প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজিব নন্দী: বেজার মুখের অর্থনীতি

রাজিব নন্দী: আমি মাসে একবার বাজার করি। চট্টগ্রামের ভাষায় যাকে বলে ‘মাসকাবাইয্যা বাজার’। দেওয়ানবাজার সাবএরিয়ার ‘খামারি’ নামের সুপারশপ থেকে গত সাত বছর ধরে চাল- ডাল- তেল- চিনি এইসব পুরো মাসের মুদি পণ্য একসঙ্গে কিনি। গতকাল রাতে খামারির সামনে এই দৃশ্য দেখে কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়েছিলাম।

দোকানে ডিম সাজিয়ে রাখতে গিয়ে কিছু ডিম ফেটে যায়। ডিম ক্রেতা-বিক্রেতারা জানেন এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। অনেকগুলি ডিম থেকে কিছু ‘ডিম ফেটে যেতে পারে’ সেই ঝুঁকি নিয়েই ডিম বিক্রি হয় বাজারে। কিন্তু ফাটা ডিমও যে এভাবে রাস্তার ফুটপাতে বিক্রি হয়, সেই দৃশ্য দেখিনি।

আমাদের মাসিক বাজার করা শেষে আধঘণ্টা পর দেখি সেই ফাটা ডিমগুলো নেই ! কম দামে কেউ কেউ কিনে নিয়েছেন ওগুলো। কুসুমগুলো বিক্রেতা খুব যত্ন করে পলিব্যাগে রেখেছিলেন। যেন ক্রেতার সময় ও শ্রম বাঁচিয়ে দিচ্ছেন, ঘরে গিয়েই দ্রুত অমলেট বানাতে পারবেন !

পাশে আমার স্ত্রীর কৌতুহল আমার চেয়েও বেশি ! তিনিও কখনো এই দৃশ্য দেখেননি, এমনকি ভাবেননিও নি ! হাট-বাজারে কত কিছু কেনা-বেচা হয় ! আমার স্ত্রীকে বললাম, জানো, আমিও কৈশোরে গ্রামের হাটে লাউ বিক্রি করেছিলাম। তখন আমি ক্লাস ফোরে পড়ি। আমাদের মাটির ঘরে টিনের চালায় দু’টি লাউ হয়। দু’তিন মাসের যত্নে প্রতিদিন লাউ দুটি ধরে ধরে নেড়েচেড়ে দেখতাম। লাউগুলো বড় হচ্ছিলো ধীরে ধীরে।

একদিন ঠাকুর দা’ বললো, অ নাতি, যা লাউ দুইটা বেঁচে আয় মইগ্যার হাটে। আমি তো খুশি। গ্রামে হাটে যাবো, লাউ বেচবো, লাভ করবো, দুই টাকা মারবো ইত্যাদি ইত্যাদি। মা বলে দিয়েছেন, লাউ বেচার টাকা দিয়ে আধা কেজি পোপা মাছ আনতে। আমি ‘আচ্ছা’ বলে দুই হাতে দুই লাউ বিক্রি করতে যাই মির্জাপুরের মইগ্যার হাটে। রাস্তায় নাচতে নাচতেই যাচ্ছিলাম সত্যি। দাদা বলে দিয়েছিলেন, কোনটা কত দামে বেঁচবো।

আজ আমার খুব মনে পড়ছে, হাফপ্যান্ট পরা রোগা টিংটিংয়ে ছোট্ট একটি ছেলে, নিন্মবিত্ত ঘরের চালার লাউ নিয়ে সাপ্তাহিক গ্রাম্যহাটে এসেছে এক বুক আশা নিয়ে। কিন্তু আমাকে ঠেলতে ঠেলতে হাটের একদম কোণাতে নিয়ে ফেললো বড় বড় মাচাওয়ালা হাটুরেরা। আমি বাজারের কোণায় কোন মতে এক থুত্থুরে বুড়োর পাশে ঠাঁই নিলাম। বড় হয়ে অর্থনীতি পড়তে গিয়ে বুঝলাম, বড় পুঁজির কাছে ছোট পুঁজি কত অসহায়। অনেকেই আমার লাউয়ে চিমটি কেটে কেটে চলে গেলো। সন্ধ্যা হয়ে এলে পরাজিত নতমুখী চেহারা নিয়ে ঘরে ফিরি। হাতে সেই দুইটা অবিক্রিত লাউ। না, জীবনের প্রথম ব্যবসায় ফেইল। বিক্রি করতে পারিনি লাউগুলো! খুব মন খারাপ আমার, কিন্তু আমার ঠাকুর দার মুখে ছিলো হাসি। তিনি নাতিকে “বাস্তবতা চেনালেন”!

হাট-বাজার আমার খুব ভালো লাগে। কোথাও গেলে আমি আগে ওখানকার মাছের বাজারে যাই, বোঝার চেষ্টা করি ওখানকার লোক কী খায়! কথায় আছে, “তুমি যা খাবে, তুমি আসলে তাইই”।

খুব অদ্ভুত লাগছিলো গতকাল রাতে। ফাটা ডিমের অনিশ্চিত দোকানির মুখেও একটি প্রশান্তির হাসি দেখতে পেয়েছিলাম। সে নিশ্চিত ছিলো, বাজারে তাঁর ক্রেতা জুটবেই এবং সে লাভ করবে। আধঘণ্টায় সবগুলো ফাটা ডিম বিক্রি শেষে সে খুব আনন্দের সাথে হাঁটা দিলো। আমরা আমাদের পথ ধরলাম। রাতে বাসায় ফিরে ছোটবেলায় পড়া ইংরেজি একটি উদ্ধৃতি মনে পড়লো। কখন কোথায় পড়েছি হুবহু মনে নেই। ভাবার্থটি এরকম –

“If an egg is broken by outside force, life ends. If broken by inside force, life begins. Great thing always begin from inside.”

আসলেই, ভেঙ্গে পড়া থেকেই তো নতুন কিছুর শুরু….! ভেতরের চাপ বা বাইরের চাপে আপনি যতই ভেঙে পড়েন, জীবনে আপনি ফেলনা নন। ‘মুক্তবাজার’ অর্থনীতির যুগে ‘মুখটা বেজার’ করে রাখলে হবে?

(লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক। ফেইসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহিত)

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত