প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: ভারত পারলে আমরা পারি না কেন? আর ঢাকার চারপাশে ‘লক ডাউন’ দিয়ে কী কোনো উপকার হচ্ছে!

দীপক চৌধুরী: করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সারাদেশে ১৪ দিনের ‘শাটডাউন’ দেওয়ার সুপারিশ করেছে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। আমরা এটা জানি যে, প্রধানমন্ত্রী কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন সংগ্রহের জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত সারাদেশে একেযোগে ‘লকডাউন দেওয়া সমীচীন না হলেও গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ও জেলাগুলোতে কঠোরভাবে এটি প্রয়োগ হওয়া দরকার। আগে জীবন পরে জীবিকা। ১৯৭১-এ, আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে কোটি কোটি মানুষ নয়টি মাস খেয়ে না খেয়ে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছিল। এটা কিন্তু কম অভিজ্ঞতা নয়। বিশ^ব্যাপী প্রায় কঠিন ও অচল অবস্থা বিরাজ করছে এখন। বিশে^র বিভিন্ন দেশের মতো আমরাও অসহায়। যেসব পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করেছি সেগুলো মানুষের না মেনে চলার প্রবণতা দেখছি। নানান অজুহাত মানুষের। কর্তব্যরতদের ফাঁকি দেওয়ার জন্য একশ্রেণির মানুষের দক্ষতা লক্ষণীয়। কিন্তু এতে করে কী মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়া যাবে তা কিন্তু অনেকে ভাবছেই না। ঢাকার চারপাশে ‘লক ডাউন’ দিয়ে কোনো উপকার হচ্ছে কী?

যখন প্রথম দিকে টিকা নিয়ে এক ধরনের অপপ্রচার আর গুজব ছড়ানো হয়েছিল তখনও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সেই গুজবের সময় দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। গুজবটি যে মিথ্যা ছিল তা প্রমাণ হয়েছে। সারাবিশ^ তখন টিকার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কূটনীতিক সুদক্ষতা এতে প্রমাণ হয়েছে। তিনি সঠিকপথে এগোচ্ছিলেন। আর কি না আমাদের দেশে ধর্মভীরু মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চালানো হয়েছিল অপপ্রচার। ‘ইন্ডিয়ার টিকা কি না কি দিয়ে দেয়’ একথাও প্রচার হয়েছিল। আমরা কী ভুলে গেছি!

এখন নাকি দেশে কোভিড-১৯ রোগের ভারতীয় ডেল্টা ধরনের সামাজিক সংক্রমণ চিহ্নিত হয়েছে। ইতোমধ্যে এর প্রকাপ অনেক বেড়েছে। এ প্রজাতির জীবাণুর সংক্রমণ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘সারাদেশেই উচ্চ সংক্রমণ, পঞ্চাশটির বেশি জেলায় অতি উচ্চ সংক্রমণ লক্ষ্য করা গেছে। এটি প্রতিরোধে খণ্ড খণ্ডভাবে নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচির উপযোগিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।’
আসলে একযোগে ‘শাটডাউন’ বা ‘লক ডাউন’ যা-ই বলি না কেন- আমাদের সেদিকেই যাওয়া দরকার। আগে জীবন বাঁচাতে হবে। স্বাস্থ্যের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, অন্যান্য দেশ, বিশেষত পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অভিজ্ঞতা হলো, কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া এর বিস্তার প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। ভারতের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তাদের মতামত অনুযায়ী, যেসব স্থানে পূর্ণ ‘শাটডাউন’ প্রয়োগ করা হয়েছে সেখানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকাতে এবং জনগণের জীবনের ক্ষতি প্রতিরোধে কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে সারাদেশে কমপক্ষে ১৪ দিন সম্পূর্ণ ‘শাটডাউন’ দেয়ার সুপারিশ করছে। এতে বলা হয়, জরুরি সেবা ছাড়া যানবাহন, অফিস-আদালতসহ সবকিছু বন্ধ রাখা প্রয়োজন। এ ব্যবস্থা কঠোরভাবে পালন করতে না পারলে আমাদের যত প্রস্তুতিই থাকুক না কেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অপ্রতুল হয়ে পড়বে।

করোনার তিনটি ধরন সংক্রমণ বাড়াচ্ছে। যেখানে ভারত নিয়ে আমরা খুব উদ্বেগ প্রকাশ করতাম সেই ভারত এখন চমৎকার উন্নতির পথে। ভারতে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্তের হার ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ভারতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫১ হাজার ৬৬৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছেন ১ হাজার ৩২৯ জন। আজ শুক্রবার এনডিটিভি অনলাইনের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।

গণমাধ্যমে দেখলাম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বৈশ্বিকভাবে করোনায় আক্রান্ত মৃত্যু নিয়মিতভাবে কমলেও বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশে সংক্রমণ এবং মৃত্যু দুই–ই বাড়ছে। উদ্বেগ সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাসের চারটির মধ্যে তিনটি ধরনই ( ভেরিয়েন্ট) বাংলাদেশে সক্রিয়। এই তিন ধরনের উৎপত্তি যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতে। এখন প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে। ভারতে সংক্রমন কমেছে আর বাংলাদেশে হু হু করে বাড়ছে। আগের সপ্তাহের তুলনায় বাংলাদেশে নতুন শনাক্ত রোগী বেড়েছে ৫৫ শতাংশ এবং মৃত্যু বেড়েছে ৫৪ শতাংশ। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। পরীক্ষায় চুয়াডাঙ্গা জেলায় শতভাগ নাকি সংক্রমিত হয়েছে। অর্থাৎ ৫০ জনকে পরীক্ষা করা হলে ৫০জনই সংক্রমিত পাওয়া গেছে।

শুক্রবারের বাজারে গিয়ে অবাক হয়ে দেখলাম, ঘাটে-মাঠে-হাটে সতর্কতার বালাই নেই। মাস্ক ব্যবহার তো ১০%ও নেই। ব্যবহার করলেও অনেকের থুতনিতে মাস্ক। সচেতনতার বদলে ঠেলাধাক্কা দিয়ে পণ্য কেনার প্রতিযোগিতা। ঘাড়ের ওপর পড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশি। সুতরাং প্রশাসনের কঠোর হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। পিঠে হাত বুলিয়ে সচেতন করা খুবই কঠিন কাজ।

গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, ২৪ ঘণ্টায় ৬ হাজার ৫৮ জন করোনায় নতুন আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার প্রায় ২০ শতাংশ। এই সময় মারা গেছেন ৮১ জন। গত তিন সপ্তাহে শনাক্তের হার ক্রমান্বয়ে বাড়তে দেখা গেছে। পাশাপাশি ১৪ জুন থেকে প্রতিদিন মৃত্যু ৫০ জনের বেশি ছিল। বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ভারতে টানা ১৮ দিন ধরে ৫ শতাংশের নিচে করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ভারত পারলে আমরা পারবো না কেন?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো দেশে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে ধরা যায়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রাজশাহীর ছয়জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের চারজন, নওগাঁর তিনজন ও নাটোরের একজন। মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন করোনা পজিটিভ ছিলেন। আগের দিন (বৃহস্পতিবার) রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডে মারা গিয়েছিলেন ১৮ জন। এ নিয়ে চলতি মাসে এ হাসপাতালে করোনা ও করোনার উপসর্গ নিয়ে মোট ২৬৯ জন মারা গেলেন।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

সর্বাধিক পঠিত