প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মহামারি প্রতিরোধে ইসলাম

হাসান তাকী: মহামারি মানব সভ্যতার মতোই প্রাচীন কাল থেকে পরিচিত। বিভিন্ন সময় সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায়, কখনও আবার বিশ্বব্যাপী। প্লেগ, কলেরা, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গুটিবসন্ত বিভিন্ন রোগ বিভিন্ন সময়ে মহামারির আকার ধারন করেছিলো।

মানুষ পাপ করতে করতে যখন পাপের সীমা লংঙ্গণ করে, তখনই আল্লাহর শাস্তি নাজিল হয়। পাপিষ্ঠ ফেরাউনকে আল্লাহ তায়ালা তখনই ধরেছেন, যখন সে নিজেকে আল্লাহ বলে দাবি করেছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: হে মুসা! তুমি ফেরাউনের কাছে যাও, সে অত্যন্ত উদ্ধত হয়ে গেছে। (সূরা: ত্বাহা, আয়াত ২৪)।

হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে (মহামারি) প্লেগ রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসায় তিনি বলেন, এটি হচ্ছে এক ধরনের আজাব রোগ। আল্লাহ যার ওপর তা (মহামারি) পাঠাতে ইচ্ছে করেন, পাঠান। কিন্তু আল্লাহ এটিকে মুমিনদের জন্য রহমত বানিয়ে দিয়েছেন। অতএব প্লেগ রোগে কোনো বান্দা যদি ধৈর্য ধরে আর এ বিশ্বাস নিয়ে নিজ শহরে (অঞ্চল) অবস্থান করতে থাকে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য যা নির্দিষ্ট করে রেখেছেন তা ছাড়া আর কোনো বিপদ তার ওপর আসবে না। তাহলে ওই বান্দার জন্য থাকবে শহীদের সাওয়াবের সমান সাওয়াব। (বুখারি)

এ হাদিসের দৃষ্টিকোণ থেকে প্লেগ (যে কোনো মহামারি) ইসলামে প্রত্যেক মুমিন বান্দার জন্য নেয়ামত। কেননা মহামারিতে মৃত্যুবরণকারী মুমিন বান্দারা শহীদের মর্যাদা পাবে। আরো বুঝানো হয়েছে যে শহরে (অঞ্চল) মহামারি লাগবে সেখানেয় অবস্থান করতে হবে। অন্যত্রে চলেযেতে পারবে না আল্লাহ তাআলা তার জন্য যা নির্দিষ্ট করে রেখেছেন তা ছাড়া আর কোনো বিপদ তার ওপর আসবে না। তাছারা আল্লাতায়লা তাঁর প্রিয় বান্দাদের ঈমানি শিক্তি পরিক্ষার জন্য ভিবিন্ন রোগ ব্যাদি দিয়ে থাকেন।

যুগের মুযাদ্দেত, বুখারি শরিফের প্রসিদ্ধতম ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোর অন্যতম ফতহুল বারির প্রণেতা, বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ও ফকিহ্ হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-এর দুই কন্যাও তার সমযরে মহামারিতে মারা গিয়েছিলেন।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, জেনে রাখো, আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তাঁরা দুঃখিতও হবে না। (সূরা ইউনূস : ৬২)। আল্লাহর বন্দু তথা তাঁর প্রিয় বান্ধাদের ভালোবেসে কোনো না কোনো দূরা রোগ দিয়ে য়েথাকেন। তার কারণ এই রোগের জন্য তাঁর গুনামাফ হতে থাকে।

মহান আল্লাহ কাউকে সাধ্যের বাইরে কোনো কিছু চাপিয়ে দেননি: মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা কাউকে সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ চাপিয়ে দেননি। ইসলামের যাবতীয় নির্দেশনা যুগোপযোগী। সুরা বাকারার ২৮৬ নম্বর আয়াতটি নিয়ে আমরা যদি গভীরভাবে চিন্তা করি, তাহলে আমাদের জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাবে। যারা ভালো কাজ করেছে, তারা তার ভালো ফল পাবে আর যারা খারাপ করেছে, তা তার বিরদ্ধে যাবে। যে লোকের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, সে মহামারিতে আক্রান্ত, তার জন্য মসজিদে গমন করা জায়েজ নেই। মসজিদে নামাজে গেলে যত কম সময়ে নামাজ আদায় করা যায়, ততই ভালো। ফরজ নামাজের পূর্বের ও পরের সুন্নতগুলো ঘরে পড়ে নেওয়া ভালো। আর ইমাম সাহেব যেন এই দুর্যোগকালে নামাজের কিরাত ও জুমার খুতবা সংক্ষিপ্ত করেন। শরিয়তে খুতবার ক্ষেত্রে সহজতার বিধান রয়েছে।

বিশ্ববিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা ৭৪৯ হিজরির দামেস্কের বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে মহামারির ফলে পথে-ঘাটে মানুষ মরে পড়ে ছিল। আকাশে শকুন উড়ছিল। বড় বড় গর্ত খুঁড়ে লাশগুলো টেনে সেখানে নামানো হচ্ছিল। এ সময় মুসলমানরা সবাই কোরআন হাতে পথে বেরিয়ে আসে। তিন দিন সবাই রোজা রেখেছিল। খ্রিষ্টানরা বাইবেল হাতে, ইহুদিরা তাওরাত হাতে পথে নেমে আসে। সম্মিলিতভাবে সবাই মহান প্রভুর কাছে মিনতি জানায়। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা রহম করেন।

ইসলাম মানুষকে আল্লাহর ওপর ঈমান আনা ও তাঁর ইবাদতের ওপর যেমন জোর দেয়, তেমনি মানুষের সেবা করতেও জোর তাগিদ দিয়েছে। ইসলাম একে অপরের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলাও ইবাদত বলে গণ্য করে। এসব আচরণ ও পেশাগত ইবাদতের পক্ষে অসংখ্য আয়াত বা হাদিস রয়েছে। রাসুল (সা.) তাঁর সমগ্র জীবনে সাহায্যপ্রার্থীর প্রতি অকৃপণভাবে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি জীবনে কখনও কোনো সাহায্যপ্রার্থীকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি বা না বলেননি। মানবসেবাকে তিনি তাঁর জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কোনো অবস্থায় এ ব্রত থেকে বিচ্যুত হননি। রাসুল (সা.) এর কাছে যেসব উপহার আসত, তিনি তা গরিব-দুঃখীদের বিলিয়ে দিতেন। ইসলামে মানবসেবাকে কতটা গুরত্ব দেওয়া হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত আরেকটি হাদিসে। রাসুল (সা.) বলেন, বিধবা ও অসহায়কে সাহায্যকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য। (বুখারি, মুসলিম)

ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলিম সরকার জনকল্যাণ বিবেচনায় কোন নির্দেশনা দিলে এবং তা শরীয়াহর সাথে সাংঘর্ষিক না হলে তা মান্য করা অপরিহার্য। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহর, আনুগত্য করো রাসূলের ও তোমাদের নেতৃস্থানীয়দের। (সূরা আন-নিসা, ৫৯)

এ কঠিন সময়ে আমাদের উচিৎ বেশি বেশি (১) তওবা, (২) ইস্তেগফার, (৩) নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামায, (৪) কুরআন তিলাওয়াত, (৫) বৃহস্পতিবার, সোমবার নফল রোযা, (৬) তাহাজ্জুদ নামায ও (৭) রাসুলুল্লাহ সা. এর ওপর দুরদ পাঠ করা।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে ইসলামের দিকনির্দেশনা মেনে চলার এবং সচেতনতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার তাওফিক দান করন। দুনিয়ার যাবতীয় মহামারি ও রোগ-ব্যাধি থেকে সুস্থ থাকার তাওফিক দান করন। আমিন।

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত