প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এবারের ঈদেও বন্ধ চট্টগ্রামের সব পর্যটন কেন্দ্র

ডেস্ক নিউজ: প্রতিবছর ঈদ উপলক্ষে চট্টগ্রামের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ঢল নামতো পর্যটকের। কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে সব পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ থাকায় গত ঈদের মতো এবারও পর্যটকশূন্য এসব বিনোদনস্থল।

এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন পর্যটন শিল্প সংশ্লিষ্টরা। ইট-পাথরের বাইরে প্রকৃতির ছোঁয়া পেতে পর্যটকরা ঈদের ছুটিতে ভিড় জমাতেন চট্টগ্রামের শিশুপার্ক ও চিড়িয়াখানায়। ঈদের দিন ও পরের কয়েকদিন চিড়িয়াখানা ও ফয়’জ লেক কয়েক হাজার পর্যটকের আগমনে মুখরিত হয়ে উঠতো। তবে করোনার কারণে পর্যটনকেন্দ্রগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ফলে কোরবানির ঈদেও পর্যটকশূন্য এসব স্পটে বিরাজ করছে সুনসান নিরবতা।

শুধু চিড়িয়াখানা কিংবা ফয়’জ লেক নয়, আগ্রাবাদ শিশু পার্ক, বহদ্দারহাট স্বাধীনতা পার্ক, জাতিসংঘ পার্ক, কাজীর দেউরি শিশু পার্কও পর্যটকশূন্য।  তবে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, কর্ণফুলীর নেভাল-২, মেহেদীবাগ ওয়ার সেমিট্রি, সিআরবি এলাকা, কাট্টলী সৈকত, পারকি, গুলিয়াখালী সৈকতসহ কিছু বিনোদন কেন্দ্র ঘুরে দর্শনার্থী দেখা গেছে। যারা স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে পুলিশের বাধা না মেনে ঘুরতে এসেছেন।

দীর্ঘদিন বন্ধ পর্যটন কেন্দ্র চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা গত দুই বছরের মধ্যে প্রায় দশ মাস ধরে বন্ধ। গত চারটি ঈদে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্ধ রাখতে হয়েছে এই বিনোদন কেন্দ্র। এছাড়াও চট্টগ্রামের প্রায় সব বিনোদন কেন্দ্র করোনা পরিস্থিতির এ দুই বছরে ১১ মাস বন্ধ রয়েছে। যার কারণে আর্থিক সংকটে পড়ছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট মালিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

ক্ষতির মুখে পর্যটন খাত প্রতি মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতনসহ রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা কর্মী, বিভিন্ন খাতে ৩৫-৪০ লাখ টাকা খরচ হয়। দুই ঈদে বোনাস সহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে ফয়’স লেক কর্তৃপক্ষের।

এছাড়াও চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার গড় আয় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা। ঈদের দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী ৭ দিন পর্যন্ত তাদের আয় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা। চিড়িয়াখানা বন্ধ রয়েছে প্রায় ১০ মাস। এ ১০ মাসে প্রায় পৌনে ৪ কোটি টাকা আয় হতো চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার উন্নয়ন ব্যয় ছাড়া মাসে গড়ে খরচ হয় ১৪ লাখ টাকা।

স্থবির পর্যটনশিল্প করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় চট্টগ্রামে সব ধরনের বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ রেখেছে জেলা প্রশাসন। এতে স্থবির হয়ে পড়েছে পর্যটন ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কার্যক্রম। প্রাচীন ঐতিহ্য আর বন্দরনগরী খ্যাত চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পে এমন ধস নামায় হতাশ এ শিল্পে বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্টরা।

এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটন শিল্পকে বাঁচাতে হলে প্রণোদনার আওতায় আনতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে ঋণ ও সরকার সার্ভিস চার্জ গ্রহণে সহনীয় হলে করোনার প্রভাবে বিপর্যয়ে পড়া পর্যটনশিল্প লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবে।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটক না আসায় ফাঁকা হয়ে আছে চট্টগ্রামের পর্যটন স্থানগুলো। এতে ক্ষতির মুখোমুখি চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পসহ স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যান্য সময়ে পর্যটন স্থানগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত নানান বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকলেও এখন বিনোদন কেন্দ্রের হোটেল-মোটেলগুলো পর্যটক শূন্য।

ফয়’স লেক, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা, কাজীর দেউড়ি শিশু পার্ক, বহদ্দারহাট স্বাধীনতা কমপ্লেক্স, কর্ণফুলী শিশু পার্ক বন্ধ থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। যদিও পারকি, কাট্টলী সমুদ্র সৈকত, মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন কর্ণফুলীর পাড়, অভয়মিত্র ঘাট, সিআরবি শিরীষ তলা এলাকায় বিনোদনপ্রেমীরা বিনা বাধায় ঘুরতে পারছেন।

মালিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুরবস্থা বিনোদন স্পটগুলো বন্ধ থাকায় বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত হাজারো শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী। এছাড়াও বিপাকে পড়েছেন পর্যটন খাতে বিনিয়োগকারীরাও। প্রতিটি বিনোদন স্পট বন্ধ থাকলেও সেখানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীতের বেতন দিতে হচ্ছে মালিকদের। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে টিকিয়ে রেখেছেন মালিক পক্ষ। কিছু মালিক পক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা দিলেও অনেক মালিক বেতন বকেয়া রেখেছেন কয়েক মাস। যার কারণে রাস্তায় নামতে হচ্ছে বিনোদন কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।

বেকায়দায় হোটেল-রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ করোনাভাইরাসের প্রভাবে পর্যটকের সংখ্যা শূন্য থাকায় হোটেল রিসোর্টগুলোর মালিকরাও পুঁজি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। পর্যটকদের ৮০ শতাংশই থাকার জন্য বেছে নিতেন চট্টগ্রামের প্রায় ২০০টি হোটেল-রিসোর্টকে। এসব হোটেল-রিসোর্ট প্রতি বছর ঈদের সময় কয়েক হাজার পর্যটক আগাম বুকিং দিয়ে রাখতেন। কিন্তু এ বছর পর্যটকের সংখ্যা শূন্য।

ঈদের ২ মাস আগে থেকেই অনেকে ফোন করেন। কেউ কেউ বিকাশে অগ্রিম দিয়ে রাখেন। তখন মৌসুমি কর্মচারী রাখতে হয়। কিন্তু এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে পর্যটন কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় এখন পর্যন্ত কোনো ফোন আসেনি বলে জানালেন এক হোটেল মালিক। বন্ধ থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কর্মচারী রাখতে হচ্ছে। যেহেতু কোনো আয় নেই তাই পুঁজি ভেঙ্গে বেতন দিতে হচ্ছে তাদের।

ফয়’স লেক অ্যামিউজমেন্ট পার্ক পরিচালনাকারী সংস্থা কনকর্ডের উপ-ব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) বিশ্বজিৎ ষোষ বাংলানিউজকে বলেন, ফয়’স লেক কমপ্লেক্সে বর্তমানে কর্মীদের বেতন সহ আনুষঙ্গিক খাতে মাসে খরচ হচ্ছে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা। ঈদ উপলক্ষে বোনাস সহ এই খরচ বেড়ে ৬৫ লাখ টাকার কাছাকাছি। কিন্তু পার্ক বন্ধ থাকায় লোকসান গুণতে হচ্ছে।

বেসরকারি ওয়ান্ডার ল্যান্ড গ্রুপের পরিচালনাধীন কাজীর দেউড়ি শিশু পার্কের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পার্ক খুলে দেওয়া হলে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা সম্ভব।

বহদ্দারহাট স্বাধীনতা কমপ্লেক্স পরিচালনাকারী ওয়েল এন্টারপ্রাইজের মহাব্যবস্থাপক মো. আলী জনি বলেন, পার্ক খুলে দেওয়া হলেও জনসমাগম কম হবে বলে আশা করছি। পার্কে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিগত সময়েও জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা কঠোরভাবে মানা হয়েছিল।

বিনোদন কেন্দ্রের পরিচালকরা জানান, ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ ও অন্যান্য সুবিধা দিলে বিনোদন কেন্দ্রগুলো আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। করোনার কারণে কোটি টাকা ব্যয় করে গড়ে তোলা বিনোদন কেন্দ্রগুলো ক্ষতির মুখোমুখি। সরকার সহযোগিতা না করলে এ প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা পরিচালনা কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম চা বোর্ডের উপসচিব রুহুল আমিন বাংলানিউজকে বলেন, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা বন্ধ থাকায় অনেক টাকার ক্ষতি হচ্ছে। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি ঠিক হলে আশা রাখি আমরা ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবো। চিড়িয়াখানা বন্ধ থাকায় প্রতিদিন গড়ে লাখ টাকার ক্ষতি হয়। ইতিমধ্যে সেখানে সৌন্দর্য্যবর্ধনের কাজ করা হয়েছে। প্রশাসনের অনুমতি পেলেই দর্শনার্থীদের জন্য চিড়িয়াখানা খুলে দেওয়া হবে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত