প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] ভালো বাজেট দেওয়ার সরকারি প্রচেষ্টা থাকলেও জীবন-জীবিকা রক্ষায় স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিলো বেশি বেশি : ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

আমিরুল ইসলাম: [২] এনবিআরের সাবেক এই চেয়ারম্যান আরও বলেন, বাজেটে স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা অস্পষ্ট [৩] স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা খাতে ইমিডিয়েটলি বাজেট বাড়ানোর দরকার ছিলো [৪] বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যাপারে বেশি জোর দেওয়া দরকার [৫] বাংলাদেশের জিডিপির হিসাবায়নের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত, পারসেপশন ও রিয়ালিস্টিকের পার্থক্য আছে [৬] ২০২৫ সালে মাথাপিছু আয়ে দিল্লি ঢাকার অনেক পেছনে পড়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়

[৭] সংকটকালীন বাজেট হিসেবে সরকারও যথেষ্ট চেষ্টা করেছে বাজেটকে গতানুগতিক না করে একটা নতুন রূপ দেওয়ার জন্য। কিন্তু সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন সেগুলো মূলত ব্যবসাবান্ধব করা হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যকে প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এগুলো সময়সাপেক্ষ। যেমন হাসাপাতাল নির্মাণ করা হলে ১০ বছর কর অবকাশ দেওয়া হবে।

[৮] মানুষ ও অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্য ইমিডিয়েট যেগুলো দরকার ছিলো সেগুলোতে বরাদ্দ আশানুরূপ হয়নি। সরকার মনে করেছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হলে কর্মসংস্থান হবে। কর্মসংস্থান হলে মানুষ বেঁচে যাবে। এটা ঠিকই আছে, কিন্তু এটা চটজলতি হবে না। কারণ বেসরকারি খাতে মোটেও বিনিয়োগে আসছে না। তাদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন এখন। এই অবস্থায় ভবিষ্যতের লোভ দেখিয়ে তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা যাবে না।
[৯] বাজেটে ভবিষ্যতের জন্য দীর্ঘমেয়াদী যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেটা ভালো। কিন্তু স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা অস্পষ্ট। স্বাস্থ্যখাতে বাজেট তেমন বাড়ানো হয়নি, মাত্র ১,০০০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। ঘাটতি আগে যা ছিলো এবার তাই দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা খাতে বাজেট বরং আরও কমে গেছে।

[১০] করোনার কারণে শিক্ষাকার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না। শিক্ষকদের বসিয়ে বসিয়ে বেতন দেওয়া হচ্ছে। অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম চালানোর জন্য শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে অনলাইন সেবা ও ল্যাপটপ দেওয়ার প্রয়োজন ছিলো।

[১১]বেসিরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবার ১৫ শতাংশ কর বসিয়ে দেওয়া হলো। এমনিতেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছে। অনলাইন ফ্যাসিলিটি বাড়ানোর বদলে উল্টো

১৫ শতাংশ করারোপ করা হলো। ১৫ শতাংশ কর বাড়ানোটা আইন আকারে পাস হয়ে গেলে সরকার ইচ্ছা করলেও আর এটা বাদ দিতে পারবে না।

[১২] বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় থেকে কর নেওয়া হবে বললেও প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার্থীদেরই এর ভার বহন করতে হবে। কর বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বেতন বাড়ানো হবে। করোনার কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ছাত্রদের। ল্যাপটপ দিতে হচ্ছে, ইন্টারনেট প্যাকেজ কেনার জন্য অর্থ দিতে হচ্ছে, নিয়মিত পাঠক্রম চালানোর জন্য।

[১৩] ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া হলেও তারা যেই অর্থনীতিতে ও ক্রেতার সঙ্গে ব্যবসা করবে তার জন্য কী করা হলো? তার তো কোনো লাভ হলো না। তাদের তো কিছু দেওয়া হয়নি। অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি না হলে উৎপাদন ও যোগান বাড়িয়ে কোনো লাভ হবে না।

[১৪] আমরা কয়েক বছর ধরে দেখছি বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারে না। প্রকল্পগুলোও বাস্তবায়ন করতে পারেনি, প্রণোদনা যা দেওয়া হয়েছে সেটাও বন্টন করা যায়নি সময়মতো। সংস্কার কার্যক্রমগুলো ঠিকমতো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। অদক্ষতা, অক্ষমতা ও দুর্নীতি বিরাজমান রয়েছে সর্বত্র।

[১৫] অফিস-আদালতের কর্মকর্তাদের বেতন দুই-দুইটা পে স্কেল দিয়ে বাড়ানো হলেও দুর্নীতি কমানো যায়নি। এবারও বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ যাচ্ছে জনপ্রশাসনেই। প্রশাসন খরচের ব্যাপারে একই অবস্থানে রয়েছে কিন্তু এর বিপরীতে অদক্ষতা রয়েই গেছে। দুর্নীতি ও লুটপাট রয়েই গেছে। বাজেট বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য কোনো পদক্ষেপ নেই। দুর্নীতি কমানোর জন্য কড়া হুঁশিয়ারি থাকা দরকার ছিলো।
[১৬] সার্বিকভাবে এইবারের বাজেট ভালো হয়েছে। যারা দায়িত্বে ছিলো তারা যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন, কিন্তু মূল কৌশলে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

[১৭] জিডিপির হিসাবায়ন ও পদ্ধতির মারপেচের কারণে বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে জিডিপি হৈ হৈ করে লাফ দিচ্ছে জনসংখ্যার সঙ্গে ভাগ করলে মাথাপিছু আয় অংকের হিসেবে বাড়ছে। ভারতের ক্ষেত্রে জিডিপি যে হারে বাড়ছে জনসংখ্যার সঙ্গে ভাগ করলে জিডিপি কমে যাচ্ছে। জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় জিডিপি সে হারে বাড়ছে না। সে কারণে একপর্যায়ে গিয়ে সংখ্যাতাত্তি¡ক দিক দিয়ে ভারতে জিডিপি কমে যাবে এবং বাংলাদেশ ওপরে উঠেছে বলে মনে হবে। ভারতের মতো বড় অর্থনীতিতে এই সময়ে নি¤œগামী হওয়াটাই স্বাভাবিক।

[১৮] প্রকৃত অবস্থায় এখানে দুইটা বিষয় বিশেষভাবে বিবেচ্যÑ কোয়ালিটি অব জিডিপি। ভারত প্রথা অনুযায়ী জিডিপি বের করলে এর গ্রোথ কমের দিকে থাকার কথা, কারণ ভারতে নানা ধরনের সমস্যা বিরাজ করছে।

[১৯] বাংলাদেশের জিডিপির গ্রোথের হিসাবায়নের জন্য ইতোমধ্যে প্লানিং কমিশন চার-পাঁচটা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। হিসাবটাকে বড় করে দেখাবার বিষয়ে তারা স্টাডি করেছে কিন্তু কোয়ালিটি ইম্প্রুভমেন্টের বিষয়টি দেখানো হয়নি। সে কারণে সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতিবিদরা জিডিপি বৃদ্ধির সমালোচনা করছে।

[২০] সব লোকের আয় কমে যাচ্ছে, সেখানে জিডিপি বাড়ে কীভাবে? জিডিপির একটা বড় অংশ হচ্ছে বিনিয়োগ। বাংলাদেশে সেখানে বড় বড় প্রকল্পকে দেখাচ্ছে। এর মাধ্যমে যে পণ্য ও সেবা উৎপাদন হবে সেটা সময়সাপেক্ষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে জিডিপির আকারের সঙ্গে ওই উন্নতির মিল দেখা যাচ্ছে না। হিসাব করলে বাংলাদেশের জিডিপি বেড়েছে। যেখানে সারা পৃথিবীর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেখানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২৪০ ডলার বেড়ে গেলো কীভাবে?

[২১] জিডিপিতে আমাদের কৃষির অবদান বাড়ছে, এটা ঠিক। কিন্তু শিল্পের অবদান জিডিপিতে বাড়েনি। বিনিয়োগের উপযোগিতা আসেনি। জিডিপি মানে হচ্ছে গ্রস ডমেস্টিক প্রোডাক্ট। আমাদের তো প্রোডাক্ট লাগবে। আমাদের দেশে প্রোডাক্ট হয়নি, বিনিয়োগ হয়েছে টাকার অংকে। বড় বড় প্রকল্প থেকে লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হলে এবং সবাই চাকরি করে আয় করতে পারলে একটা কথা ছিলো। প্রকল্পগুলো তাড়াতাড়ি শেষ করে মানুষ এগুলো ব্যবহার করে প্রচুর উৎপাদন বাড়াতে পারতো, তাহলে একটা কথা ছিলো।

[২২] বড় বড় প্রকল্পগুলোর অধিকাংশ শ্রমিক বাইরের, এদেশের মানুষর কাজ করার স্কোপ সেখানে অনেক কম। কিন্তু অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে অনেক। এগুলো থেকে ফলাফল আসবে অনেক পরে। প্রোডাক্ট না হলে আমরা জিডিপিতে ধরছি কেন? আর অংক বা একাডেমিক কারণে ধরলেও মাথাপিছু আয়ের সঙ্গে এটা মিলবে না।

[২৩] ভারত হয়তো ক্লাসিক্যাল ওয়েতে যাচ্ছে, স্বাভাবিক, প্রকৃত প্রোডাকশন ও বিনিয়োগ যা হচ্ছে সেটাই তারা দেখাচ্ছে। আমাদের অর্থনীতি কিছুটা ঊর্ধ্বগামী হতে পারে, কিন্তু সেটা বাস্তবভিত্তিক না হলে এই হিসেব মিলবে না। দেশে জিডিপি বেড়ে থাকলেও অর্থনীতির চেহারার সঙ্গে তা মিলছে না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত