শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৩ জুন, ২০২১, ০৪:২০ সকাল
আপডেট : ১৩ জুন, ২০২১, ০৪:২০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তীকাল: বিনিয়োগ আকর্ষণকে দেখা হচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে

নিউজ ডেস্ক: দেশে বিদেশী বিনিয়োগ কমছে। স্থানীয় বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত গতিতে বাড়ছে না। সরকারের আশঙ্কা, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ-পরবর্তীকালে বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এজন্য এখন অবকাঠামো তৈরি, সংস্কার ও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারী আকর্ষণের কথা ভাবা হচ্ছে। শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণ নয়, উত্তরণ-পরবর্তীকালের চ্যালেঞ্জ হিসেবে এ পর্যন্ত মোট ৩৩টি প্রতিবন্ধকতাকে চিহ্নিত করেছেন নীতিনির্ধারকরা। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে উত্তরণের প্রস্তুতিকালকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে চাইছেন তারা।

উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের পর বাংলাদেশের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলোর একটি খসড়া তালিকা তৈরি করেছে বাণিজ্য সচিবের সভাপতিত্বে গঠিত একটি বিশেষ কমিটি। তালিকায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়টিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কভিডের প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে চলমান মন্দায় দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ৩৯ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ এসেছিল ৩৮৯ কোটি ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এসেছে ২৩৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ এ সময়ে বিদেশী বিনিয়োগ কমেছে ১৫২ কোটি ডলার। এদিকে স্থানীয় বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত গতিতে বাড়ছে না। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্থানীয় উদ্যোক্তারা ৭১ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকার বিনিয়োগ নিবন্ধন করেছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সেটা সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে আমরা বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছি। অবকাঠামো তৈরিতে সরকার কাজ করছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নীতিমালার সংস্কার করা হচ্ছে। আশা করছি, করোনা থেকে বিশ্ব মুক্ত হলেই দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের অবস্থা ভালো হবে। বর্তমানে স্থানীয় বিনিয়োগ যা-ই হোক না কেন, বিদেশী বিনিয়োগের অবস্থা খুবই খারাপ।

বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি বাজার উন্নয়ন, রফতানি বহুমুখীকরণ, স্থানীয় ওষুধ শিল্প, জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাবসহ মোট ৩৩ ধরনের প্রতিবন্ধকতাকে তালিকাভুক্ত করেছেন নীতিনির্ধারকরা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে উপকমিটি গঠন ও দিকনির্দেশনা দিতে আগামীকাল প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার জন্য দ্বিতীয় দফায় জাতিসংঘের সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে প্রস্তুতিকাল হিসেবে পাঁচ বছর সময় পাওয়া গেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ কার্যকর হবে। উত্তরণের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য বেশকিছু সম্ভাবনা থাকছে। তেমনি থাকছে কিছু প্রতিবন্ধকতাও। এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে প্রস্তুতিকালকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে চায় সরকার। উত্তরণ-পরবর্তী সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রস্তুতি, পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য এরই মধ্যে কমিটি গঠন করেছে সরকার।

ড. আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে গত ২৬ এপ্রিল সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধিদের নিয়ে ২২ সদস্যের এ কমিটি গঠন করা হয়। গত ৫ মে কমিটির প্রথম সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে টেকসই উত্তরণের জন্য কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তা পর্যালোচনা করা হবে। এজন্য বাংলাদেশের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রস্তুতি, পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও তদারকি-সংক্রান্ত কমিটির অধীনে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি, বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে খাত ও বিষয়ভিত্তিক উপকমিটি গঠন করা হবে।

এ বিষয়ে বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলোর একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এগুলো নিয়েই আগামীকালের বৈঠকে আলোচনা হবে। সেখান থেকেই পরবর্তী করণীয় ও দিকনির্দেশনা দেয়া হবে।

বিশেষ কমিটির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ, স্থানীয় বাজার উন্নয়ন ও রফতানি বহুমুখীকরণ-সংক্রান্ত একটি উপকমিটি গঠন করতে হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে বিনিয়োগ, স্থানীয় বাজার উন্নয়ন ও রফতানি বহুমুখীকরণে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কর্মকৌশল নির্ধারণের পাশাপাশি এক্ষেত্রে কী ধরনের সুযোগ রয়েছে, সেগুলো খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করা উচিত তা সরকারের কাছে প্রস্তাব আকারে উপস্থাপন করবে কমিটি। প্রস্তাবে গুণগত মানের পণ্য উৎপাদন ও উচ্চ মূল্যসংযোজনের পণ্য উৎপাদনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়েছে। এছাড়া বিদেশী বিনিয়োগে আকৃষ্টকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়েছে। এ উপকমিটি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ ছাড়াও এ ধরনের ছয়টি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় কৌশল গ্রহণে কাজ করবে বলে প্রস্তাব করা হয়।

এতে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা ও বাণিজ্য চুক্তি-সংক্রান্ত একটি উপকমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ উপকমিটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) এলডিসি থেকে উত্তরণ ও রূপান্তরের সময় বাড়িয়ে ১২ বছর করার যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় কর্মকৌশল নির্ধারণ করবে। এজন্য ডব্লিউটিওর সঙ্গে তারা নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করবে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০২৯ সালের পর জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা কাজ করবে। বর্তমানে যেসব দেশে শুল্কমুক্ত, কোটামুক্ত সুবিধা রয়েছে, এসব সুবিধা আগামীতে অব্যাহত রাখতে কাজ করবে। এছাড়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ), মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) করাসহ সাত ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কাজ করবে।

মেধাস্বত্ব অধিকার-সংক্রান্ত একটি উপকমিটি গঠনের কথাও বলেছে বিশেষ কমিটি। এক্ষেত্রে বলা হয়, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা কমবে। বিশেষ করে ট্রেড-রিলেটেড অ্যাসপেক্টস অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস (টিআরআইপিএস) সুবিধা, ওষুধ শিল্পে পেটেন্ট অব্যাহতির সুবিধা ও অন্যান্য মেধাস্বত্বের ক্ষেত্রে অব্যাহতির সুবিধা থাকবে না। এর প্রভাব পড়বে দেশের ওষুধ শিল্প ও জনস্বাস্থ্যে। তাই এ উপকমিটি ডব্লিউটিও টিআরআইপিএস চুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কৌশলপত্র ঠিক করাসহ এ-সংক্রান্ত ছয়টি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কাজ করবে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের পরও ওষুধ শিল্পের ক্ষেত্রে টিআরআইপিএস সুবিধা বাড়ানোর জোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে বলে বলা হয়েছে।

এছাড়া ডব্লিউটিও-সংক্রান্ত আরো একটি উপকমিটি থাকবে। এ কমিটি ডব্লিউটিও টিআরআইপিএস চুক্তি ছাড়া অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কাজ করবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর ব্যবসা-বাণিজ্যে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা, যেমন শুল্ক ও কোটামুক্ত বাণিজ্য সুবিধা এবং রফতানি ভর্তুকি প্রদানের সুযোগ থাকবে না। ডব্লিউটিওর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য ভর্তুকি প্যারা-ট্যারিফ, বন্ড সুবিধাসহ যেসব প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান, সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করবে এ উপকমিটি। এছাড়া এলডিসি থেকে উত্তরণের আগে বাংলাদেশ যে ধরনের অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পায়, তা অব্যাহত রাখাসহ এ-সংক্রান্ত মোট সাত ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কাজ করবে।

অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে শুল্ক, কর-সংক্রান্ত যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলো সমাধানে কাজ করবে এ-সংক্রান্ত একটি উপকমিটি। এজন্য আমদানি শুল্ক বা অন্যান্য যে কর আরোপ রয়েছে, সেগুলো আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবর্তন করতে হবে। বিশেষ করে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিদ্যমান ট্যাক্স আইন ও বিধি ডব্লিউটিওর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমন্বয় সাধন করবে। এছাড়া স্মুদ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি নামে একটি উপকমিটি থাকবে। এলডিসি থেকে উত্তরণে বিভিন্ন দাতা সংস্থার অর্থায়ন-সংক্রান্ত যে চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে, সেগুলো সমাধানে কৌশলপত্র নির্ধারণে এ উপকমিটি কাজ করবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়