প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তিন পথেই নারী পাচার

নিউজ ডেস্ক: রুমটা দেখতে যেন হাজতখানা। বেশ বড়। নাহারের জায়গা হলো সেখানে। তার মতো আরও অনেক নারী সেখানে বন্দী। দিনের পর দিন। কেউ জানেন না কখন কার ডাক পড়বে। টানা ১৫ দিন পর ডাক পড়ল নাহারের। ভাবছিলেন, বুঝি মুক্তি মিলল। আরবের কয়েকজন লোক বড় একটা গাড়িতে করে নাহারকে নিয়ে চলতে শুরু করল। দীর্ঘ ৭৭ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে আরেক শহরে তারা। আবারও বন্দীশালা। সেখানে তার ওপর প্রতিনিয়ত পাশবিক নির্যাতন চলে। সেখানে দীর্ঘ চার মাস। প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ধরা পড়েন। এবার তাকে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হলো। একপর্যায়ে নাহার বিক্রি হলেন যৌনদাসী হিসেবে চড়া দামে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের রিয়াদ নগরীর ঘটনা। গৃহকর্মীর চাকরি নিয়ে আকাশপথে বৈধভাবে গিয়েও পাচার হয়ে যান নাহার।

কুমিল্লার নাসিমা আক্তার। তিন বছর আগে ডিভোর্স হয় তার। পড়েন নারী পাচারকারী চক্রের খপ্পরে। মাত্র ৩০ হাজার টাকায় তাকে মালয়েশিয়া পাঠিয়ে ভালো বেতনে কাজ দেওয়া হবে- এমন প্রলোভনে এক রাতে ১৮৭ জনের সঙ্গে ছোট একটি ট্রলারে চেপে বসেন নাসিমাও। টেকনাফ থেকে রওনা হওয়ার পর কখনো গুড় ও চিড়া খেয়ে, বেশির ভাগ না খেয়ে থেকে ২১ দিন পর ধরা পড়েন মালয়েশিয়া সীমান্ত পুলিশের হাতে।

ভালো চাকরির কথা বলে সোনিয়াসহ (ছদ্মনাম) দুই কিশোরীকে সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করানো হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটিয়ে, কখনো মোটরসাইকেলে চড়িয়ে, কখনো ঝোপজঙ্গলে লুকিয়ে রেখে নিয়ে যাওয়া হয় বেঙ্গালুরু। স্থলপথে পাচারের সময় এই কিশোরীরা আটবার হাতবদল হয়। দুই দিনের এই চলার পথে অন্তত তিনবার গণধর্ষণের শিকার হয়। বেঙ্গালুরু ঘুরিয়ে কিশোরীদের নিয়ে যাওয়া হয় চেন্নাই, হায়দরাবাদ, পুনে, কেরালাসহ বিভিন্ন এলাকার আবাসিক হোটেলে। শুরু হয় তাদের অন্ধকার জীবন। সেখানে এক দিনে ৩০ জনের সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হয় তাদের। নাহার, নাসিমা আর দুই কিশোরীর মতো হাজার হাজার নারী পাচার হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। আকাশ, স্থল, জল- এ তিন পথেই পাচার হচ্ছেন নারীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক নারী পাচার চক্রের নজর বাংলাদেশে। তাদের জাল ছড়িয়ে আছে দেশজুড়ে। নারী পাচারকারীদের ভয়ংকর সিন্ডিকেট গরিব, অসহায়, ভাগ্যবিড়ম্বিত নারী ও শিশুদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করছে বিভিন্ন দেশে। পরে তাদের বিক্রি করে দেওয়া হয় বিভিন্ন যৌনপল্লীতে। মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন বাসায় যৌনকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে নারীদের। সবচেয়ে বেশি পাচার হচ্ছে পাশের ভারতে। এ ছাড়া রয়েছে সৌদি আরব, দুবাই, জর্ডান, লেবানন, মালয়েশিয়া।
জানা গেছে, এশিয়ার মধ্যে নারী পাচার ঘটনার দিক থেকে নেপালের পরই বাংলাদেশের স্থান। পাচারকারীরা বিভিন্ন পথে নারী ও শিশু পাচার করে থাকে স্থল, জল বা বিমান পথে। বাংলাদেশ থেকে পাচারের যে উদাহরণগুলো পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় বিমানযোগে কিছু পাচার হয়, তবে স্থলপথে সীমান্ত অতিক্রমের মাধ্যমেই বেশিসংখ্যক নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে। এ দেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ২২২ আর মিয়ানমারের সঙ্গে ২৮৮ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর সীমানা দিয়েই পাচার হয় বেশি। যশোরের বেনাপোল, সাতক্ষীরার শাকারা, ভোমরা, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ, কক্সবাজার, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছয়টি রুটসহ অন্তত ১৮টি রুট দিয়ে আশঙ্কাজনক হারে পাচার হচ্ছে নারী-শিশু। সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুদের নিয়ে যাওয়া হয় ভারতে। সূত্রমতে, প্রতি বছরই ২০ থেকে ২৫ হাজার নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে ১০ হাজারের বেশি নারী-শিশু পাচার হচ্ছে ভারতে। যদিও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের তথ্যানুসারে বছরে বাংলাদেশ থেকে ভারত হয়ে বিভিন্ন দেশে ৪০ থেকে ৫০ হাজার নারী ও শিশু পাচার হয়। ভারতের প্রায় প্রতিটি যৌনপল্লীতে রয়েছে বাংলাদেশি নারী। পাচারের পর শুরু তাদের বন্দীজীবন। স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ। যৌনপল্লী ঘিরে সার্বক্ষণিক পাহারাদার। বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। পাচারকারীরা চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সীমান্ত পার করে নিয়ে যায় ভারতে।

সূত্র জানান, কলকাতা, হায়দরাবাদ, মুম্বাই, গোয়া, পুনে, কেরালা, দামান, তামিলনাড়ুসহ বিভিন্ন রাজ্যের যৌনপল্লীতে বাংলাদেশি নারী ও শিশুদের বিক্রি করে দিচ্ছে চক্র। ভারত থেকে ফেরা নির্যাতিত এক নারী জানান, তিনি স্বামীপরিত্যক্তা। থাকতেন ঢাকার যাত্রাবাড়ী। সেখানেই পরিচয় মিরাজ হোসেন কবিরের সঙ্গে। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কবির তাকে ভারতে নিয়ে বিক্রি করে দেন। হায়দরাবাদের নেরেডমিটের শ্রী কলোনির ১৩৫ নম্বর বাড়িতে বন্দী রাখা হয়েছিল তাকে। মারধর করে যৌনকাজে বাধ্য করা হয়। সেখান থেকে বাংলাদেশি এক খদ্দেরের সহযোগিতায় গত বছরের শেষের দিকে পালিয়ে এসেছেন এই নারী। ওই চক্রের হাতেই কয়েক শ বাংলাদেশি নারী বন্দী আছেন বলে দাবি তার।

একটি বেসরকারি সূত্রমতে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৩০ হাজার নারী ও শিশু দালালের হাতে পড়ে পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে ছেলেশিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার এবং মেয়েশিশু ১০ হাজার। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে প্রতি মাসে বাংলাদেশ থেকে ২০০ থেকে ৪০০ তরুণী ও শিশু পাচার হচ্ছে ভারত ও পাকিস্তানে। ভারতীয় সমাজকল্যাণ বোর্ডের সূত্রমতে ভারতে মোট ৫ লাখ বিদেশি যৌনকর্মী রয়েছেন। এর শতকরা ১ ভাগ বাংলাদেশি এবং কলকাতায় এ সংখ্যা শতকরা ২.৭ ভাগ। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখের বেশি নারী-শিশু পাচার হয়েছে ভারতে। তবে এনজিওগুলোর দাবি পাচারের সংখ্যা ৫ লাখের বেশি। ইউনিসেফ ও সার্কের এক হিসাব অনযায়ী বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ৪ হাজার নারী-শিশু পাচার হয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত এ দেশ থেকে কমপক্ষে ১০ লাখ নারী ও শিশু পাচার হয়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারই দুস্থ, নিঃস্ব ও অসহায়। আর এ পরিস্থিতির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করছে বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিকভাবে সংঘবদ্ধ একশ্রেণির প্রতারক। তারা প্রলোভন দেখিয়ে অসহায় মেয়েদের শহরে চাকরি বা যৌতুকবিহীন বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে পাচার করে দিচ্ছে অন্ধকার জগতে। পাচারকারীদের প্রলোভনের শিকার হচ্ছে দেশের ছিন্নমূল, ভবঘুরে নারী ও তাদের অভিভাবকরা এবং দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে জর্জরিত অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, তালাকপ্রাপ্ত ও বিধবা নারীরা। অসহায় নারীরা সুন্দরভাবে বাঁচার আশায় নতুন জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে পাচারকারীদের পাতা জালে আটকা পড়ছেন। বাবা-মা অর্থ উপার্জনের আশায় বেশি বেতনের চাকরির প্রলোভনে পড়ে বা সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় না জেনে শিশু সন্তানদের তুলে দিচ্ছেন পাচারকারীদের হাতে। সৌদি আরবের বিভিন্ন নগরী থেকে এভাবেই নির্যাতন সইতে না পেরে প্রায় প্রতিদিনই দেশে ফিরে আসছেন অসহায় নারীরা। যারা ভাগ্য ফেরাতে পাড়ি জমিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু কাজের নামে সেখানে গিয়ে বড় ধরনের ফাঁকির মধ্যে পড়ে যান। ভাগ্য ফেরানোর চেষ্টাই হয়ে ওঠে তাদের জীবনের বড় কাল। নির্যাতনের শিকার বেশ কয়েকজন নারী বলেছেন, ‘আমার মতো কোনো নারী যেন এমন ফাঁদে পা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে না যান।’ ফেরত আসা আরেক নারী মাত্র দুই মাস আগে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। এত অল্প সময়ের মধ্যে ফিরে আসার কারণ জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, ‘যাওয়ার পর আমারে ১৫ দিন আটকায় রাখছে। এক দালালের মাধ্যমে ১০ হাজার ট্যাকা দিয়া সৌদি আরব গেছিলাম। ১ হাজার রিয়াল বেতন দেওয়ার কথা আছিল। বাসাবাড়ির কাম। প্রথম বাড়িতে মালিকের বউ অনেক মারত। তাদের ভাষা বুঝতাম না। কাজের দেরি হইলেই লাঠি দিয়া মারত। এরপর আমারে সেখান থেকে নিয়া আরেক জায়গায় দিছে। সেখানেও ঘরের কাজ। ছোট ফ্যামিলি বইলা আমারে পাঠায়ছিল কিন্তু গিয়া দেখি অনেক মানুষ পরিবারে। পরে সেখান থেকে পালায় যাই দূতাবাসে। এরপর আমারে দেশে পাঠায় দিছে। আমার পাসপোর্ট পর্যন্ত দেয় নাই, কোনো ট্যাকাও দেয় নাই। আমি খালি হাতে ফিরছি। আমারে সারা রাত ঘুমাইতে দিত না। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত