প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিক্ষা বরাদ্দ নিয়ে মাথা নাই তাই মাথা ব্যথাও নাই, সিম্পল হিসাব

কামরুল হাসান মামুন, ফেসবুক থেকে গতকাল থেকে Dhaka University ex students Association শিরোনামে একটি ফেইসবুক গ্রুপে অনেককেই নিজের ছবি সমেত নিজের পরিচয় দিয়ে স্ট্যাটাস দিতে দেখছি। দেখে সত্যিই খুব ভালো লেগেছে। কত চেনা জনকে অনেকে অনেক দিন পরে খুঁজে পাচ্ছেন এবং পেয়ে আপ্লুত হচ্ছেন। কে কোন পদে আছেন, কোথায় আছেন দিচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গর্বের কথা জানাচ্ছেন।

যে যেই অবস্থানেই আছেন না কেন তার পেছনে স্কুল কলেজ এবং সবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান কেউ কি অস্বীকার করতে পারবেন? হয়ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা যে যেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েছেন সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর মান যদি আরো ভালো হতো তাহলে তাদের অনেকেই আরো অনেক বেশি ভালো কিছু করতে হয়ত পারতেন। ধরুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ভারতের আইআইটি কিংবা সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুর বা ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ বা অক্সফোর্ড অথবা আমেরিকার এমআইটি কিংবা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সম পর্যায়ের। বুঝতে পারছেন আমি কি বলতে চাচ্ছি?

উচ্চ শিক্ষা খুবই ব্যায়বহুল। জ্ঞান বিতরণ আর জ্ঞান সৃষ্টি কোন সস্তা ব্যাপার না। ক্যানাডা আমেরিকা এমনকি ইংল্যান্ডে এই ব্যয়টার একটা অংশ আসে টিউশন ফী থেকে আরেকটা বড় অংশ আসে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। কয়েকদিন আগে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধু ক্যানাডা থেকে ফোন করেছিল। সে একটি ছোটখাটো বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। এই ছোটোখাটো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা পাশ করে গেছে সেই প্রাক্তনরা বছরে যেই পরিমান অর্থ সম্পদ তাদের আপন বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয় তা অকল্পনীয়।

কোন প্রতিষ্ঠান নিয়ে গর্ব করলে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি ঋণও জন্মায়। এই ঋণ আসলে টাকা পয়সা দিয়ে কোনদিন পরিশোধ সম্ভব না তথাপি সিম্বলিক ভাবে হলেও এলামনাইরা চেষ্টা করে যায়। কেন ডোনেশন দেয়? যেন ভবিষ্যৎ জেনারেশনরা আরো বেশি সুযোগ সুবিধা পেয়ে আরো ভালো একটি জেনারেশন তৈরির সুযোগ হয়। তারা আরো বেশি ঋণী হয় এবং এইভাবেই একটি প্রতিষ্ঠান গর্ব করার মত গড়ে উঠে। এমআইটি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ওপেন ডে নামক কিছু দিন ধার্য করা থাকে। তখন এলামনাইরা সেদিন তার নিজ প্রতিষ্ঠানে আসে এবং যার যতটুকু সাধ্য donate করে এবং এর পরিমান বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। অথচ এইগুলো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৯ সালে ডেভিড হার্ডিং একা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে ১০০ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড donate করেন। ২০১৯ সালেই একজন মার্কিন বিলিওনাইর Stephen Schwarzman ১৫০ মিলিয়ন পাউন্ড donate করেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে। এইরকম অসংখ্য উদাহরণ গুগল সার্চ করলে আপনারা নিজেরাও পাবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা করে গিয়ে সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা বা মন্ত্রী হয়ে অনেককে এমন আচরণ করতে দেখি যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শত্রু। অনেককেই শিক্ষকদের অত্যন্ত ঘৃণাভরে সমালোচনা করেন। হ্যা, সমালোচনা করার অনেক কিছু আছে। আমি নিজে যত সমালোচনা করি আমার ধারণা আমার চেয়ে বেশি কেউ করে না। আমি ভেতর থেকে সমালোচনা করি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নতি করার জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবনতি দেখলে আমার কান্না পায়। আমি আজ যেইটুকু হতে পেরেছি তার জন্য আমি এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে সবচেয়ে বেশি ঋণী। ছাত্র হিসাবে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৮ বছর কাটিয়েছি। সালটি ছিল ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল। এত দীর্ঘ সময়ে এত এত স্মৃতি ভোলার না। হলে থেকেছি। পেছন ফিরে তাকালে আমার মনে হয় জীবনের সবচেয়ে স্বর্ণালী দিনগুলো ছিল এটি। কার্জণ হলের লোভ আমাকে বিদেশে থাকতে দেয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সুবাদে ১৯৯৯ সাল থেকে প্রায় প্রতিদিন কার্জণ যাওয়া এবং ক্যাম্পাসে থাকতে পারা আমার জীবনের একটি বড় পাওয়া।

বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা এবং শেষে শিক্ষক হওয়ার অভিজ্ঞতা মিলিয়ে এখন বুঝতে পারি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কি ম্যাজিক্যাল পাওয়ার। আমার ছাত্রদের যাদের প্রথম বর্ষে দেখি আর যখন তাদের মাস্টার্সের ক্লাসে দেখি তখন বুঝতে পারি তাদের একটি ছোট অংশের জ্ঞান বুদ্ধিতে কি মারাত্মক পরিবর্তন ঘটে গেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় যদি আরো ভালো হতো এই সংখ্যাটা আরো অনেক ভালো হতো। বিশ্ববিদ্যালয়টাতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো হয়ে যাবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতির জন্য সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক, এলামনাই, সাধারণ জনগণ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই কেবল ভালো হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেই বাজেট বরাদ্দ এইটা এতই কম যে বিশ্বের অনেক উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের বাজেট বরাদ্দের চেয়েও কম। এই ছবিগুলো দেখুন। এইগুলো হলো উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আবাসিক হলের রুম এবং কমন স্পেস। দেখে কি মনে হয়না ৩ ষ্টার হোটেল ব্যবস্থা? এখানে স্বাস্থ্যসম্মত থাকা, খাওয়া, টয়লেট এবং socialization এর চমৎকার পরিবেশ। এইরকম পরিবেশে থাকলেই কেবল সুস্থ্য মন এবং সুস্থ্য পরিবেশ হয় যা লেখাপড়ার জন্য অবশ্য জরুরি। এখানে নাই কোন কু-রাজনীতি, নাই কোন টর্চার সেল, নাই কোন গণরুম। আশ্চর্য বিষয় হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে এইসব হল পরিচালনার জন্য নাই কোন শিক্ষক। আছে অত্যন্ত প্রফেশনাল স্টাফ। এখানে নাই কোন ঝগড়া ঝাটি, নাই কোন বন্দুক যুদ্ধ। সকলে এক আনন্দঘন পরিবেশে থাকে এবং সেটা তারা মেইনটেইন করে। এইবার কল্পনা করুন আপনারা নিজেরা কেমন রুমে আর কেমন পরিবেশে পড়ে এসেছেন আর বর্তমান ছাত্ররা কেমন পরিবেশে পড়ছে। দিন যত যাচ্ছে আবাসিক ব্যবস্থার মান ততই খারাপ হচ্ছে।

তারপর ভাবুন আমরা যদি আমাদের ছাত্রছাত্রীদের উন্নত বিশ্বের মত আবাসিক সুবিধা দিতে পারতাম কি যে ম্যাজিক্যাল ব্যাপার হতো! আমার দীর্ঘ্য শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি আমাদের ছাত্রছাত্রীরা অসম্ভব মেধাবী। এত সমস্যার, এত খারাপ পরিবেশে থেকেও কেউ কেউ অনেক ভালো করছে। এইটাই আমার কাছে আশ্চর্য লাগে। আরো আশ্চর্য লাগে বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে বিশ্ব কিভাবে চলে সব কিছু জেনেশুনেও কোন দাবি নাই। বরং ভালো পরিবেশের দাবি জানালে ছাত্ররাই ছাত্রদের প্রতিপক্ষ হয়ে শরীরে আঘাত পর্যন্ত করে। আপনারা যারা এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হয়েছেন আপনাদের দায়িত্ব আছে যেন আপনাদের সন্তানরা অন্তত পড়াশুনার একটা সুন্দর পরিবেশ পায়।

অনেকে শিক্ষকদের খারাপ মানকে অজুহাত দিয়ে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে চাননা। শুরুতো করতে হবে। একদিনে সব একবারে ভালো হয়ে যাবে না। ভালো শিক্ষক যেন নিয়োগ হয় সেইজন্য আপনাদেরকেও চাপ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে এটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। পাবলিকের ট্যাক্সের টাকায় এটি চলে। আমি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি তার জন্য আমার পরিবার আমার পেছনে যত খরচ করেছেন তার চেয়ে বেশি করেছে জনগণ। আমি রাস্তা দিয়ে হেটে যাই সেটাও জনগণের। তাই আমাদের সকলের ঋণ আছে।

এই দেশে অনেক বিলিওনাইর আছে। তাদের কতজন শিক্ষা গবেষণায় donate করেছে? ভারতে এক টাটা যেই পরিমান ভারতের শিক্ষা ও গবেষণায় ভূমিকা রেখেছে তা অকল্পনীয়। গতকালকে দেখলাম টাটা ইনস্টিটিউট ফর ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ এর দুজন জুনিয়র বিজ্ঞানী ইতালির ইনস্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স থেকে সেরা বিজ্ঞানীর পুরস্কার পেয়েছে। আমাদের দেশে একটাও বিশ্বমানের কাছাকাছিও কোন ইনস্টিটিউট নাই। সংখ্যায় কিন্তু আমরা কম না। বরং সংখ্যার দিক থেকে আমরা বিশ্বের অনেকের চেয়েও অনেক এগিয়ে। কিন্তু মানের দিক থেকে যোজন যোজন দূরে।

ইউনেস্কো বলেছে একটি দেশ সত্যিকারের উন্নতি করতে চাইলে জিডিপির কমপক্ষে ৬% শিক্ষায় বরাদ্দ দেওয়া উচিত। আমাদের দেয় ২-২.৫ শতাংশ। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের বাজেটে “গবেষণা ও উন্নয়ন” নামে একটি খাত রাখা হয় এবং সেই খেতে যেই দেশ যত বেশি বরাদ্দ দেয় সেই দেশ তত বেশি উন্নত। এইটা একটা গোল্ডেন রুল যার কোন ব্যতিক্ৰম নাই। টেকসই উন্নয়নের জন্য গবেষণা অত্যাবশ্যক। বিশ্বের বিভিন্ন টেক জায়ান্ট যেমন Apple, Samsung, Google, Microsoft এরা যদি গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ শূন্য করে দেয় তারা টিকে থাকতে পারবে না। টিকে থাকার প্রধান রসদ হলো নতুন নতুন মডেল বের করা যা করতে হলে গবেষণা লাগবে। দেশের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ডাটা অনুসারে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে নেপাল দেয় তার জিডিপির ০.৩০%, পাকিস্তান দেয় তার জিডিপির ০.২৪%, ভারত দেয় তার জিডিপির ০.৬৫%, চীন দেয় তার জিডিপির ২.১৯%, জাপান দেয় তার জিডিপির ৩.২৬% কোরিয়া দেয় তার জিডিপির ৪.৮১%, ইসরাইল দেয় তার জিডিপির ৪.৯৫% বরাদ্দ দেয়। এই ডাটাটা দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে যত বেশি দেয় সেই দেশ তত বেশি উন্নত। ইউনেস্কোর এই লিস্টে বাংলাদেশ এবং আফগানিস্থানের জায়গাটা খালি কারণ এই দুই দেশে এই দুই খাত নামে কোন খাতই নাই তাই বরাদ্দও নাই। মানে মাথা নাই তাই মাথা ব্যথাও নাই, সিম্পল হিসাব।

এই বরাদ্দ দিয়ে না আমাদের ছাত্ররা ভালো আবাসিক সুবিধা পাবে, না পাবে ভালো লেখাপড়া করার সুবিধা। তাই আসুন দেশটাকে গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করি। যার যতটুকু সাধ্য মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়তে সাহায্য করি।

সর্বাধিক পঠিত