প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. মঞ্জুরে খোদা: গবেষণা বলছে লকডাউন ও অনলাইন শিক্ষার অনেক ক্ষতি, বাংলাদেশ নির্বিকার

ড. মঞ্জুরে খোদা: এমন অনেক বিত্তশালী ব্যক্তি আছেন যারা স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের বাসায় এনে নিজের সন্তানকে লেখাপড়া করাতে পারেন অথবা নিজ অর্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বানিয়ে নিজের সন্তানকে সেখানে পড়াতে পারেন, কিন্তু এমনটা সভ্য দুনিয়ায় নেই, ঘটছে না। কারণটা কি? একটা স্কুলের যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আন্তসংযোগ ও দক্ষতা-সক্ষমতা বৃদ্ধির যে বৈচিত্রময় বাস্তব পরিবেশ তৈরী হয় সেটা অর্থ-প্রতিপত্তি দিয়ে করা যায় না। সে কারণেই ধনী ও ক্ষমতাবানদের সন্তানদেরও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাঙ্খিত ও ভাল-মন্দ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকতে হয়। এবং সেখান থেকে অর্জিত জ্ঞান তারা তাদের কর্ম ও ব্যবহারিক জীবনে কাজে লাগায়। ব্যক্তির বিকাশ ও প্রকাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব বুঝতেই এই কথাগুলো বলা। আর সেই প্রতিষ্ঠানগুলো কোন যুক্তিপুর্ণ কারণ ছাড়া বছরের পর বছর বন্ধ করে রাখা শুধু কান্ডজ্ঞানহীনতা বিষয় নয়, অন্যায়ও।

শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, “দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল আরো একবছর বন্ধ থাকলে শিক্ষার তেমন কোন ক্ষতি হবে না। তিনি শুধু একজন চিকিৎসক নন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞও। তাঁর কাছ থেকে এমন বক্তব্য শোনার পর মনে হয়েছে, বাংলাদেশের শিক্ষা তাদের কাছে কতটা নিরাপদ? উনাদের হাত ধরে শিক্ষার কিভাবে উন্নতি হবে? যেখানে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিক্ষার যাতে মান কমে না যায়, যে কোন মূল্যে শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়, তার জন্য নানা পরীক্ষা-নীরিক্ষার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন- তখন আমাদের শাসকরা নির্বিকার, নির্লিপ্ত, উদ্বেগ ও উদ্যোগহীন।

১। নেদারল্যান্ডের স্কুলের চতুর্থ শ্রেণী থেকে সপ্তম শ্রেণী পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের উপর অংক, ভাষা ও অন্যান্য বিষয়ে তাদের পরীক্ষার ফলাফলের উপর এক গবেষণা করা হয়। সারে তিন হাজার শিক্ষার্থীর উপর চালানো জরিপে দেখা যায়-
ক. করোনার স্কুল বন্ধ থাকলে যেমন ক্ষতি হয় বাসা থেকে স্কুল করলেও প্রায় একই রকম ক্ষতি।
খ. লকডাউনের সময় অনলাইন স্কুলের শিক্ষার্থীদের যে পরীক্ষা হয়েছে এবং লকডাউনের পূর্বে সাধারণ সময়ে চলা শিক্ষার মান, ফলাফলের মধ্যে প্রার্থক্য দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের অংক, ভাষা ও অন্যান্য বিষয়ের ফল-মান বাড়েনি বরং কমেছে।
গ. লকডাউনের সময় অনলাইন স্কুলের কারণে অল্প আয়, প্রতিবন্ধী শিশুদের ক্ষতির পরিমান অধিক হয়েছে।
ঘ. ওইসিডি দেশগুলোর তুলনামুলক ফলাফলও দেখা গেছে অংক, ভাষা অন্যান্য বিষয়ে তাদের গড় মান ২ থেকে ৫ স্তর পর্যন্ত কমেছে।

এই গবেষণা প্রমান করে লকডাউনে অনলাইন শিক্ষা’ শিক্ষার ধারাবহিকতা হলেও শিক্ষার মান না বাড়িয়ে বরং কমিয়েছে। যা মন্দের ভাল হিসেবে এই বাস্তবতায় গ্রহন করতে হয়েছিল।

২। পেনডেমিকের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার কি ধরণের ক্ষতি হয় এবং শিক্ষার্থীদের ফলাফলে তার কি ধরণের প্রভাব পরে সে বিষয়ে কানাডার অন্টারিও প্রদেশ প্রায় ৩ হাজার ছাত্র-শিক্ষকের উপর এক জরিপ হয়। সেখানে শিক্ষকরা বলছেন, অনলাইন শিক্ষায় শিক্ষার মান ও ফলাফল ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে আর শিক্ষার্থীরা বলছেন, করোনায় তাদের কর্মহীনতা ও আর্থিক অনিশ্চয়তা ও অনলাইন ক্লাস-পরীক্ষার কারণে তাদের উপর বাড়তি মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে তাদের পরীক্ষার ফলাফল আশানুরুপ হচ্ছে না। যে কারণে শিক্ষার মান কিছুটা কমছে এবং শিক্ষা প্রাণবন্ত হচ্ছে না।

৩। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে ভারতের দিল্লীতে শিক্ষার্থীদের কি ধরণের সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থের ক্ষতি হয় সে বিষয়ে এক গবেষণা দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের ফলাফল ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ক্লাস-পরীক্ষা অনলাইন নির্ভর হওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিতে আষক্তি হয়ে পড়ছে। ঘরে থাকা ও চলাফেরা না করবার কারণে শিক্ষার্থীদের ওজন বেড়ে গেছে এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের যথেষ্ট ক্ষতি হচ্ছে।

আর যে সব দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একেবারেই বন্ধ, নামমাত্র অনলাইনের ক্লাস-পরীক্ষা হচ্ছে সেখানে শিক্ষার অবস্থা কি এখান থেকে একটু কল্পন করুন। বাংলাদেশে এসব বিষয় নিয়ে সরকারী পর্যায়ে কোন গবেষণার নেই, সরকারের নীতিনির্ধারকরা এসব বিষয় নিয়ে কোন দায় বোধ করেন না। যে কারণে বাংলাদেশের শিক্ষার মান, এর প্রভাব-পরিণতির চিত্র পাওয়া যায় না।

“দেশে নতুন করে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় আবারও এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। সরকার ন্যূনতম সিলেবাসের ভিত্তিতে ক্লাস-পরীক্ষার পরিকল্পনা করেছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘পরীক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই, তোমরা বাসায় বসে নিয়মিত পড়ালেখা করে সিলেবাস শেষ করবে। তার সঙ্গে সুস্থ থাকতে হবে। জীবন থেকে এক বছর চলে গেলেও কিছু হবে না, তার চেয়ে সুস্থ থাকাটা বড় বিষয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষাব্যবস্থার যে ক্ষতি হচ্ছে তা কাটিয়ে ওঠার জন্য নানা পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে।“

শিক্ষামন্ত্রী সুস্থ থাকা বলতে কি বুঝতে চেয়েছেন? তিনি কি শুধু শরীর নিয়ে বেঁচে থাকাটাকেই সুস্থতা বুঝিয়েছেন? উন্নত দেশগুলো কি তারা তাদের নাগরিকদের সুস্থতা নিয়ে দায়িত্বশীল নয়? সম্প্রতি বাংলাদেশে- আঁচল ফাউন্ডেশন দাবি করছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ১৫ মাসে অন্তত ১৫১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে! তাদের ভাষ্যে দেশে মোট আত্মহত্যা বেড়েছে প্রায় ৪৫ ভাগ। তিনি কি বলবেন এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা?

বাংলাদেশে প্রায় ১৬ সাসে এখন পর্যন্ত মোট করোনা টেষ্ট হয়েছে প্রায় ৬২ লাখ। এই হারে টেষ্ট করলে বাংলাদেশের সব মানুষকে টেষ্ট করতে লাগবে ৪০২ মাস, মানে প্রায় সাড়ে ৩৩ বছর! প্রতিবেশী ভারতের তুলনায় আমরা করেছি প্রায় ১৪ শতাংশ টেস্ট, পাকিস্তানের তুলনায় ৬০ শতাংশ টেস্ট, কানাডার তুলনায় ৪ শতাংশ টেস্ট, সিঙ্গাপুরের তুলনায় প্রায় ১.৭ শতংশ টেস্ট করেছি। এ সব দেশ আমাদের মতো সারাবছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রাখেনি। আমাদের দেশে শিক্ষার মানের ক্রমাবনতি নিয়ে অনেক আলাপ-প্রশ্ন আছে। করোনায় সরকারের কান্ডজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত শিক্ষাকে ধ্বংসের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

শিক্ষামন্ত্রী বলছেন একবছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে- লেখাপড়ার তেমন ক্ষতি হবে না, তিনি কিসের ভিত্তিতে এমন কথা বললেন তা আমার বোধগোম্য নয়। কিন্তু আমরা জানি শিক্ষা কিভাবে প্রতিদিন, প্রতিমাস, প্রতিবছর মানবিক ও সামাজিক পুঁজি সৃষ্টি করে- ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশে এগুলো নিয়ে নানামাত্রিক ব্যবহারিক গবেষণা হয় না, যেখানে সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ব্যায় একশো কোটি টাকা, সেখানে এমন চিন্তা করা সত্যিই কঠিন। অথচ অগ্রসর দেশগুলো শিক্ষার মান উন্নয়নে অর্থনৈতিক গতি-প্রবাহের সাথে সঙ্গতি রেখে প্রতিনিয়ত এই কাজগুলো করে।

দীর্ঘ লকডাউনের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষন-প্রশিক্ষনের বড় ধরণের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একই সাথে ক্লাস-পরীক্ষা না দিয়ে শিক্ষার্থীরা পরবর্তী শ্রেণিতে চলে গেছে। এর সাথে শিক্ষার্থীদের মনোস্তাত্বিক ও পরিবেশগত যে ক্ষতি ও পরিবর্তন ঘটেছে তাকে বিবেচনায় নিয়ে সে ঘাটতি পুরণের সুদূরপ্রসারী সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দরকার। পূর্বের ক্লাসের অপঠিত-অনার্জিত জ্ঞান ও পাঠের সাথে বর্তমানে সংযোগ ঘটনোটা গুরুত্বপূর্ণ। সেটা না করা গেলে সে ঘাটতি একজন শিক্ষার্থীকে আজীবন বহন করতে হবে। সমগ্র শিক্ষার্থীদের ঘাটতি ও ক্ষতির হিসেবে করলে তা হবে লক্ষবছরের বিশাল ক্ষতি। সে ঘাটতি নিয়েই কি একটি প্রজন্মকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবেন? ব্যক্তির সেই ঘাটতি তো রাষ্ট্রের ও সমাজেরও ঘাটতি, সেটা বিবেচনা না করাটা প্রচন্ড দায়িত্বহীনতা, শিক্ষার প্রতি চরম অবহেলা ও অবজ্ঞা।

সমাজের চরম নৈরাজ্য, অস্থিরতা, অরাজকতা, স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রীকতা, অসততা, মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমহীনতা শিক্ষার অন্তর্গত দূর্বলতা ও সংকট। মেধা-বুদ্ধি একজন মানুষের জন্মগত কিন্তু তাদের মধ্যে যে সুপ্ত প্রতিভা আছে তাকে শিক্ষার মাধ্যমে বিকশিত করতে হয়। আর সে কাজটা হয়ে থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, তাকেই যদি করোনার দোহাই দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয় তাহলে সে মেধা-প্রতিভার বিকাশ ঘটবে কিভাবে? অবস্থা দৃষ্টে তো মনে হয় তারা সেটা চান না। কারণ প্রচলিত খন্ডিত-নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাও যে শাসকের অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ করে তার প্রাতিষ্ঠানিকতাই কি তাদের ভয়? সে কারণেই কি দায়হীন ভাবনায় নির্বিকার বসে আছেন?

লেখক:  শিক্ষা উন্নয়ন গবেষক, এক্টিভিস্ট, সাবেক ছাত্রনেতা।

সর্বাধিক পঠিত