প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আওয়ামী লীগের এখনকার চ্যালেঞ্জ এবং জনপ্রত্যাশা

মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার: বাংলাদেশে মানেই আওয়ামী লীগের ইতিহাস, একইসঙ্গে স্বাধীনতার ইতিহাস মানে আওয়ামী লীগের ইতিহাস। আওয়ামী লীগের ইতিহাস বলতে গেলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম সবার আগে আসবে। আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। একাটি বাদ দিয়ে অন্যটিকে মূল্যায়ন করলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। ৭২ বছর ধরে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনৈতিতে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। তৃতীয় বিশ্ব, আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের যে স্বাধীনাতার ইতিহাস ও সংগ্রাম রয়েছে সেগুলো থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ও সংগ্রাম ভিন্ন।

আওয়ামী লীগ যখন গঠিত হয় বঙ্গবন্ধু তখন কোনো শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন মাঝারি মানের নেতা। কিন্তু আওয়ামী লীগ গঠনের উদ্যোগ বা চিন্তা তিনিই প্রথম করেছিলেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বাঙালিদের পক্ষে ছিলেন শুধু শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হক ও মওলানা ভাসানী। অন্যরা শুরু থেকে পাকিস্তানের লেজুর বৃত্তি করেন। জনগণের পক্ষে মুসলিম লীগের বিপরীতে একটি দল গঠন করার জন্য শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের কাছে প্রস্তাব নিয়ে গেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক তার ব্যক্তিগত সমস্যা দেখিয়ে তার প্রস্তাবে রাজি হলেন না।

তখন মওলানা ভাসানী আসামের মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। বঙ্গবন্ধু সেই প্রস্তাব নিয়ে মওলানা ভাসানীর কাছে গেলেন এবং তিনি তাতে রাজি হলেন। তখন মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠিত হলো আওয়ামী মুসলিম লীগ। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বচনে মওলানা ভাসানীর কাছে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাব ছিলো আমারা কোনো কোয়ালিশনে যাবো না, এককভাবে নির্বাচন করবো। প্রথমে ভাসানী রাজি হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হকসহ বিভিন্ন ইসলামিক দলের সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেন। কিন্তু দেখা গেলো সে নির্বচনে আওয়ামী মুসলীম লীগ একাই ৩০৬টি আসনের মধ্যে ১৪৩টি আসন পেলো।

ফজলুল হকের দল পেয়েছিলো মাত্র ৪৮ টি আসন। কিন্তু পূর্বেই বলা হয়েছিলো, নির্বাচনে জয়ী হতে পারলে তিনিই হবেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু নির্বচন শেষে যুক্তফ্রণ্টের মধ্যে ভয়াবহ দলীয় কোন্দাল শুরু হলো সরকার গঠন নিয়ে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন নাটকীয় ঘটনা ও চক্রান্ত শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপলব্ধি করলেন মানুষের অধিকার আদায় করতে হলে নতুন আঙ্গিকে দল গঠন করতে হবে। পরবর্তী সময়ে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দী নেই। অন্যদিকে মওলানা ভাসানী আলাদা হয়ে গেছেন এমন পরিস্থিতিতে আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশকে প্রধান করে আওয়ামী লীগ গঠন করা হলো। এরপরে বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফা দিলেন তখন তর্কবাগীশ প্রচÐভাবে তার বিরোধিতা করলেন। ১৯৬৬ সালের মার্চ মাসের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু হলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি। এভাবে শত বাঁধা বিপত্তি উপেক্ষা করে বাঙালির অধিকার আদায়ের জন্য বঙ্গবন্ধু নতুন আঙ্গিকে তৈরি করলেন আওয়ামী লীগকে। তিনি যেভাবে চিন্তা করতেন ঘটনা সেভাবেই ঘটতো।

শাসক গোষ্ঠীর প্রচন্ড প্রতিক্রিয়া থাকবে জেনেও তিনি ছয় দফা প্রণয়ন করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন প্রচÐ জাগরণ ছাড়া বাঙালি জাতির মুক্তি সম্ভব নয়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যতো প্রতিক্রিয়া ও আঘাত আসবে বাঙালি জাতি ততো জেগে উঠবে। নানা ঘাত-অভিঘাত- প্রত্যাঘাত, জেল-জুলুম, অত্যাচারের মধ্যে দিয়ে ১৯৬৯ সালের অভ‚্যত্থান ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সফলতা আসে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের হাত ধরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীনাতা অর্জন করে। ধাপে ধাপে তিনি বাংলাদেশকে সুখি, সমৃদ্ধ করার সকল পন্থা বাংলাদেশের সংবিধানে সন্নিবেশিত করলেন। বাঙলি জাতির মুক্তি, মানুষের অধিকার ও ক্ষমতাকে জনগণের কাছে পৌছে দেওয়ার জন্য তিনি বাকশাল গঠন করলেন। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধকে হত্যা ও সামরিক শসনের ফলে বাংলাদেশ গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়। কিন্তু সকল বাধা বিপত্তি উপক্ষো করে ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা যখন বাংলাদেশে আসেন তখন আওয়ামী লীগ নতুনভবে পুনরুজ্জীবিত হতে থাকে।

১৯৫৫ সালে বঙ্গবন্ধু যে আওয়ামী লীগ গঠন করেছিলেন আর আজকের দিনের আওয়ামী লীগের মধ্যে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। সেই আওয়ামী লীগ থেকে বর্তমান আওয়ামী লীগের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। তার কারণ হলো বৈশ্বিক পরিবর্তন, বাংলাদেশের মানুষের চিন্তা চেতনার পরিবর্তন হয়েছে, অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের পরিবর্তন করতে পেরেছে বলেই আওয়ামী লীগ অন্যান্য দলের থেকে ভিন্ন। বাস্থবতাকে বিবেচনায় নিয়ে নিজেদের পরিবর্তন করতে পেরেছে বলেই আজকে ‘বাংলাদেশ’ আওয়ামী লীগের হাত ধরে উন্নতি সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং একটি মর্যদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে পরিচিতি পেয়েছে।

তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজকের বাংলাদেশকে সমালোচনা করলে দেখা যাবে অনেক আদর্শগত বিচ্যুতি হয়েছে। কারণ বঙ্গবন্ধুর যে অসাম্প্রদায়িক রষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন ছিলো সেই জায়গায় আমরা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে আছি। অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে তবে এখনো আমাদের ২ কোটি মানুষ দরিদ্র রয়েছে। বাংলাদেশকে এখনো সম্পূর্ণভাবে অসম্প্রদায়িক করা যায়নি যা বঙ্গবন্ধুর অন্যতম লক্ষ্য ছিলো। আওয়ামী লীগের এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল উন্নতি ও সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করতে হয় তাহলে বঙ্গবন্ধুর যে দর্শন তা বাস্তবায়ন করেতে হবে। ধর্মান্ধ ও উগ্রবাদী রাজনীতি থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে হবে। আওয়ামী লীগের এই প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে মানুষের প্রত্যাশা হলো বঙ্গবন্ধুর যে রাজনৈতিক দর্শন আছে তা বাস্তবায়ন করা। সেটা করতে পারলেই বঙ্গবন্ধুর যে সোনার বংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ছিলো তা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন হবে।
পরিচিতি : নিরাপত্তা বিশ্লেষক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহিন হাওলাদার।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত