প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] ভারতে মহামারির এপিঠ-ওপিঠ একদিকে স্টক আউট নতুন মডেলের দামি মার্সিজিস, অন্যদিকে ঘরছাড়া দরিদ্র

লিহান লিমা: [২] মহামারীর দ্বিতীয় মাত্রার সংক্রমণের ঠিক মাঝখানে মার্সিডিস বেঞ্জ এজি সম্প্রতি ভারতে তাদের মেবেচ স্পোট ইউটিলিটি গাড়ি এনেছে। জার্মান স্বয়ংক্রিয় গাড়ি প্রস্তুতকারী কোম্পানিটি ২০২১ সালের শেষ নাগাদ ৫০টি গাড়ি বিক্রির লক্ষ্য নিয়েছিলো, যদিও তা এক মাসের মধ্যেই স্টক আউট হয়ে যায়। ভারতের জনসাধারণের বার্ষিক মাথাপিছু আয় যখন প্রতিবেশি বাংলাদেশের চেয়ে নিচে অর্থাৎ ২ হাজার ডলারেরও নিচে নেমে গিয়েছে তখন অতিধনীরা ৪ লাখ মার্কিন ডলারের গাড়ি নিমিষেই কিনে নিয়েছেন। ব্লুম বার্গ

[৩] সাধারণত উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে চরম বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। বিখ্যাত কুজনেটস বক্ররেখা তত্ত¡নুযায়ী একটি দেশের অর্থনীতি বিকাশিত হওয়ার সময় বাজারের গতি প্রথমে বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তীতে সমাজের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস পায়। এই বিতর্কিত হাইপোথিসিসের যোগ্যতা যাই হোক না কেনো মহামারী বৈষম্যের যে প্রকট ফাঁক উন্মুক্ত করেছে তা কোনোভাবেই অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল্য হতে পারে না।

[৪] ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি হলো বিলিওনারদের সম্পদের ক্রমবৃদ্ধি ও গ্যারেজে বিলাসবহুল গাড়ির চিত্রের উল্টোদিকে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, মধ্যবিত্তের সঞ্চয় হ্রাস ও দরিদ্র পরিবারগুলোর অনাহারে থাকা। অর্থনীতিবিদরা তীব্র খাদ্য সংকটের সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

[৫] জুতো প্রস্তুতকারী শ্যামবাবু নিগাম করোনা আক্রান্ত স্ত্রীর হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে ৮ হাজার ২৩০ ডলারে নিজের বাড়িটি বিক্রি করে দেন। তার তিনটি চামড়া সেলাই মেশিনও হাতছাড়া হয়েছে। ঋণগ্রস্ত এই দম্পতি এখন পার্শ্ববতী গ্রামে ভাড়া নিয়ে থাকেন।

[৬] ভারত সরকার গত মে মাসে ছোট ব্যবসায়ীদের সহায়তার যে জরুরি উদ্যোগ নিয়েছিলো সে সাহায্য নিগামের মতো অনানুষ্ঠানিক ছোট ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছায়নি। দরিদ্র পরিবারগুলো আয়ের অভাবে নিজেদের খাদ্য তালিকা থেকে মাছ, মাংস, ডিম, ফল বাদ দিয়েছে যা ৮০ কোটি দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে পুষ্টিহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দ্বিতীয় বছরের মতো পুষ্টিহীনতার সংকট এড়াতে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দরিদ্র পরিবারগুলোর কমপক্ষে তিন মাস পর্যন্ত দিনে ২ ডলারের বেশি স্থিতিশীল আয়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন। সরকার থেকে নগদ যে অর্থ সহায়তার কথা বলা হয়েছে তা দরিদ্র জনসাধারণের গৃহস্থালি ব্যায়ের মাত্র ১০ শতাংশ। এটি নিয়ে কোনো বাস্তবিক পরিকল্পনাও গৃহীত হয় নি। তারওপর গ্যাসোলিন ও করোনার ঔষধের ওপর সরকারের কর আরোপ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ দিতে চড়া সুদ সাধারণ নাগরিকদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন করে তুলেছে।

[৭] এই বছর বিলিয়নার গৌতম আদনি ৪৩ বিলিয়ন ডলার নেট সম্পদ নিয়ে মুকেশ আম্বানির পরই এশিয়ার দ্বিতীয় শীর্ষ ধনীর তালিকায় নাম লিখিছেন। ধনী বিনিয়োগকারী রাধাকৃষ্ণ দামানি এপিলে মুম্বাইতে ১৩৭ মিলিয়ন ডলারের ম্যানশন কিনেছেন, যা দেশটিতে এ পর্যন্ত শীর্ষ দরে বিক্রি হওয়া কোনো বাড়ি।

[৮] মাঝারি ও ছোট স্টিল প্রস্তুতকারকরা নিজেদের সক্ষমতার ৬২ ভাগ ব্যবহার করতে হিমশিম খাচ্ছেন অন্যদিকে ৫টি বৃহত্তর উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের বাজার শেয়ার এক বছরে ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৮ শতাংশে উত্তীর্ণ হয়েছে।

[৯] ভারত সরকারের বাজেটের ঘাটতি ২০৬ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই ঘাটতি সাধারণ পরিস্থিতিতে জিডিপির ৬.৮ শতাংশ হলেও এপ্রিল ও মে’তে করোনার মারাত্মক সংক্রমণের কারণে তা এখন আরো বেশি হতে পারে। উৎপাদন প্রত্যাশার চেয়ে ধীর ও কর আদায় কম হবে। আর সরকার যখন ব্যয়ের চেয়ে কম কর আদায় করবে তখন ব্যক্তির হাতে অধিক অর্থ থাকবে।

[১০] ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য লাহিড়ী বলেন, সরকারের এই বছরের ব্যয় পরিকল্পনায় টিকার ডোজ নিশ্চিতকরণ প্রাধান্য পাওয়া উচিত ছিলো। এমনকি যদি প্রতি ডোজের মূল্য ১০ ডলারও হয়, যা রাজস্ব ঘাটতিতে জিডিপির ০.৮ শতাংশ যোগ করবে তাও লাভজনক ব্যয় হবে।

[১১] এখন পর্যন্ত ১’শ কোটি প্রাপ্তবয়স্কের মাত্র ৫ শতাংশকে টিকা দেয়া হয়েছে। স্থানীয় লকডাউন শিথিল করার পর ২ কোটি ৩০ লাখ দিনমজুর নিজেদের জীবনযাত্রার তাগিদে কাজের জন্য বের হতে বাধ্য হয়েছেন। বেতনভূক্ত শ্রেণীও ভালো অবস্থায় নেই। এই বছর ৮৫ লাখ চাকরি হয়েছেন, তাদের স্থান নিয়েছেন চুক্তিভিত্তিক কর্মীরা।

[১২] মহামারী ডিজিটালাইজেশনের গতিকে তরান্বিত করেছে। অন্যদিকে পুরনো অনেক ছোট ফার্ম, জুতো নির্মাতা নিগমের মতো টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে কিংবা হারিয়ে যাচ্ছে। নিগম নিজের স্ত্রীকে বাঁচাতে তার যে বাড়িটি বিক্রি করেছিলেন সেটি থেকে ১৭’শ শতকে সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজের জন্য তৈরি করা তাজমহল দেখা যেতো, যে বাড়িটি এখন অন্য কারো।

 

সর্বাধিক পঠিত