প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হাসান আলী: বার্ধক্যে অবহেলা এবং আপনার করণীয়

হাসান আলী: বার্ধক্য হলো জীবনের শেষ ধাপ। বেঁচে থাকলে সবাইকে বার্ধক্যে উপনীত হতে হবে। মানুষ যৌবনের বন্দনা করে আর বার্ধক্যের নিন্দা করে। বুড়ো মানুষকে কম-বেশি সবাই কিছুটা বিরক্তির চোখে দেখে। মানুষ কোনো কিছু বোঝার আগেই বার্ধক্যে পৌঁছে যায়। প্রস্তুতি বিহীন এই বার্ধক্যে প্রবেশ করে অনেকেই অস্থির হয়ে পড়েন। পরিবার পরিজন, আত্মীয় স্বজনের কাছে অবহেলার শিকার হন। মানুষ অচেনা বার্ধক্যের জগতে প্রবেশ করে অসহায় চোখে ফেলে আসা অতীতে ফিরে যান। ষাট বছর অতিক্রম হলেই ৪/৫ টি রোগের সাথে বসবাস শুরু হয়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টরল, বাত-ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেপটিক আলসার, ক্ষুধামন্দা, নিদ্রাহীনতা, স্মৃতি হারানো (ডিমেনশিয়া), চোখের সমস্যা, কানের সমস্যা, দাঁতের সমস্যা ইত্যাদি।

বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মানুষ তার আয়ের প্রায় পুরোটাই সংসারের ব্যয় নির্বাহ এবং সন্তান সন্তুতি মানুষ করতে ব্যয় করে ফেলেন। বেশির ভাগ প্রবীণ প্রায় শূন্য হাতে বার্ধক্যকে বরণ করে নেন। অথচ একজন প্রবীণের বার্ধক্যে ব্যয়ের পরিমাণ বেশি। তার চিকিৎসা, ঔষধপত্র বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা ব্যয় হয়। বেশির ভাগ প্রবীণই ঠিকমত চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে পারেন না। পরিবার এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, জয় কালে ক্ষয় নাই, মরণ কালে ঔষধ নাই। বুড়ো মানুষের অসুখ-বিসুখ থাকবেই। আমাদের সমাজে প্রবীণ বিরোধী একটা মনোভাব রয়েছে। আমরা বুড়ো মানুষকে সহ্য করতে পারি না। কোনো কোনো প্রবীণ সন্তানের হাতে লাঞ্ছিত হন। কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের দ্বারা লাঞ্ছিত হন।

প্রবীণকে যারা সেবা দেন তারাও কম-বেশি হেনস্তা করে থাকেন। পুরানো ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে কিংবা অপমানজনক আচরণ করে কেউ কেউ তৃপ্তি লাভ করেন। খোঁটা দিয়ে, বিকৃত নামে ডেকে, বিশেষ কোনো শব্দ উচ্চরণ করে, অপবাদ দিয়ে, টিটকারি-মশকরা ইত্যাদির মাধ্যমে প্রবীণকে যথেষ্ট অবহেলা করে থাকেন। এমনকি জামা কাপড়ে সুতা বেঁধে এবং নোংরা কথা লিখে কাগজ সেঁটে দেন। অনেক মানুষ এ নিয়ে হাসাহাসি করেন, তাদের মধ্যে শিক্ষিত মানুষরাও রয়েছেন। প্রবীণকে রাগিয়ে দিয়ে কেউ কেউ মজা পান। এসব চরম নিষ্ঠুরতা। প্রবীণের নিয়ন্ত্রণে কোনো সম্পদ থাকলে তার উপর লোলুপ দৃষ্টি পড়ে। কৌশলে সম্পদ হাতিয়ে নেয়ার প্রবণতা থাকে। প্রবীণ ক্রমেই অসহায় হয়ে পড়েন। সমাজে পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাকে কেউ আমলে নেয় না। প্রবীণের প্রতি আমাদের পরামর্শ থাকে, আপনি মসজিদে যান, নামাজ রোজা করেন, বিশ্রাম নেন, আপনার কোনো কথার দরকার নাই। প্রবীণ যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে, তার যেন আর কিছু দেয়ার নেই। অথচ আমরা উপরের দিকে তাকালে দেখতে পাই দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রবীণরা।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামাত, সিপিবি, বাসদ-এর নেতৃত্বে রয়েছেন প্রবীণরা। দেশের অর্থনীতির গুরু দায়িত্ব পালন করছেন ৮৩ বছরের অর্থমন্ত্রী। গ্রামীণ ব্যাংকের ড. ইউনুস, ব্র্যাক-এর ফজলে হাসান আবেদ এই দুটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং আছেন। প্রবীণরা মূলত নিঃশেষ হয়ে যায় না। এদের অভিজ্ঞতা-দক্ষতা-সেবাকে আমরা ঠিকভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছি। যিনি আজকে নবীন তার এর বিষয়ে শুনে কী লাভ? আজকের নবীনই আগামী দিনের প্রবীণ। আজকের নীবনই বেঁচে থাকলে আগামী দিন তাকে প্রবীণ জীবন গ্রহণ করতে হবে। ফলে প্রবীণ জীবনের প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে। নবীন যদি তার আয়ের মাত্র ১০% সঞ্চয় করতে পারেন তবে তিনি বার্ধক্যে অর্থ সঙ্কটে পড়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। নবীন বয়সে সু-সাস্থ্যের অধিকারী হলে প্রবীণ কালেই তিনি কর্মক্ষম থাকবেন। নবীন বয়সে পরিমিত আহার, ব্যায়াম, সুস্থ-প্রশান্ত মন নিয়ে জীবন অতিবাহিত করলে তিনি প্রবীণ বয়সে স্বস্তিদায়ক শান্তিপূর্ণ জীবন পাবেন। নবীন বয়সে সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন। সন্তানের যত্ন নিন। সন্তানের সামনে পারিবারিক ঝগড়া, নিন্দা, কুৎসা থেকে বিরত থাকুন। সন্তানকে ঘুষ দিবেন না। তাকে পুরস্কৃত করুন। প্রশংসা করুন।

আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলুন, সমর্থন দিন, সমালোচনা বন্ধ রাখুন। বার্ধক্যে এই সন্তান আপনার সবচেয়ে কাছের বন্ধু হবে। আপনার বার্ধক্য হবে স্বস্তিদায়ক ও আনন্দময়। শরীর সুস্থ রাখার জন্য চিনি এবং লবণ কম খাবেন। দৈনিক ৬০ গ্রামের বেশি প্রোটিন গ্রহণ করবেন না। দৈনিক ৫/৬ বার খাবার খান কিন্তু পরিমাণে অল্প। ভরপেট খাবার থেকে বিরত থাকুন। তামাক, জর্দা, লালমাংস, এড়িয়ে চলুন। প্রতিদিন অন্ততঃ ৩০ মিনিট হাঁটুন। সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করুন। নালিশ, অভিযোগ এবং পরামর্শ দিতে যাবেন না। শিশু-কিশোরদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলুন। তাদের সাথে গল্প করুন। অভিজ্ঞতা বিনিময় করুন। ‘আজকালকার ছেলেমেয়েরা খারাপ’ এমন মন্তব্য করবেন না প্লিজ।

লেখক : বার্ধক্য বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়নকর্মী

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত