের বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। মহামারির বছরগুলিতে দেশটির অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা সম্প্রতি ব্লুমবার্গের কোভিড-১৯ এর স্থিতিস্থাপকতা র‌্যাঙ্কিংয়ে স্বীকৃতি পায়, যেখানে দেশটির অর্থনীতি বিশ্বের ৩৩টি অর্থনীতির মধ্যে ২৪তম স্থানে রয়েছে যার মূল্য ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। গত এপ্রিল মাসে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কোভিডে অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও, বাংলাদেশের অর্থনীতি ইতিবাচক। মহামারি আঘাত হানার সময় বাংলাদেশ অত্যন্ত ভাল করেছে এবং মহামারি মোকাবেলায় বেশ কয়েকটি অসাধারণ প্যাকেজ চালু করেছে। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের বৈশ্বিক চিত্রে আকর্ষণীয় পরিবর্তন দেখাতে সমর্থ হয়েছে। জিডিপি বৃদ্ধির অবিচ্ছিন্ন সাফল্য এধরনের পরিবর্তন এনে দিয়েছে। হেনরি কিসিঞ্জার দক্ষিণ এশীয় এ দেশকে একবার ‘তলাহীন ঝুড়ি’ বলে অভিহিত করলেও তারই জীবিদ্দশায় বাংলাদেশ এখন ভবিষ্যতের ‘এশিয়ান বাঘ’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করছে। গত বছর বাংলাদেশের জিডিপি ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে আইএমএফ’র এ পূর্বাভাস দেখে ভারতীয়রা হতবাক হয়ে গিয়েছিল। কারণ আইএমএফ’র পূর্বাভাস এও বলে যে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৮৮৮ ডলার হলেও ভারতের জিডিপি একই বছর সাড়ে ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ১৮৭৭ ডলার। এখানে বিস্ময়ের শেষ নেই। এমনকি কোভিড মহামারীর আগেও ভারতের জিডিপি ধারাবাহিকভাবে ২০১৭ সালে ৬.৮ শতাংশ থেকে পরের বছর ৬.৫৩ শতাংশ ও ২০১৮ সালে ৪.০৪ শতাংশে হ্রাস পায়। গত বছর তা মাইনাস ৭ শতাংশে নামে। অথচ বাংলাদেশ একই সময়ে বিশে^র সপ্তম দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে এর জিডিপি যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৮ শতাংশে পৌঁছে। তাও রোহিঙ্গা সঙ্কটের মধ্যে আর্থিক চাপ ও রাজস্ব আদায় নেতিবাচক ও দাতাদের ক্লান্তির পরও বাংলাদেশ এ অগ্রগতি করেছে। আসল বিস্ময়টি হচ্ছে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিগুলো যখন মহামারি ও লকডাউনের সংকুচিত হয়ে পড়ে তখন বাংলাদেশ ৫.২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বাংলাদেশের গড় মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২৭ ডলার যখন ভারতের মাথাপিছু আয় হচ্ছে ১৯৪৭ ডলার।

বৈশালীর বিশ্লেষণ হচ্ছে বাংলাদেশের ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে দেশটির অর্থনীতি ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ২৭১ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রম-নিবিড় উৎপাদন শিল্প থেকে উৎপাদনশীল খাতে মনোনিবেশ করায় বাংলাদেশ আজ চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ। বাংলাদেশের বেশিরভাগ রফতানি টেক্সটাইল, পোশাক এবং পাদুকা শিল্পের সাথে সম্পর্কিত – যা অত্যন্ত শ্রম-নিবিড়, প্রায় নিখরচায় এবং অর্ধ-দক্ষ শ্রম অকাতরে নিযুক্ত হয়েছে শিল্পখাতগুলোতে।

বাংলাদেশ সহজ রফতানিমুখী শিল্পায়নের উন্নয়ন কৌশল নিয়ে এগিয়েছিল, যা ছিল এশিয়ান টাইগারদের দ্বারা বড় সাফল্যের সাথে বাস্তবায়িত অর্থনৈতিক নীতি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সও এর বুদ্ধিমান রাজস্ব ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। বাজেটের ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশ বা তারও কম সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। সরকারি খরচে কৃচ্ছতা সাধন করে তা বেসরকারি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি বা বিনিয়োগের জন্য জনসাধারণের ব্যয়কে সীমাবদ্ধ করা। আর্থিক বিবেচনা ও রফতানি কর্মক্ষমতা বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাসের মূল শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বৈশালীর দৃষ্টিতে কুটির আকারের সৃজনশীল উদ্যোগগুলি মাঝারি শিল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে সক্ষম হয়েছে। ফলে ৮.৮ মিলিয়ন প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার পর বাংলাদেশের জিডিপিতে ২৫ শতাংশ অবদান রাখে। প্রতিটি খাতকে আলাদা আলাদাভাবে নজর দেওয়ায় প্রত্যেকটিরই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সৃজনশীল অর্থনীতিতে তরুণ-তরুণীদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অসামান্য উদ্যোগের জন্য ইউনেস্কোর অনুমোদিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্তর্জাতিক পুরষ্কারের সৃজনশীল অর্থনীতি’ অর্থায়নের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে সিএমএসএমইগুলি পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আস্থা প্রতিফলিত হয়েছে। এর পাশাপাশি এমএসএমই ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক রফতানিতে অংশগ্রহণ ভারতের জন্য লক্ষ্য করার বিষয়। ভারতের শীর্ষ পাঁচটি রফতানি পণ্য যৌথভাবে মোট রফতানির প্রায় ৪০ শতাংশ অবদান রাখে এবং এটি মূলধন এবং প্রযুক্তি-নিবিড়। ভারতে ব্যাংক ঋণ পেতে বাধার কারণে ক্ষুদ্র শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে শ্রম-নিবিড় শিল্পগুলিতে উৎপাদন ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে, যা রফতানিমুখী শিল্পগুলিকে যেমন টেক্সটাইল, পোশাক, চামড়া এবং রত্ন শিল্পকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। কোভিড মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর ভারতের পক্ষে, অ্যামাজন ও ওয়ালমার্টের মতো সংস্থাগুলির সাথে প্রতিযোগিতামূলক ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সহায়তা করার বিষয়টি যথাযথভাবে সামাল দেওয়া যায়নি। অল ইন্ডিয়া ট্রেডার্স (সিএআইটি) গত দু’মাসে প্রায় ১৫ লাখ কোটি টাকার ব্যবসায়ীক ক্ষতির অনুমান করেছে, কারণ দ্বিতীয় কোভিড ধাক্কায় বিভিন্ন রাজ্য স্থানীয়ভাবে লকডাউন আরোপ করে। ভারতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ব্যবসায়ীক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণার দাবি জানায়।

তুলনামূলকভাবে, জিডিপি অনুপাতের তুলনায় বাংলাদেশের উদ্দীপনা প্যাকেজটি ভারতের তুলনায় অনেক বেশি। এমনকি মহামারিটির মাধ্যমে আর্থিক ক্ষেত্রে বিচক্ষণতার সঙ্গে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরেও শেখ হাসিনার সরকার কৃষিক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে উদার উদ্দীপনা প্যাকেজ এবং সামাজিক সুরক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করে। এসএমই, ভারী শিল্প, তৈরি পোশাক খাত এবং অন্যান্য শিল্পকে পর্যায়ক্রমে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’, যার লক্ষ্য একটি ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি করা, নতুন উদ্যোক্তাদের সমর্থন করে এবং তাদের ডিজিটাল ফিনান্স ম্যানেজমেন্টে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। প্রায় দুই ডজন কোভিড উদ্দীপক প্যাকেজ সহ দেশে মোট ১.২৪ ট্রিলিয়ন টাকা ব্যয় হয়েছে, যা জিডিপির ৪.৪৪ শতাংশ।

এর মধ্যে রফতানিমুখী শিল্পের জন্য তিন মাসের মজুরি বিল পরিশোধের জন্য ৫০ বিলিয়ন টাকা, কারখানার মালিকদের ২ শতাংশ সুদে দুই বছরের ঋণ, সিএমএসএমইগুলিকে কার্যকরী মূলধন যোগাতে ২০০ বিলিয়ন টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৫ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসাবে বহন করবে। উদ্দীপনা প্যাকেজটির সাফল্য একই সাথে প্রভাবিত শিল্পগুলিকে সহায়তা করা এবং দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের খাদ্য সুরক্ষা সমস্যা মোকাবেলায় কার্যকর ব্যবস্থাপনা বেশ কাজে দিয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারি বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, মাথাপিছু আয়ে হ্রাস হয়েছে কিন্তু কৃতিত্বের সঙ্গে দেশটি কোভিড সংকট মোকাবেলায় তার বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদির বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা প্রয়োগে সফল হয়েছে। ভারতের পূর্বাঞ্চলের প্রতিবেশি এই দেশটিতে ১৬৮ মিলিয়ন মানুষের বাস। সময়োপযোগী অর্থনৈতিক উদ্দীপনা প্যাকেজ, ন্যায়বিচারের নগদ প্রণোদনা, রফতানিতে প্রত্যাবর্তন এবং প্রেরিত রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে বাংলাদেশ বিশাল জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও, দেশটি এখন এক মডেল, একটি ইতিবাচক উদাহরণ যা এশীয় অঞ্চলে সংকটের সময়ে অসাধারণ হয়ে উঠতে সহায়তা করেছে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত