প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রূপগঞ্জে আগুন: মর্গে যেন সাদা বস্তায় করে সব কয়লা আনা হয়েছে!

নিউজ ডেস্ক: ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের সহকারী বাবুল মিয়া বলছিলেন, ছুটির দিনে মর্গে সাধারণত কাজকর্ম কম থাকে। অনেকটা সুনসান নীরবতা। কিন্তু গতকাল শুক্রবার হঠাৎ করেই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে কারখানার আগুনে নিহতদের মর্গে নিয়ে এলে গোটা এলাকা বিলাপ আর আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে। রূপগঞ্জে ভয়াবহ আগুনে স্বজনহারাদের কান্নার ঢেউ আছড়ে পড়ে ঢাকার মর্গ পর্যন্ত। সান্ত্বনা দেওয়ারও কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না সেখানে। মর্গে একের পর এক লাশ আসছে; কিন্তু মুখ দেখে চেনার উপায় নেই কার লাশ। মর্গে যেন সাদা বস্তায় করে সব কয়লা আনা হয়েছে!!

করোনা মহামারির মধ্যে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে রূপগঞ্জের হাসেম ফুড কারখানায় কর্মব্যস্ত ছিলেন শ্রমিকরা। করোনার ভয় ঠেলে তারা কারখানার চাকা সচল রাখলেও একে একে ৪৯ জনকে কেড়ে নিয়েছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। আরও তিনজন জীবন বাঁচাতে কারখানার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা গেছেন। সমকাল

গতকাল শুক্রবার দুপুরের পর থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে পুড়ে অঙ্গার হওয়া দেহগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে আনা হয়। এরপর সেখানে ভিড় করতে থাকেন তাদের স্বজনরা। লকডাউনের বিধিনিষেধে পথে পথে বাধা আর পকেটের টাকা খরচ করে পৌঁছেন মর্গের সামনে। কিন্তু সন্ধ্যা পর্যন্ত লাশ বুঝে পাননি কেউ। এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই স্বজনরা ভিড় করেন পুড়ে যাওয়া কারখানাটির সামনে।

সাজ্জাদ হোসেন সজীবও ছিলেন কারখানাটির শ্রমিক। থাকতেন ওই এলাকার একটি মেসে। আগুন লাগার পর থেকেই তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ। বৃহস্পতিবার রাতভর তার মামা মাহফুজুর রহমান রূপগঞ্জে কারখানাটির সামনে অপেক্ষা করেছেন ভাগ্নের। কোনো হদিস পাননি। শেষ পর্যন্ত আদরের ভাগ্নের লাশটি পেতে ছুটে আসেন মর্গে।

মর্গের সামনে বিলাপ করে মাহফুজুর বলছিলেন, লকডাউনের মধ্যে বাধ্য হয়েই তার ভাগ্নে কাজে গিয়েছিল। এখন আর খুঁজে পাচ্ছেন না। এত লাশের ভেতর কাউকে চেনাও যাচ্ছে না। কীভাবে কী করবেন বুঝতে পারছেন না।

ওই কারখানার শ্রমিক জাহানারার স্বামী খোকন মিয়া রাতভর কারখানার সামনে ছিলেন স্ত্রীকে জীবিত পাওয়ার আশায়। কোথাও খুঁজে না পেয়ে ছুটে আসেন মর্গে। খোকন মিয়া বলেন, রূপগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। নির্ঘুম রাত কাটিয়ে চারশ টাকা রিকশা ভাড়া আর হেঁটে আসতে পেরেছেন মর্গে। কিন্তু তার স্ত্রী যে মারা গেছেন, লাশটা মর্গে আছে, সেই নিশ্চয়তাও কেউ দিচ্ছেন না। তবে পুলিশ নাম-ঠিকানা লিখে নিয়েছে। লাশ পেলেই জানাবে বলেছে।

জাহানারা বেগম স্বামী, দুই সন্তান- ১৫ বছরের জাকির হোসেন ও ১২ বছরের রাকিব হোসেনকে নিয়ে ভুলতা এলাকায় থাকতেন। খোকন মিয়া মর্গে স্ত্রীর মরদেহ খুঁজতে এলেও শিশু দুই সন্তান অন্য স্বজনদের সঙ্গে কারখানার সামনেই অপেক্ষা করছিলেন।

গতকাল মর্গের সামনে তানিয়া আক্তার নামের এক তরুণীর বিলাপে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না কেউই। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলছিলেন, তার ১২ বছরের ভাই হাসনাইন কারখানাটিতে কাজ করত। তাকে খুঁজে পাচ্ছেন না। লোকজনের কথায় মর্গে এসেও ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করতে পারেননি।

তানিয়ার কথায়, ‘পুলিশ লাশগুলো দেখাইছে। পুড়ে একেবারে ছোট হয়ে গেছে। চেনা যাচ্ছে না। সবার চেহারা একরকম হয়ে গেছে। সবাইরেই এখন তার ভাইয়ের মতো মনে হয়।’

রূপগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হুমায়ুন কবির মোল্লা লাশ নিয়ে মর্গে এসেছেন। তিনি বলেন, আগুনে পুড়ে নিহত হওয়া কাউকেই চেনা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় লাশ হস্তান্তর করাও সম্ভব নয়। এ জন্য যারা কারখানাটির নিখোঁজ শ্রমিকদের সন্ধান করছেন, সেই স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ডিএনএ মিলিয়ে লাশ হস্তান্তর করা হবে।

গতকাল রাত ৮টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মর্গের সামনে স্বজনরা লাশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন। কেউ কেউ স্বজন হারানোর বেদনায় কাঁদছিলেন, আবার কান্না করতে করতে কারও কারও চোখের পানিও শুকিয়ে এসেছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, তাদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকেই। দু’দিনের ধকল, ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় তাদের কান্নাও বের হচ্ছে না। মর্গের সামনে বসা তো দূরের কথা, যেন পা ফেলারও জায়গা নেই। সেই রূপগঞ্জ থেকে কাঁদতে কাঁদতে নানা বাধাবিঘ্ন পার হয়ে ঢাকায় মর্গের সামনে আসতে পারলেও সরকারিভাবে কেউ তাদের মুখে একটু পানিও তুলে দেয়নি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত