প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কামরুল হাসান মামুন: নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই কেন?

কামরুল হাসান মামুন: বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের শ্রেষ্টত্বের মাধ্যমে সভ্যতার গতি এবং পরিবর্তন নিয়ে আমার লেখা গত পোস্টটি নিয়ে কেউ কেউ জানতে চেয়েছেন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই কেন। প্রথমত বলতে চাই বিশ্ববিদ্যালয় মানে হলো একটি অমর প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ এর মৃত্যু নেই। সেই হিসাবে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় discontinued! প্রায় ১৬০০ বছর আগে এটি তার খ্যাতির চূড়ায় উঠে। তারপর প্রায় ৮৩০ বছর আগে এটি ধ্বংস বা destroyed হয়! যদিও এরপরও মানুষ এইটাকে মনে রেখেছে এবং জেনেছে ওখানে এক সময় মানুষ তৈরী করা হতো। ভারত সরকার এটিকে আবার চালু করার উদ্যোগ নেয়। ২০১৪ তে এটি আবার কার্যক্রম শুরু করেছে। এটিকে সেই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায় কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। আর আমার লেখার মূল থিমটা ছিল কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ও শ্রেষ্টত্বের সাথে সভ্যতার গতি প্রকৃতি নির্ণীত হয়। আমি দেখাতে চেয়েছি কিভাবে ৭০০-৯০০ সালের দিকে মুসলমানরা জ্ঞান বিজ্ঞানকে ধারণ করেছিল। তারপর সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান কেবল বজায় রাখা না একই সাথে উন্নততর করতে না পারে কিভাবে তারা পিছিয়ে পরেছে। ইউরোপ কিভাবে নতুন নতুন ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা করে জ্ঞান এবং ক্ষমতার সেন্টার অফ গ্র্যাভিটিতে পরিণত হয়। তারপর কিভাবে সেই জ্ঞান এবং ক্ষমতার সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি আমেরিকাতে শিফট হয়। আর এখন আবার চীন জাপান, ভারত, কোরিয়ায় বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে জ্ঞান এবং ক্ষমতার সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি এশিয়ায় শিফ্টের বার্তা দিচ্ছে।

আমরা যদি প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার দিকে তাকাই (12th–9th centuries BC) সেখানেও দেখব শিক্ষাই ছিল তাদের সভ্যতার মুলে। তখন প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। কিন্তু ছিল গুরুগৃহ। প্রথম গুরু ছিলেন Socrates, তার ছাত্র Plato এবং তার ছাত্র Aristotle এইভাবে তাদের হাত ধরে একটি সভ্যতা দাড়ায়। যুগে যুগে সারা পৃথিবীতে সেই দেশই জ্ঞান এবং ক্ষমতায় উন্নত হয়েছে যেই দেশে ভালো মানের স্কলার তৈরীর কারখানা বা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জার্মানীকেই বলা যায় জ্ঞানের সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি। সেখানকার অধিকাংশ বড় বড় স্কলার ছিল ইহুদী। ১৯৪৫ এর আগে পরে নাত্সিদের অবর্ণনীয় অত্যাচারের ফলে অনেক স্কলার জার্মানি থেকে পালিয়ে অনেকেই আমেরিকায় চলে যায়। জ্ঞানবিজ্ঞানে জার্মানির ধস আর আমেরিকার অভাবনীয় উত্থানের গোড়াপত্তন এখান থেকেই ঘটে।

চীন এখন কি করছে সেইদিকে নজর দিলে সহজেই বুঝতে পারব তারা ঠিক কাজটি করছে। তারা এখন ১০০০ ট্যালেন্টস হান্ট প্রোগ্রামের মত মেগা মেগা প্রজেক্ট নিচ্ছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ নিচ্ছে মেগা ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট। একই সাথে এমন কাজ করছে যেন ট্যালেন্টসরা দেশ ছেড়ে চলে যায়। গত ২০-৩০ বছরে কেবল আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেক বড় শিল্পীদের অবস্থা দেখেন। আমি একটি exodus দেখেছি। আমাদের দেশে জন্ম নেওয়া আমাদের দ্বারা বিখ্যাত হওয়া অনেক শিল্পী সাহিত্যিক কেবল তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে দেশ ছেড়েছে। নিজের ক্যারিয়ারকে বিসর্জন দিয়ে ওসব দেশে ক্যাব চালায়, রেস্টুরেন্টে কাজ করে তবুও সন্তানের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ চিন্তা করে দেশ ছেড়েছে। আমি আমার শিক্ষকতা জীবনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার ক্লাসের সেরা ছাত্ররা নিজের দেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকায় পড়ে, বড় হয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ গিয়ে আর ফেরত আসছে না। আমি বিশ্বাস করি তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ফিরে আসতো যদি আমরা তাদের আসার জায়গাটা নিবিগ্ন করতাম, যদি দেশে সুন্দর শাসন ব্যবস্থা থাকতো। প্রশ্ন উঠে আমাদের সরকারেরাই কখনো চায়নি তারা ফিরে আসুক। তাহলে আমরা কিভাবে আগাবো?

এর আগের লেখাতেই বলেছি কিভাবে শিক্ষা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকদের মান নষ্ট করা হচ্ছে। যখন আমাদের উচিত ছিল শিক্ষায় বিশাল বরাদ্দ দেওয়া তখন উল্টো বরাদ্দ কমানো হয়। যেখানে ইউনেস্কো বলে প্রতিটি দেশ যেন তার জিডিপির ৬% শিক্ষায় বরাদ্দ দেয় সেখানে আমরা দেই বড়জোর ২.২% বা তার কাছাকাছি। ফলাফল হাতেনাতেই পাচ্ছি। কেবল সার্ক ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নলেজ ইনডেক্সে আমরা তলানিতে। ওয়ার্ল্ড রেঙ্কিং-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান দিনদিন খারাপের দিকে। আজ থেকে ৩০ বছর আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ওয়ার্ল্ড রেঙ্কিং-এ ৭০০ থেকে ৮০০ এর মধ্যে ছিলাম আর এখন টেনেটুনে ১০০০ এর কাছাকাছি। যেই ট্রেন্ড দেখছি তাতে আগামীতে এর অবস্থান আরো নামবে। এই নামার সাথে আমাদের সমাজের মানুষদের জ্ঞান বিজ্ঞানে চিন্তার যে পরিবর্তন ঘটছে সেটা কি আমরা লক্ষ করছি? সরকার কি লক্ষ করছে? জনগণ কি লক্ষ করছে? কেউ গবেষণা করে সরকারকে কি এইসব জানাচ্ছে?

আমরা পেছাচ্ছি এইটা যতটা না খারাপ আমরা ভালোর দিকে যাওয়ার পদক্ষেপ নিচ্ছি না এইটা তার চেয়েও খারাপ। এইভাবে চলতে থাকলে ধ্বংস অনিবার্য। যখন করোনার কারণে শিক্ষাই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তখন আশা করা হচ্ছিল শিক্ষায় গতবারের চেয়ে দ্বিগুনেরও বেশি বরাদ্দ দিয়ে ক্ষতি পুষানোর চেষ্টা করা হবে। আর হলো ঠিক উল্টো। সরকার এইদিকে আমাদেরকে সংখ্যা বৃদ্ধি দেখিয়ে বরাদ্দ বৃদ্ধির গান শোনাচ্ছে। সংখ্যার যতটুকু বৃদ্ধি হয়েছে সেটাতো খেয়ে ফেলবে মুদ্রাস্ফীতিই। তাছাড়া নতুন নতুন স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় খোলার কারণে অতিরিক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন খেয়ে ফেলবে আরেকটি অংশ। এতে প্রমাণিত হয়ে এই সরকার চায় না শিক্ষায় যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ হউক। বরং আরো কিভাবে বেশি ক্ষতি করা যায় সেই কাজ করে যাচ্ছে অনবরত।

ইতিহাসতো ক্ষমা করবে না। ইতিহাস কিন্তু আমাদের সরকারদের আমলনামা লিখছে। কার আমল কেমন ছিল একদিন ঠিকই কথা হবে। সেই কথায় চাটুকারদের কথা থাকবে না। ইতিহাসে মিথ্যার স্থান নেই। কেউ জোর করে জায়গা করে নিলেই সেই জায়গা চিরস্থায়ী হবে না। শিক্ষা স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিন। দেশকে সত্যিকারের উন্নত করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক মানের করতে ভূমিকা নিন। কিন্তু আমরাতো আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে উন্নত করতে ভূমিকা নিচ্ছি না। একেতো শিক্ষায় বরাদ্দ কমাচ্ছি একই সাথে সেই কম বাজেট বরাদ্দ থেকে প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ, বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ ইত্যাদির মাধ্যমে একেকজনকে কোটি কোটি টাকা দিয়ে অন্য দেশে পিএইচডি করতে পাঠাচ্ছি। এইটা পৃথিবীর কোন দেশ করে? সাধারণত একটি দেশের সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় ফেলোশিপ স্কলারশিপ দেওয়া হয় সেই দেশে গবেষণা করার জন্য। গবেষণার পরিবেশ না থাকলে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। পৃথিবীর এমন একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বলেনতো যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন পোস্ট-ডক নাই। বিদেশ থেকে উচ্চ মানের পোস্ট-ডক এনে ভালো গবেষক শিক্ষকদের অধীনে দিয়ে উন্নত মানের পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করা যেতে পারে। পোস্ট-ডক এবং পিএইচডি প্রোগ্রাম হলো গবেষণার ইঞ্জিন। বিদেশী পোস্ট-ডক আনলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং একই সাথে এরা ক্লাসও নিতে পারে। মনে রাখতে হবে একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় তাকেই বলে যেই ক্যাম্পাসে ঢুকলে পরে সেখানে বিমানবন্দরের মত দেশবিদেশের নানা ধর্মের নানা বর্ণের নানা সংস্কৃতির মানুষ পাওয়া যায়। এইসবও শিক্ষার একটি অংশ। এতে দ্রুত রেঙ্কিং বেড়ে যাবে। পোস্ট-ডক বিহীন বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বে অকল্পনীয়।

আশা করি এক্স ঢাবিয়ান, সাধারণ জনগণ, ছাত্র শিক্ষক সবাই সরকারকে চাপ দিবেন যেন দেশে সত্যিকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। যেখান আমাদের সন্তানরা আদর্শ মানুষ হয়ে বাংলাদেশকে গড়বে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত