প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] চৌগাছা থে‌কে হা‌রি‌য়ে যা‌চ্ছে গ্রাম বাংলার ঐ‌তিহ্য বি‌চে‌লির গাদা

র‌হিদুল খান: [২] য‌শো‌রের চৌগাছা থে‌কে আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার অসংখ্য ঐতিহ্য। এমনই একটি ঐতিহ্য হচ্ছে গ্রামের কৃষাণ-কৃষাণীর বাড়ির আঙিনায় স্তুপ করে রাখা গো-খাদ্য, গ্রাম্য ভাষায় বলে বিচালির গাদা। কৃষকের ধান এখন ক্ষেতেই মাড়াই হচ্ছে তাই আগের মত বিচেলি হয়না ফলে গাদাও দেওয়া লাগে না বলছেন কৃষকরা।

[৩] ১১টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত যশোরের চৌগাছা উপজেলাতে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষের বসবাস। অধিকাংশ মানুষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত। বিশেষ করে ধান উৎপাদনে এ জনপদের প্রত্যেকেই অত্যন্ত পারদর্শী। বছরের অন্য ফসলাদি সে ভাবে চাষ করা না হলেও বোরো ও আমন মৌসুমে গ্রামের পর গ্রামের মানুষ ধান চাষে মনোযোগী হয়ে উঠেন। এমন এক সময় ছিল কৃষক মাঠের শতশত বিঘা ধান কেটে ওই মাঠে শুকিয়ে বাড়িতে এনে মাড়াই করেছেন। এরপর শুকনো ধান গোলা বা ঘরে তুলেছেন আর বিচালি বাড়ির আঙিনায় বিশাল বিশাল গাদা দিয়ে রাখতেন।

[৪] কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিতেও এসেছে পরিবর্তন। আবহাওয়া পরিবর্তন হয়েছে, অসময়ে হচ্ছে বৃষ্টি আর খরা তাই কৃষক ধানের বিচেলির চেয়ে ধানকে সংরক্ষণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেন। তাছাড়া গরু মোটাতাজাকরণসহ নানা কারণে এখন গরুর খামার গড়ে উঠছে ফলে বিচেলি বা খড় আর সারা বছর রাখা লাগে না। চাহিদার কারণে আগেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

[৫] আশির দশকে উপজেলার প্রতিটি অঞ্চলের মানুষ আমন ও আউশ ধানের চাষ করতেন। আউশধান কাটার পর তা গরু দিয়ে মাড়াই করে ধান বের করতেন চাষিরা। ধান বের করার পর তৈরি হতো পল। ওই পল গ্রামের অধিকাংশ বাড়ির পাশে গাদা দিয়ে রাখা হত। বর্ষা মৌসুমে গো-খাদ্য সংকট দেখা দিলে কৃষকের গরুর পাল সব গাদায় বেঁধে দেয়া হত। গরু মনের সুখে ওই পল খেয়ে ক্ষুদা নিবারণ করতো। আর আমনে চাষ করা ধানের বিচেলি তৈরি হত। সেই বিচালি বাড়ির পাশে বিশাল বিশাল গাদা বানিয়ে সংরক্ষণ করতেন চাষিরা। বছরের বাকি সময়ে এই গাদা থেকে বিচালি দিয়ে গরুর খাদ্য তৈরি করতেন চাষিরা।

[৬] সরেজমিন উপজেলার খড়িঞ্চা গ্রামে যেয়ে দেখা যায় গ্রামের কৃষক মিজানুর মন্ডল, ইসলাম মন্ডল বোরো ধানের বিচেলি বানিয়ে বাড়ির আঙিনায় বিশাল বিশাল গাদা তৈরি করে রেখেছেন। এ সময় কথা হয় ইসলাম মন্ডলের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিচালি গাদা গ্রামবাংলার ঐতিহ্য তো বটেই তারপর বাড়িতে পালন করা গরুর প্রধান খাদ্য। বিচেলি না হলে গরু পালন করা অসম্ভব। আমরা এখনও গরুর লাঙ্গল দিয়ে চাষাবাদ করি, সে কারণে গোয়ালে একের অধিক গরু থাকে বছরের পুরো সময়ে। তাদের খাবারের জন্য বিচালি তৈরি করি। ধান নষ্ট হলেও আমরা বিচেলি নষ্ট করিনা। এখন অনেকেই মাঠে ধান ঝেড়ে খড় বা বিচালি ফেলে রেখে শুধু ধান নিয়ে চলে আসে, যার কারণে বছরের একটি সময় গো-খাদ্যের দাম বহুলাংশে বেড়ে যায়।

[৭] পাঁচনামনা গ্রামের বয়োবৃদ্ধ কৃষক কালা চাঁদ বলেন, আগেকার দিনে গ্রামের কোন বাড়িতে বিচেলির বড় গাদা আছে, কার গোয়ালে আছে গরু, বাড়ির পাশে আছে পুকুর তার সাথে হত নতুন আত্মীয়তা। এখন আর সে গুলো দেখা হয় না। এখন গ্রামে কার পাকা বাড়ি আছে, জমি আছে কয় বিঘা তার সঙ্গে হয় আত্মীয়তা। সে সময়ে বাড়ির পাশে বিচেলি গাদা জানান দিত ওই বাড়িওয়ালা এলাকার সুনামধন্য ব্যক্তি তার সঙ্গে আত্মীয়তা করলে ভালো হবে।

[৮] আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার সকল ঐতিহ্যসমূহ যেন চিরতরে হারিয়ে না যায় সে দিকে সকলেরই নজর দেয়া উচিত বলে মনে করছেন উপজেলার সচেতন মহল। সম্পাদনা: হ্যাপি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত