প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কামরুল হাসান মামুন: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ জন ভিসির দুর্নীতির খবরে সন্দেহ জাগা খুবই স্বাভাবিক

কামরুল হাসান মামুন: শত বর্ষে পা দিতে যাওয়া মৃতপ্রায় আইসিইউতে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পুনরুজ্জীবিত এলামনাইদের ভূমিকা নিয়ে একটি পোস্ট আমার ওয়ালে এবং একই সাথে Dhaka University ex students Association এর ফেইসবুক গ্ৰুপে পোস্ট করেছিলাম। ওখানে লেখাটিকে অসংখ্য এলামনাই সদস্য বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসাবে নিয়েছে এবং মনে হচ্ছে সবাই কান্ট্রিবিউট করতে চায়। কিন্তু অনেকেরই প্রশ্ন যে, কোথায়, কীভাবে ডোনেট করবো। ডোনেশনের এই টাকা ঠিকমত খরচ হবে কিনা ? ডোনেশনের এই টাকা কীভাবে, কোথায় খরচ হচ্ছে বা হয়েছে, তার একটি স্বচ্ছ রিপোর্ট পাওয়া যাবে কিনা ? এই টাকা আবার দুর্নীতির কবলে পরে কিনা। সাম্প্রতিক সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ জন ভিসি নানা দুর্নীতির খবর পরে এই ধরণের সন্দেহ মনে জাগা খুবই স্বাভাবিক। আজকের পোস্টে এই বিষয়েই একটু আলোকপাত করতে চাই।

কথা হচ্ছে আমাদের ভিসিরা কি আর্থিক দুর্নীতি করে ? কতজন ভিসি দুর্নীতি করে গুলশান বনানীতে বাড়ি কিংবা ক্যানাডার বেগম পাড়ায় বাড়ি বানিয়ে স্ত্রীপুত্র রাখছেন বা থাকছেন ? আসলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যা বাজেট বরাদ্দ দেয় তা থেকে বড় ধরণের আর্থিক দুর্নীতি করা সম্ভব না। বাজেট বরাদ্দের একটি বড় অংশই চলে যায় শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতন দিতে। একটা অংশ চলে যায় ল্যাব, লাইব্রেরী ইত্যাদি চালাতে। আরেকটা অংশ চলে যায় ছাত্র শিক্ষক কর্মচারীদের আবাসিক ব্যবস্থাপনায়। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় ত্রুটি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্ষমতা বলা যায় এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত।

আমাদের ভিসিদের যেই পরিমান ক্ষমতা তাতে ইচ্ছে না থাকলেও সিস্টেমই তাকে স্বৈরাচারী বানিয়ে দেয়। দেখা যায় ভিসি/প্রোভিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রমোশন কমিটির প্রধান। ফলে ভিসিরা নিয়োগ নিয়ে নয় ছয় করতে পারে যা আর্থিক দুর্নীতির চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। তারপরেও কাজটা অনেক কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে দুর্নীতি কম তার একটা প্রধান লিটমাস টেস্ট হলো ভর্তি পরীক্ষা। আমাদের সিস্টেমের প্রতিটি লেয়ারে অনেক শিক্ষকের চোখ থাকে। শিক্ষকরা অন্য যেকোন চাকুরীজীবী থেকে বেশি প্রতিবাদী।

তবে যেমন শিক্ষকদের ভিসি বানানো হয় এবং তাদের যেইসব কর্মকাণ্ড পত্রিকার মারফত জানতে পারি তাতে তাদের পক্ষে আর্থিক দুর্নীতি করাও সম্ভব। সুযোগের অভাবে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তেমন নাই। যদি সুযোগ থাকতো কি যে করত সেটা ভাবলেও গা শিহরিয়ে উঠে। তাই এলামনাইদের বলতে পারি আপনাদের donation এর টাকার তেমন নয়ছয় হওয়ার সুযোগ খুব কম। তাছাড়া একটি কাজ করা যায়। আপনারা যে যেই বিভাগের এলামনাই তারা মিলে সরাসরি বিভাগের মান উন্নয়নে কাজ করতে পারেন। আপনাদের একজন বা অনেকে মিলে বিভাগের শ্রেণীকক্ষের মান উন্নয়নে সরাসরি নিজেরা কাজ করতে পারেন। বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগের ক্ষেত্রে ল্যাবের মান উন্নয়নে সাহায্য করতে পারেন। কেউ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ AC এগিয়ে দিতে পারেন।

আপনারা আরেকটি কাজ করতে পারেন কাদের ভিসি বানানো উচিত সেটা যদি মন্ত্রণালয় লিস্ট তৈরী না করে দেশ বিদেশের যোগ্য মানুষদের নিয়ে একটি সার্চ কমিটির মাধ্যমে একটি ছোট লিস্ট পাঠাতে বলা হয় সেই লিস্ট থেকে একজনকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেয় সেটা হতো অনেক ভালো। এছাড়া এলামনাই সড়করকেও বেশি বরাদ্দের জন্য চাপ দিতে পারে। বলা হয় বাংলাদেশের জিডিপি নাকি চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে? তার কোন প্রতিফলনতো শিক্ষায় বরাদ্দ কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাদ্দের মধ্যে দেখি না। আমেরিকা সুপারপাওয়ার কারণ তাদের আছে এমআইটি হার্ভার্ড স্ট্যানফোর্ডের মত অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ইংল্যান্ডও প্রভাবশালী দেশ কারণ তাদের আছে কেমব্রিজ, অক্সফোর্ডের মত বিশ্ববিদ্যালয়।

চীন এখন সুপারপাওয়ার হচ্ছে কারণ তাদের টেসিংহুয়া ও পীকিং বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব রেঙ্কিং-এ হু হু করে উপরে উঠছে। এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয় এখন এশিয়ার সেরা। সেই চীনের এক নম্বর বিশ্ববিদ্যালয় Tsinghua University-র বাজেট হলো ২৩.৩ বিলিয়ন RMB বা প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। আর চীনের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রেঙ্কিং-এ দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট হলো ১৯.৩ বিলিয়ন RMB যা প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। আর ৩৫ হাজার ছাত্রের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট হলো ৮০০ কোটি টাকা। একটু কল্পনা করুন আর ভাবুন। এই বরাদ্দ দিয়ে যে একটা বিশ্ববিদ্যালয় চলছে এটাইতো অষ্টমাশ্চর্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (লেখকের ফেইসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহিত)

সর্বাধিক পঠিত