প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রুহিন হোসেন প্রিন্স: বাজেটে জ্বালানি খাত, ফোঁড়া থেকেই গেলো

রুহিন হোসেন প্রিন্স: বাজেট পেশের আগে অবশ্য অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, এবারের বাজেট হবে ‘মানুষ ও ব্যবসায়ীবান্ধব’। প্রস্তাবিত বাজেট ‘সাধারণ মানুষবান্ধব’ না হলেও ব্যবসায়ীবান্ধব হয়েছে। বর্তমান ব্যবসায়ী অর্থমন্ত্রী ও সরকারের কাছ থেকে এর চেয়ে ব্যতিক্রম আশা করারও বেশি কিছু ছিল না। এই মহামারির সময়ে যখন মানুষের জীবন ও জীবিকা বাঁচাতে চ্যালেঞ্জ নিয়ে বাজেট সাজানোর কথা ছিলো তখনও মেগা প্রকল্প ও প্রকল্পে বরাদ্দ রেখে সরকার ব্যবসায়ী ও কমিশনভোগীদের স্বার্থরক্ষার বাজেট ঘোষণা দিলো।

এটা ঠিক যে বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমল থেকে এখন বিদ্যুতের অগ্রগতি অনেক বেশি। এগুলো হয়েছে অনেক উচ্চমূল্যে। জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় দায়মুক্তি আইনও পাস করা হয়েছিলো, যা এখনও অব্যাহত রাখা হয়েছে। তখন জাতীয় সংসদে বলা হয়েছিল, জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য খরচ বাড়ছে। ২০১৪ সাল থেকে বিদ্যুতের খরচ কমবে, তখন দাম কমবে।

কিন্তু ২০২১ সালে এসেও দেখা গেলো, এসব নেহায়েতই ‘কথার কথা’, দাম বাড়ানোর সময়ে মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার আরেক কৌশল। ওই সময় থেকে বিশে^ ক্ষতিকর কয়লাভিত্তিক প্রকল্প বাতিল করলেও সরকার কম খরচের কথা বলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পথ বেছে নেয়। সুন্দরবনসহ উপকূলজুড়ে এসব প্রকল্প নেওয়া হয়। দেশের সচেতন মানুষ, দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞ মত ও আন্তর্জাতিক মতামত উপেক্ষা করে ২৯টি কয়লাভিত্তিক প্রকল্প নিয়ে সরকার এগোচ্ছে।

সম্প্রতি বিশ্বে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে চলেছে। পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী বলে বিশ^ এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিত্যাগ করছে। অন্যদিকে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের খরচ কমছে। এ অবস্থায় ২৯টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প সরকারেরই গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শোনা যাচ্ছিলো এই অবস্থায় সরকার ৫টি প্রকল্প রেখে বাকি প্রকল্পগুলো স্থগিত বা বাতিল করবে। পৃথিবীর অনেক দেশে এধরনের প্রকল্প বাতিলের উদাহরণ দেখা যায়।

বিদ্যুতের ক্ষেত্রে দেখা যায় এখন উৎপাদনের ক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। আর চাহিদা ১২ থেকে ১৩ হাজার মেগাওয়াট। তাই উচ্চমূল্যে স্থাপিত অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে অহেতুক টাকা দিতে হচ্ছে। অথবা উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। গেলো অর্থবছরে এ খাতে অহেতুক খরচ করা হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। গত এক দশকে ভর্তুকির নামে খরচ করা হয়েছে ৯৬ হাজার কোটি টাকা। দেশের মানুষের ট্যাক্স ও ঋণের টাকায় এসব ভর্তুকি আপনার আমার কাঁধেই চাপছে।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রী ও উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের বিপদের কথা বলেন। কিন্তু দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় উল্টো কাজটি করেন। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সারাদেশের নদী-বন দুটোই বিপর্যস্ত হচ্ছে। সুন্দরবনের রামপাল, বাঁশখালী, মাতারবাড়ি, পায়রা পর্যন্ত একের পর এক অপ্রয়োজনীয় কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প দেশকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অন্যদিকে দেশের সম্পদ ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি গ্যাসের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সরকারের নজর নেই। এলএনজি আমদানির দিকে নজর বেশি। এজন্য নিয়ন্ত্রণহীন খরচে নানা প্রকল্প বাড়ানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রেও দেশীয় বিশেষজ্ঞ মতামত ও জনগণের স্বার্থ হচ্ছে উপেক্ষিত। বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে জনস্বার্থরক্ষায় পদক্ষেপ নেই।

এতসবের পরও দেশবাসী আশা করেছিল, মহামারির সময়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটিয়ে মানুষ বাঁচাতে সরকার ক্ষতিকর, অপ্রয়োজনীয় এসব প্রকল্প বাতিল বা স্থগিত করার লক্ষ্য ঘোষণা করবে, এসব প্রকল্পের বরাদ্দ কমিয়ে স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়াবে। অথচ জ্বালানি খাতে এসব প্রকল্প আর তথাকথিত ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে বরাদ্দ দেওয়া হলো ২৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। যা বিদায়ী অর্থবছর থেকে ৩ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা বেশি।

বিদ্যুতের ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন, মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ, ভুলনীতি ও দুর্নীতি থেকে বেরিয়ে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, দেশের গ্যাসক্ষেত্র অবিষ্কার ও উৎপাদন বাড়ানো, সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত খাত হিসেবে জ্বালানি খাত গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ না নিয়ে পুরনো ধাঁচে বরাদ্দ ও মেগা প্রকল্প অব্যাহত রেখে এবারও বাজেটে পুরোপুরিভাবে ব্যবসায়ী ও কমিশনভোগীদের স্বার্থরক্ষা করা হলো। কিন্তু জ্বালানি খাতের ‘ফোঁড়া থেকেই গেলো’। তার ফল জনগণকেই বইতে হবে।
লেখক: সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি

সর্বাধিক পঠিত