প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: জবাবদিহিতা জরুরি, অসুস্থ মানসিকতা ও ভণ্ডামি আগে দূর করতে হবে

দীপক চৌধুরী: (এক) দেখলাম ফেসবুকে সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক আফসান চৌধুরী বলেছেন, ভারতীয় মিডিয়া থেকে দেশের মিডিয়া অনেক পিছিয়ে। আমাদের সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে পারে না, কারণ বিষয় জানে না, পড়াশুনা করে না। অতএব কি নিয়ে কথা বলবে বা লিখবে তাও ভালো বোঝে না। সবই দায়সারা। .. .. .. শেষের দিকে মন্তব্যে লিখেছেন, শুধু ইংরেজি নয় হিন্দি মিডিয়া অনেক উন্নত, দেখেছি আর কষ্ট পেয়েছি । করার কিছু নেই।’

আমি বলবো শুধু মিডিয়া নয়, অনেক ক্ষেত্রেই। খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা কিংবা বিজ্ঞান যেদিকেই যাই না কেনো? মানসিকভাবেও আমরা পিছিয়ে। দায়িত্বহীনতা একটা অসুখে পরিণত হয়েছে। অসুস্থ লোকের সংখ্যা বেড়ে চলছেই। গণমাধ্যমে একজন লিখেছে, “শ্রমিকের রক্তে গড়া দেবালয়ে দেবতারা হয়তো সুখেই আছে! তাই বুঝি শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা দিতেই এদের যত গড়িমসি!” নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জুস ইন্ডাস্ট্রির মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে এ লেখা। সঙ্গতকারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘ দেবালয়ের দেবতা’ নিয়ে এই তুচ্ছতাচ্ছিল্য লেখা কেন? দেবালয়ের দেবতাদের কেন টেনে আনা? সনাতন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের কাছে পূজনীয় ‘দেবালয়ের দেবতা’ নিয়ে এ ধরনের লেখা কাকে বা কাদের খুশি করার জন্য?

(দুই) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন নতুন ক্ষেত্রে, যথা, গাড়ি প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ, মহাকাশ, মেরু ও আণবিক প্রযুক্তিতে ভারত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পরিচয় দিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘মেডিকেল ট্যুরিজম’র বাজার ভারতে। কয়েকবছর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, ২০২০ সালের মধ্যে চিকিৎসা পর্যটন থেকেই ভারতের আয় হবে নয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিরাট অঙ্কের আয়ের পেছনে রয়েছে ভারতে স্বল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা, ভিসাপ্রদানে তৎপরতা ও ইংরেজি ভাষার ব্যাপক ব্যবহারের মতো একাধিক কারণ। শুধু ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের আমার ৬টি সফরের পর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে আমরা এখনো অনেক দূরে। বাংলাদেশের ঢাকায় ১২ জন প্রফেসর -ডাক্তার দেখিয়ে, শরণাপন্ন হয়ে যে রোগটিকে ‘অস্টিওমাইলিটিস’ বলে শনাক্ত করা হয়েছিল সেই অসুখটির বিষয়ে ভারতীয় চিকিৎসকরা বলেছিলেন ‘ভুল ডায়াগনসিস, এটি অস্টিওমাইলিটিস নয়।’ ঢাকায় বলা হয়েছিল ‘অপারেশন জরুরি, সেখানে উল্টোটা বলা হলো, ‘অপারেশন কেন করতে হবে?’ এতো গেল একদিক। সরেজমিনে দেখলাম, তামিলনাডুর ভেলুরে যে মুরগীর ডিমের ডজন ৪৬ টাকা সেই ডিমের ডজন আমাদের এখানে ১শ ৬০টাকা। যে লুঙ্গিটির মূল্য ৯৮ টাকা এটা এখানে ৪৮০ টাকা। ভারতে ৪৬ রুপি এক ডজন মানে ডলারে আমাদের এখানে ৫৮ টাকা ডজন ডিম হওয়ার কথা। আমরা পারি না কেন? খেয়ে এলাম সেখানে, লুঙ্গিও আনলাম। শুধু প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে মেডিক্যাল ভিসা আড়াই লাখ। ট্যুরিস্ট ভিসা, বিজনেস ভিসার কথা বাদই দিলাম। তাহলে আমরা পারছি না কেন? এর অবশ্য অন্যতম কারণ হচ্ছে দীর্ঘদিন এদেশ সামরিক স্বৈরাচার শাসন করেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর এদেশে কুখ্যাত স্বৈরাচার ও সামরিক জান্তার উত্থান ঘটেছিল। হিসেব করলে দেখা যায়, মোট ২১ বছর শাসন করেছে স্বৈরশাসকরা। তারা দেশের মঙ্গল চায়নি, অগণতান্ত্রিক সরকার কখনো জনগণের হয় না। জিয়া ও খালেদা জিয়ার অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান এদেশকে দরিদ্র হিসেবে বিশ^সভায় উপস্থাপন করেছেন। ইচ্ছে করেই পিছিয়ে রাখা হয়েছে দেশকে। এ কারণেই বাংলাদেশ তার ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি মমতাময়ী, মানবতার মা, পরিশ্রমী নেত্রী। বিশ^সভায় আজ প্রশংসিত হচ্ছে তাঁর নেতৃত্ব।

(তিন) ‘লককডাউনে’ সুস্বাস্থ্য, দুর্নীতি ও সচেতনতা উত্তরণের উপায় নিয়ে প্রতিদিন আমরা কথা বলছি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে আমাদের সাংসদ, মন্ত্রী, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, অনুজীব বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিকরা অনুরোধ জানিয়ে কথা বলছেন গণমাধ্যমে। একের পর এক শত শত রাত জেগে আমরা পরামর্শ দিচ্ছি টিভিসহ গণমাধ্যমে কিন্তু আশানুরুপ পরিবর্তন কী দেখতে পাচ্ছি? ‘লকডাউন’ তো মানানোই যাচ্ছে না। শুধু অজুহাত। এরপরও স্বীকার করতে হবে যে, স্বাস্থ্যসেবায় আমাদের অর্জন আছে। যদিও এর পরিমান কতটুকু তা নিয়ে বিতর্ক আছে।
আমরা জানি, বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্যসেবা বইটি একটি তথ্য তথ্যভাণ্ডার। একটি গুরুত্বপূর্ণ বই। কিন্তু এর ব্যবহার নেই। আমরা স্বীকার করি, এদেশের মানুষেরও বিশ^াস যে, যতদিন শেখ হাসিনার হাতে দেশ, ততদিন পথ হারাবে না বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একটু ধৈর্য্য ধারণ করুন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, আগামী দেড়মাসে পৌঁনে দুই কোটি টিকা পাচ্ছে বাংলাদেশ।

(চার) সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন মন্ত্রিসভার রদবদল ঘটান, যুক্ত করেন ৩৬ জন নতুন মন্ত্রী। এই সম্প্রসারণ ও রদবদলের পর মন্ত্রিপরিষদের বহর বেড়ে হয়েছে ৭৮। বাংলাদেশের মিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘৯০ শতাংশ মন্ত্রীই কোটিপতি।’ মন্ত্রীদের এই ‘অপরাধ প্রবণতার’ পাশাপাশি সম্পদের পরিমাণও নাকি তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। আমি বলি কী, কোটিপতি হওয়া কী অপরাধ। ব্যবসা করলে কী রাজনীতি করা যাবে না! আর রাজনীতিকের বিরুদ্ধে মামলা থাকা কী অস্বাভাবিক? বাংলাদেশে মামলা নিয়ে রাজনীতি করেছেন বহু রাজনৈতিক নেতা। বিএনপি-জামায়াতের সরকার আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মীর ওপর শতাধিক মামলা দিয়েছিল। এদেশের কোনো কোনো সাংবাদিক ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুসম্পর্ক থাকাটা যেন সহ্যই করতে পারছেন না। যেনো ‘পেটের ভাত’ হজম করার জন্যও ইনিয়ে-বিনিয়ে লিখে দুই সরকারের সুসম্পর্ক ফাটল ধরানোর অপচেষ্টা। অবশ্য, এই চক্রের ষড়যন্ত্র নতুন নয়।

(পাঁচ) হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জন মারা যাওয়ার ঘটনায় আমরা যখন শোকার্ত ঠিক তখনই এই ঘটনায় সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবুল হাসেম বলেছেন, জীবনে বড় ভুল করেছি ইন্ডাস্ট্রি করে। ইণ্ডাস্ট্রি করলে শ্রমিক থাকবে, শ্রমিক থাকলে কাজ হবে, কাজ হলে আগুন লাগবে, এ দায় আমার? সাংবাদিকদের প্রতি এক প্রতিক্রিয়ায় তা-ই উচ্চারণ করেছেন।
বাহ্ কী কথা! কী জওয়াব! তাহলে প্রশ্ন এ দায় কার? কী দায়সারা গোছের কথা! কী রকম অসুস্থ প্রতিযোগিতা ছিল ‘বড় হবার’ তা কিন্তু বলেননি। আক্ষেপ আর –আফসোস। সব দায় যেন শ্রমিকদের। কতটা নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতা হজম করতে পারা মানুষ মোহাম্মদ হাসেম তা কী আর বলতে হয়! হাসেমের মুখ থেকে এমন কথা বেরিয়ে আসা মানে কী তা বুঝে নেওয়া যায়। ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে যেসব খবর বেরিয়ে এসেছে তাতে স্পষ্ট হয়ে যায় বা এটাতে প্রমাণ করে মালিক সরকারি আইন ও বিধি ব্যবস্থা প্রতিপালন না করে ফাঁকির আশ্রয় নিতেন এবং যার কারণে এ ঘটনা। সেখানে নিরাপদ কর্ম পরিবেশ ছিল না- তা প্রতীয়মান হয়। মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা ভঙ্গ করা হয়েছে। কর্মরত অবস্থায় গেটে তালা লাগানো, কারখানাটিতে কোনোভাবেই উপর্যুক্ত নিরাপদ কর্ম পরিবেশ ছিল না। গেটে তালা দিয়ে বাইরে বেরোবার রাস্তা বন্ধ করা হবে কেন? শ্রমিক ও শিশু শ্রমিক সেখানে কীভাবে কোন পরিবেশে কাজ করতো তা প্রকাশ করতে কী আর কিছু বাকি?

রূপগঞ্জে সেজান জুস (হাসেম ফুড লি:) -এ অগ্নিকাণ্ডে ৫২ শ্রমিকের মৃত্যুতে মালিকসহ দায়ী দোষীদের গ্রেফতার, বিচার ও আহত- নিহত শ্রমিক পরিবারকে ক্ষতি পূরণ দেওয়ার দাবি উঠেছে। অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, আহতদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং ঘটনায় দায়ীদের উপযুক্ত বিচার ও শাস্তির দাবি সবশ্রেণির মানুষের। বলা হচ্ছে, শ্রম পরিদর্শক ও কারখানা পরিদর্শক এবং ফায়ার ব্রিগেড পরিদর্শকরা যদি সঠিকভাবে তাদের পরিদর্শনের দায়িত্ব পালন করতেন তাহলে এই অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জন শ্রমিকের প্রাণহানী ঘটত না। সুতরাং মোহাম্মদ হাসেমকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যদিও প্রশ্ন থেকে যায়, মৃত্যুর শোক কী অর্থকড়িতে লাঘব হয়?

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

 

সর্বাধিক পঠিত